ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

বিশ্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা ও ১ মার্চ সারাদেশে পরিবেশ রক্ষায় পলিথিনের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। মূলত ১৯৯৮ সালের বন্যায় পলিথিনের বহুল ব্যবহারের কারণে দেশের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০০২ সালে নিষিদ্ধ হবার পর জোরালো অভিযান ও আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পলিথিনের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তীতে ২০০৬ সালের শেষ দিকে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় থেকে এ ব্যাপারে নজরদারী শিথিল হয়ে পড়ায় পুনরায় দাপটের সাথে পলিথিনের আবির্ভাব ঘটে। বিগত বছর খানেক ধরে পলিথিনের ব্যবহার আবারো মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে কাঁচাবাজার, খুচরা পণ্য ক্রয় ও ফলের দোকানে পুরো মাত্রায় পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় দেদারসে পলিথিন বিক্রি ও ব্যবহৃত হলেও আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগের অভাবে পলিথিন উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করা যাচ্ছে না। সেই সাথে এ ব্যাপারে ভোক্তাশ্রেণীর অসচেতনতাও মদদ জুগিয়ে চলছে।

পলিথিনের ইতিকথাঃ পলিইথিলিন, যা জনপ্রিয়ভাবে পলিথিন নামে পরিচিত তা আসলে এক ধরনের পলিমার। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার যোগ্য পলিথিন প্রথম ১৯৩৩ সালে আবিস্কৃত হলেও এর ব্যবহার মূলত জনপ্রিয়তা পায় ১৯৫৮ সাল থেকে। দামে সস্তা ও সহজ ব্যবহার উপযোগিতা একে মুহূর্তেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন পলিথিন সামগ্রী উৎপাদিত হয়। পলিমার একটি শক্ত, সাদা ও স্বচ্ছ বস্তু। এর বহুবিধ ব্যবহারের মধ্যে পণ্যের মোড়ক, বোতল, খেলনা, বৈদ্যুতিক কেবল, পাইপ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দুই ধরনের পলিথিন উৎপাদিত হয়- কম ঘনত্বের কোমল পলিথিন এবং উচ্চ ঘনত্বের পলিথিন। পলিথিন তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় অপরিশোধিত খনিজ তেল।

পলিথিনের নানামুখি ক্ষতিকর দিকঃ পরিবেশ ও মানব স্বাস্থের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে এটি এক নতুন অভিশাপ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণানুযায়ী একটি পলিথিন ব্যাগ প্রকৃতিতে মিশে যেতে সময় নেয় পাঁচশ’ থেকে হাজার বছর পর্যন্ত। ২০০২ সালের পূর্বে করা এক সমীক্ষা অনুযায়ী ঢাকা শহরের একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করতো এবং শহরের বাসিন্দারাই প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি পলিথিনব্যাগ একবার ব্যবহার শেষে প্রকৃতিতে যথেচ্ছভাবে ফেলে দিতো। নিষেধাজ্ঞা জারির পূর্বে বাংলাদেশে চারশত পলিথিন কারখানা প্রতিদিন গড়ে ১৩০ মিলিয়ন পলিব্যাগ উৎপাদন করতো।

পণ্যের সাথে বিনামূল্যে দেয়া এসব পলিথিন ব্যাগগুলো দ্রুত সারাদেশের ড্রেন, নালা, খাল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট করে ফেলে এবং পানির প্রবাহ থামিয়ে দেয়। এর ফলে দেখা দেয় দুই প্রকারের সমস্যা: ক) জলাবদ্ধতা ও বন্যা এবং খ) জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পলিথিন থেকে সৃষ্ট এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া ক্যান্সার ও ত্বকের বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে। তাছাড়াও ডায়রিয়া ও আমাশয় রোগও ছড়াতে পারে। রঙিন পলিথিন জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। এতে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়াম শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। পলিথিনের কাপে চা পান করলে আলসার ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে পলিথিনের প্রভাবে মাটির চারটি উপাদান সমভাবে সংবন্ধিত হতে পারে না। ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। এতে বৈচিত্র্য নষ্ট হয়।

পলিথিন কৃষি জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পলিথিন পুঁতে যাওয়ার ফলে মাটিতে থাকা অণুজীবগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে না। মাটির নিচে পানি চলাচলেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। এর ফলে মাটির স্বাভাবিক কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে। পলিথিন পোড়ানোর ফলে ডাইঅক্সিন নামক বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়, যা নিচের বায়ুস্তরকে দূষিত করে। বর্জ্য পলিথিন ড্রেনেজ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। পলিথিন জমা হওয়ায় এবং সূর্যালোক না পৌছাতে পারায় অ্যাকুয়াটিক সিস্টেম নষ্ট হয়। ফাইটোপ্লাংটন সৃষ্টি না হওয়ায় পানির বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বৈচিত্র্য নষ্ট হয়। এক হিসাব অনুযায়ী ঢাকা শহরের শতকরা আশিভাগ ড্রেনে বন্ধের কারণ হচ্ছে পলিব্যাগ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ জমা হয়ে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর ১০-১২ ফুট পর্যন্ত ভরাট হয়ে নাব্যতা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে।

