ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

সম্প্রতি পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ঐতিহাসিক ঐক্যমত্যে ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় একটি আইন প্রণয়ন করেছে। এই অনন্য আইনটির মাধ্যমে পাকিস্তানের বিধায়করা শুধু প্রথমবারের মতো ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেনি বরং তাদের বিরুদ্ধে করা বৈষম্যও অপরাধ বলে গণ্য করেছে।

ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘটা শতাব্দী প্রাচীন শোষণও পাকিস্তান থেকে ভিন্ন কিছু নয়। মূলত ১৮৭১ সালে ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট প্রবর্তনের মাধ্যমে সেই ঔপনিবেশিক যুগে আইনি কাঠামোতেই এই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বঞ্চনা শুরু হয়েছিল এবং তখন তাদেরকে আইনানুসারে জন্মগত অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

এতে করে আইনগতভাবেই কেবল তাদের স্বতন্ত্র মর্যাদা লোপ পায়নি বরং সামাজিক মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়েছিল। পরিণতিতে তাদের পরিবারগুলিও তখন তাদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন পরিত্যাগ করতে উৎসাহিত হয়েছিল এবং পরিবারবিহীন ভিন্ন এক জগতে তাদের বেড়ে ওঠা ও ঠাঁই হয়েছিল। যে ধারা এখনও অনেকাংশে অব্যাহত।

মূল জনস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা পতিতাবৃত্তি, ব্ল্যাকমেইলিং এবং অন্যান্য অবৈধ পন্থায় উপার্জন করতে শুরু করে।

১৯৪৯ সালে উল্লিখিত আইনটি বাতিল হলেও এই ভূখন্ডে তাদের জীবিকা, বৈষম্য, অবহেলা এবং নিপীড়নের এখনো কোন পরিবর্তন হয়নি।

আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা ও তাদের বিরুদ্ধে লিঙ্গগত পরিচয়ের কারণে কোনরূপ বৈষম্য করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পাকিস্তানের এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত ২০০৯ সালের ঐতিহাসিক ড. মোহাম্মদ আসলাম খাকি ও অন্যান্য বনাম সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (অপারেশন), রাওয়ালপিন্ডি এবং অন্যান্য মামলায় সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে।

ঐতিহাসিক সে রায়ে সুপ্রিম কোর্ট পাকিস্তানের সরকারকে অন্যান্য সাধারণ নাগরিকদের ন্যায় এই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, উত্তরাধিকার, ভোট, বিয়ে, পরিচয় নিবন্ধন প্রভৃতি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সিনেটর জহির-উদ-দিন-বাবর আভান ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি বেসরকারি বিল আইনসভায় উপস্থাপন করেন। যা এখন পার্লামেন্টের পর রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেয়ে চূড়ান্ত আইনে রূপান্তরিত হয়েছে।

পাকিস্তানে প্রণীত নতুন আইনটি ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির অপরাপর অধিকারের সঙ্গে উত্তরাধিকারের অধিকার প্রদান করার সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। একপেশে ও বিতর্কিত ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে অনেকেই ট্রান্সজেন্ডারদের উত্তারাধিকারের অধিকার দিতে নারাজ। তবে বর্তমান আইনটির মাধ্যমে তারা তাদের নিজস্ব অনুভূতিযুক্ত লিঙ্গ পরিচয় অনুযায়ী পূর্বপুরুষের সম্পত্তি থেকে নিয়মানুযায়ী অন্যান্য শরীকদের মতোই অংশ দাবি করতে পারবে।

যুগান্তকারী এই আইনি বিধানের কল্যাণে এখন থেকে তারা তাদের পিতা-মাতা বা অন্যান্য শরিকদের নিকট থেকে উত্তরাধিকার সম্পত্তি ধারণ করতে পারার যে বাধা তা থেকে মুক্তি পাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হবে।

তাছাড়া এ ব্যবস্থা তাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিবে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মনঃকষ্ট দূর করবে বরং পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করবে। অধিকন্তু, এই আইনের মাধ্যমে ট্রান্সজেন্ডারদের স্বীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা পাবে। তারা নিজেদের পছন্দনানুযায়ী পুরুষ, নারী বা উভয়ের মিশ্রণ বা কোনটিই নয় পরিচয়ে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র প্রভৃতির মতো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে নিজেদের লিঙ্গ নির্ধারণ করতে পারবে এবং প্রাদেশিক, স্থানীয় ও জাতীয় সকল পর্যায়ের নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।

সুতরাং, এখন থেকে আইনবলে তারা জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরে নিজেদের ইচ্ছানুসারে লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণ করার অধিকারি হবে।

ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পেশা, পরিবহন পরিষেবা সরবরাহকারী, কর্মসংস্থান, সাধারণ নাগরিক সুবিধাসমূহ, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি অফিস এবং হেফাজতে ট্রান্সজেন্ডারদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক সব ধরনের আচরণ নিষিদ্ধ ও অপরাধ বলে গণ্য করেছে।

উপরন্তু সমস্ত সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে সমান ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করেছে এবং শুধুমাত্র লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে অপরাধ বলে বিবেচনা করেছে। এছাড়া কোন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি বৈষম্যের কোন অভিযোগ তুললে তা নিষ্পত্তি করার জন্য একজন অফিসার নিয়োগের বিধান সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) আইনটি এই সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও তাদের সম্পর্কে মেডিকেল পাঠ্যক্রমের পর্যালোচনার বিধান করেছে। শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি, স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সরকারের ওপর দায়িত্ব আরোপ করেছে।

