ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পূর্ব হতেই এ ভূ-খণ্ডে নানা পন্থায় এবং ওছিলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রেও মানবাধিকার লঙ্ঘন থেমে থাকেনি। বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনে কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও পরিলক্ষিত হয়েছে এবং দেশ স্বাধীনের চার দশক পরও অদম্য গতিতে প্রতিনিয়তই তা হয়ে চলছে।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরমতম দৃষ্টান্ত হলো ‘ক্রসফায়ারের’ নামে অবিরাম ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ চালিয়ে যাওয়া। আইন-শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী (Law enforcing agency) বাহিনীর ছোড়া গুলিতে বিনা বিচারে একের পর এক মানুষ হত্যা করা হচ্ছে আর প্রজাতন্ত্রের জনগণকে বোকা বানিয়ে ভাঙা রেকর্ডের মতো একই আষাঢ়ে গল্প শোনানো হচ্ছে। কখনো কখনো একেবারেই নিরপরাধ মানুষও কেবল নামের মিল থাকায় অথবা পূর্বশত্রুতার জের ধরে ফাঁসানোর মাধ্যমে কিংবা চাহিদামতো চাঁদা না দেয়ায় এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। এসবেরই সর্বসাম্প্রতিক সংযোজন হঠাৎ মানুষ গুম হওয়া। অবশ্য এ কথা হলফ করে বলা যায় যে এ লেখা যখন পাঠকের হাতে পৌঁছাবে ততক্ষণে হতভাগা অনেকই এদের (আইন-শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী বাহিনী) খাতায় অলৌকিকভাবে ভাবে সন্ত্রাসী হিশেবে নাম উঠিয়ে নিজে গুম হতে পারে এমনকি জীবনটাও হারাতে পারে। ঘটনাগুলো যে রাষ্ট্রের অগোচরে হচ্ছে, তা কিন্তু নয়।

উপরন্তু ক্ষমতাসীন সরকার অপরাধটি স্বীকার করে নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে এবং সমানতালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলছে। অথচ মুখে বুলি আওড়ে চলছে যে পুরনো ক্ষত এত দ্রুত সারানো সম্ভব নয়। অথচ আদৌ কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নির্মূলে তিন বছর সরকারের কাছে অতি অল্প সময়! কিন্তু নির্বাচনের পূর্বে ভোট প্রার্থনা করার সময় তাদের এই খেয়াল থাকে না যে, নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন তাদের দ্বারা সম্ভব কি-না? থাকলে নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি তারা ভুলে বসে থাকতেননা।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের (রাষ্ট্রীয় মদদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ দ্বারা) বাইরেও বিবিধ উপায়ে রাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর দমন-নিপীড়ন চালিয়ে মানবাধিকার পদদলিত করা হয়। এ দেশে নিরাপত্তা হেফাজতেও অহরহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নিয়ে সুস্থ মানুষ মেরে ফেলা হয়। ভাগ্যগুণে প্রাণটা উবে না গেলেও চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেল কিংবা কাদেরের কথা পাঠক নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। নিরীহ এই ছাত্রদের একজনকে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশি নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল অন্যজনকে থানার ওসি চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছিল। উচ্চ আদালত নিরাপত্তা হেফাজতে এ ধরনের নির্যাতনের ওপর ১৯৯৮ সালে এক রায়ের মাধ্যমে (ব্লাস্ট ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ, ৫৫ ডি এল আর) নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ২০১১ সালে এসেও বাস্তবতা পাল্টায়নি (মামলাটি এখন আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে)। গত বছরের জুলাইয়ে যখন রাজধানীতে পুলিশি হেফাজতে তিনজনের মৃত্যু হলো তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলেও এখন আবার তা সবার বিস্মৃতিতে চলে গিয়েছে।

উপরন্তু ক্ষমতাসীন সরকার অপরাধটি স্বীকার করে নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে এবং সমানতালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলছে। অথচ মুখে বুলি আওড়ে চলছে যে পুরনো ক্ষত এত দ্রুত সারানো সম্ভব নয়। অথচ আদৌ কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নির্মূলে তিন বছর সরকারের কাছে অতি অল্প সময়! কিন্তু নির্বাচনের পূর্বে ভোট প্রার্থনা করার সময় তাদের এই খেয়াল থাকে না যে, নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন তাদের দ্বারা সম্ভব কি-না? থাকলে নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি তারা ভুলে বসে থাকতেননা।