পলিথিন রুখতে আইনের বিধানঃ ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬(ক) (সংশোধিত ২০০২) ধারার প্রদত্ত ক্ষমতা বলে ঘোষিত সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, “যে কোনো প্রকার পলিথিন ব্যাগ অর্থাৎ পলিথাইলিন, পলিপ্রপাইলিন বা উহার কোনো যৌগ বা মিশ্রণের তৈরি কোনো ব্যাগ, ঠোঙা বা যে কোনো ধারক যাহা কোনো সামগ্রী ক্রয়বিক্রয় বা কোনো কিছু রাখার কাজে বা বহনের কাজে ব্যবহার করা যায় উহাদের উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সমগ্র দেশে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হইল”। প্রজ্ঞাপনটিতে আরো উল্লেখ করা হয় সাময়িকভাবে বিস্কুট চানাচুরসহ বিভিন্ন রকম খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, সিমেন্ট, সার শিল্পসহ মোট ১৪টি পণ্যে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা যাবে। তবে ১০০ মাইক্রোনের কম পুরুত্বের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন করা যাবে না।

এই আইনের ১৫(১) এর ৪(ক) ধারা অনুযায়ী উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণের জন্য অপরাধীদের সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা ৬ মাসের কারাদণ্ডের বিধান আছে । আইনানুযায়ী মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করলেও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না।

পলিথিনের উৎস ও ব্যবহারের কারণঃ আইন করে নিষিদ্ধ করার পরও পুরান ঢাকার লালবাগ ও চকবাজারে পলিথিন ব্যাগের রমরমা ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন রঙ ও সাইজের পলিথিন ব্যাগ সেখানে পাইকারি ও খুচরা দামে কিনতে পাওয়া যায়। দোকানগুলোতে সামান্য কিছু পরিমাণ পলিথিন ব্যাগ রাখা থাকলেও অর্ডার দিলে যে কোনো সাইজের ও রঙের পলিথিন ব্যাগ তারা ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে বলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত একাধিকবার অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় চকবাজারে এইচডিপি পলিথিন প্রতি পাউন্ডের দাম পড়ে ৫৫ টাকা। এছাড়া এর চেয়ে উন্নতমানের হাতলওয়ালা পলিথিন তারা বিক্রি করে প্রতি পাউন্ড ৭০-৮০ টাকায়। চকবাজারের পাইকারি পলিথিন ব্যাগের দোকানগুলো সারাদেশের খুচরা ও পাইকারি ক্রেতাদের কাছে পলিথিন ব্যাগ সরবরাহ করে থাকে।

বাংলাদেশ পলিপ্রোপাইল প্লাস্টিক রোল অ্যান্ড প্যাকেজিং অ্যাসোসিয়েশন নামে বৃহৎ একটি পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে সারাদেশে এক হাজার পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী ছোট-বড় অবৈধ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৭শটি কারখানা ঢাকাসহ পুরান ঢাকার কোতোয়ালি, চকবাজার, সূত্রাপুর, বেগমগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে অবস্থিত। এছাড়া ঢাকা শহরের মিরপুর, কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও, কামরাঙ্গীরচর ও টঙ্গীতেও প্রচুর ছোট-বড় পলিথিন কারখানা রয়েছে। বাকি কারখানাগুলো চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য জেলায় অবস্থিত।

খরচ কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাপক হারে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করলেও এ ব্যাপারে ক্রেতারা সচেতন না হওয়ায় বাড়ছে পলিথিন ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহার। অধিকাংশ ক্রেতা দ্রব্য ক্রয়ের পর কোন ধরনের পাত্রে বিক্রেতা পরিবেশন করছে তার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিক্রেতা পলিথিন ব্যাগে ভরে পণ্য দিলেও তাতে ক্রেতারা আপত্তি করছে না। আবার রাস্তাঘাটে খোলাবাজারে অবাধে চলছে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার ও পরিবহন। বেশিরভাগ ক্রেতাই বাজার করতে ব্যাগ নিয়ে আসেন না। আর দামে সস্তা হওয়ায় এবং হাতের কাছে পাওয়া যায় বলে ক্রেতারাও পলিব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ বোধ করেন। নেট অথবা কাগজের ঠোঙায় যেখানে এক টাকার বেশি খরচ হয়, সেখানে পলিথিনে খরচ হয় চার ভাগের এক ভাগ এটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

পরিবেশ বাঁচাতে অবশ্যই পলিথিন ব্যাগের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে এবং পলিথিনের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাট, কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগ উদ্ভাবনের ও বহুল ব্যবহারের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ ও বিভাগগুলোকে কার্যকরভাবে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে ঘন ঘন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং এ সংক্রান্ত বাধাগুলি দূর করতে হবে।

সরকারিভাবে বাজারগুলোতে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা গেলে পলিথিন ব্যবহারে রাশ টেনে ধরা সম্ভব। পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করা গেলে এবং পলিথিন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের পুনর্বাসনের বাস্তবিক ব্যবস্থা করা গেলে পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব কিছু নয়।

***
লেখাটি দৈনিক সকালের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।