এছাড়াও সরকারকে তাদের উদ্ধার, পুনর্বাসন, সুরক্ষা এবং নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করতে বিধান করেছে। এসবের পাশাপাশি যারা লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে তাদের প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান করতে এবং এ ধরনের অপরাধীদের জন্য কারাগারে আলাদা কক্ষ তৈরির কথা বলা হয়েছে। এই আইনটি ট্রান্সজেন্ডারদের বিরুদ্ধে যৌন বা শারীরিক সহিংসতার বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদান, পাবলিক প্লেসে প্রবেশাধিকারে বাধা, বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ, তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে এমন কোন কাজ প্রভৃতির জন্য শাস্তির বিধান রেখেছে।

লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর অধিকার অত্যন্ত নাজুক। যদিও ২০০৯ সাল থেকে ভোটার তালিকাতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করার জন্য তারা সুযোগও পাচ্ছে।

২০১৩ সালে এসে সরকার তাদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়াও তারা তাদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ পরিচয়ানুসারে পাসপোর্ট পাওয়ারও যোগ্য। তথাপি, ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ সম্বোধনটি আপত্তিকর। কারণ এটি লিঙ্গ পরিচয়ের মধ্যে এক ধরনের শ্রেণী ও বিভাজন তৈরি করে; যেন পুরুষ লিঙ্গ প্রথম এবং নারী দ্বিতীয় শ্রেণির।

সরকারের তরফ থেকে ট্রান্সজেন্ডারদের কল্যাণে কেবল এতটুকু উদ্যোগই দৃশ্যমান। কোনও আইনি সুরক্ষা বা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মের নিশ্চয়তা বা বৈষম্য বিলোপ কিংবা তাদের জীবনমান উন্নয়নে বা তাদেরকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে এখনও তেমন কোন প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না। যদিও ব্যক্তি উদ্যোগে বা সীমিত পরিসরে কিছু ব্যবস্থা নেয়ার নজির দেখা যাচ্ছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

আইন কমিশন বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন করার সুপারিশ করলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। অথচ এদেশে আমরা প্রায়শই শুনতে পাই, ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় শুধু তাদের ব্যতিক্রমী লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে বিভিন্ন পাবলিক প্লেস যেমন: স্কুল, হাসপাতাল, শৌচালয় প্রভৃতি স্থানে প্রবেশে বা সেবা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে। এছাড়া দৈনন্দিন জীবনে অবিরাম বৈষম্য ও মানহানি সহ্য করা নিতান্তই মামুলি ঘটনা; যে যন্ত্রণা তাদের মৃত্যুর পরও শেষ হয় না। মৃত্যুর পর অন্য সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে অনেক সময় একই কবরস্থানে দাফন করতেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা এখনও মৃত পিতা-মাতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার অর্জন কল্পনা করতে পারে না। যেহেতু ধর্মীয় বিধানানুসারে সম্পত্তির বণ্টন পুরোপুরি লিঙ্গ নির্ভর এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের জন্য আলাদাভাবে কোন বিধানের উল্লেখ নেই; তাই এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে পূর্বপুরুষের সম্পত্তি পাবার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু কোন ধর্মেই তাদেরকে সম্পত্তির ভাগ প্রদানে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই পাকিস্তানে তাদের ইচ্ছানুসারে নির্ধারিত লিঙ্গানুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের বিধান করা হয়েছে।

সম্পত্তির সঙ্গে শুধু ক্ষমতার সংযোগ নয়, স্বাবলম্বিতার সম্পর্কও নীবিড়। এক্ষেত্রে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তাদের সহ-অংশীদার(গণ) নিজেদের স্বার্থহানির ভয় এবং ধর্মীয় বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

বাংলাদেশের তুলনায় পাকিস্তানের অধিক রক্ষণশীল সমাজ হয়েও যেখানে বৈষম্য দূর করার এবং সমতা নিশ্চিত করার জন্য এমন এক দৃষ্টান্তমূলক ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেখানে বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশ নাগরিক হিসেবে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অসীম নীরবতা পালন করছে।

প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার রক্ষা করার নিমিত্তে বাংলাদেশের আর অপেক্ষা করা সমীচীন হবে না। যেখানে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদাধীন আইনের চোখে সকলের সমতা এবং সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২৮ অনুচ্ছেদে লিঙ্গ, জাতি ধর্ম, বর্ণ, জন্মস্থান প্রভৃতির ভিত্তিতে কোনরূপ বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে; উপরন্তু অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে সেখানে ট্রান্সজেন্ডারদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে এবং বৈষম্য বিলোপ করতে আইনি ব্যর্থতা কেবল সংবিধান লঙ্ঘন নয়, মানবাধিকারেরও চূড়ান্ত অবজ্ঞা।

পাকিস্তানি সাংসদরা প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিলেও এখনও সেখানে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস, বিয়ে ও পরিবার গঠনের অধিকার প্রভৃতি বিষয়ে অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে; যা বর্তমান আইনটি দ্বারা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

অতএব, বাংলাদেশের এখনই উচিত সত্বর পূর্ণ সমতা, স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় সমান সুযোগ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং ট্রান্সজেন্ডার জনগণের অধিকার নিশ্চিত করে একটি সামগ্রিক আইন প্রণয়ন করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্য ও শোষণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা।

আমাদের পূর্বপুরুষগণ এবং মুক্তিযোদ্ধারা এমন একটি সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে সবাই সমান বলে গণ্য হবে এবং কেউই সামাজিক শোষণের শিকার হবে না। সুরতাং, বাংলাদেশ যদি এই প্রান্তিক সম্প্রদায়ের অভিশাপ দূর করার জন্য অনির্দিষ্ট নীরবতা দেখায় তবে এটি আমাদের সকলের জন্যই জাতি হিসেবে একটি বড় লজ্জাজনক ব্যাপার হবে।