এত বিষণ্নতার মাঝেও বিগত ১০ মার্চ জাতীয় সংসদের নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণে উত্থাপিত একটি বেসরকারি বিল আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় শাস্তির বিধান রেখে আবদুল মতিন খসরু প্রতিবেদনটি সংসদে উপস্থাপন করেন। এর আগে সরকারি দলের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ২০০৯ সালে বিলটি উত্থাপন করেছিলেন। আশার ব্যাপার হলো সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রাশ টেনে ধরতে উদ্যোগ নিলেন।

বেসরকারি সদস্যদের বিলও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি জনাব খসরু নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণিত হলে কমপক্ষে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং মৃত্যুর ঘটনায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে এক লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করেন।

প্রস্তাবিত “নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) বিল ২০১১” এর বিধানানুযায়ী প্রথম অভিযোগ দাখিলের ৯০ দিনের মধ্যে যে কোনো অপরাধের তদন্ত শেষ ও ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারের প্রক্রিয়া শেষের কথা প্রস্তাব করা হয়েছে। বিচারের জন্য দিন গণনা শুরু হবে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর থেকে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকেও ক্ষতিপূরণের বিধান প্রস্তাবিত আইনটিতে রয়েছে।

আমাদের দেশে প্রচলিত আইনানুযায়ী এখন পর্যন্ত মিথ্যা অভিযোগে কাউকে আটক রাখলে বা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কিংবা ভুলভাবে সাজা ভোগ করলেও ক্ষতিপূরণের কোনো বিধান নেই। সেদিক দিয়েও নতুন এ বিলটি আইনে রূপান্তরিত হলে নতুন এক অধিকারের দুয়ার উন্মোচিত হবে।

বাংলাদেশে এর আগে এমনকি নিরাপত্তা হেফাজতে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। অথচ আইনানুযায়ী থানা হলো নাগরিকের জন্য নিরাপদতম স্থান। আর আমরা হলাম সেই হতভাগ্য রাষ্ট্রের নাগরিক যাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকৃত লালসা মেটাতে গিয়ে সম্ভ্রম হারিয়ে প্রাণ উজাড় করে দিতে হয়।

কেবল নামে মিল থাকার দায়ে হাজতবাস এদেশে নিত্ত-নৈমিত্তিক ঘটনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবার নাম, নিদেনপক্ষে ঠিকানাও মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না। সেই সঙ্গে আছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা। ৫৪ ধারা পুলিশকে দিয়েছে গ্রেপ্তারে অবাধ ক্ষমতা, ওদিকে ১৬৭ ধারা দিয়েছে রিমান্ডের নামে নির্যাতনের অপরিসীম ক্ষমতা। এ বিধানগুলোরও পরিবর্তন প্রয়োজন। অন্যথা নতুন আইন করেও সাফল্য পাওয়া যাবে না। কারণ তখন এই আইনগুলো ব্যবহার করে ভিন্ন পন্থায় নির্যাতন চলতে থাকবে।

এসব কালো আইনকে হাতিয়ারে রূপান্তরিত করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নাগরিকদের অযথা হয়রানি করে চলছে। বিশেষ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির আগে এ দেশের নাগরিকরা গণগ্রেপ্তার নামক একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত।

অথচ ১৯৮৪ সালে নিউইয়র্কে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর অমানবিক লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ড বিরোধী একটি সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ১৯৯৯ সালের ৫ অক্টোবর বর্তমান সরকারের আগের আমলে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তি দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ সনদের পক্ষভূত হয়েছিল। এছাড়াও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নির্যাতন ও নিষ্ঠুর অমানবিক লাঞ্ছনাকর, অবমাননাকর দণ্ড ও ব্যবহার নাগরিকের মৌলিক অধিকাররূপে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু অদ্যাবধি সেসবের কিছুই প্রকৃতার্থে বাস্তবায়িত হয়নি। অধিকন্তু নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন সইতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়েছেন। এ ধরনের আত্মহত্যা পরোক্ষভাবে হত্যার শামিল। এসব হত্যায় প্ররোচণাকারীকেও সাজার আওতায় আনা প্রয়োজন।

দেশ স্বাধীনের আগে বৃটিশ বেনিয়ারা এবং মুক্তিযু্দ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তি সংগ্রামীদের যেভাবে বর্বর, অমানুষিক মধ্যযুগীয় অত্যাচারনির্যাতন করত; আমাদের বর্তমান আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা কখনো কখনো সেরকম বা তার চেয়েও বেশি অমানবিক নির্যাতন করে বসেন। স্বাধীন দেশে এ ধরনের কোন আইন থাকতে পারেনা। এহেন পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রস্তাবিত বিলটি সংসদে পাস হওয়া অত্যাবশ্যকীয়।

যে কাজটি স্বরাষ্ট্র বা আইন মন্ত্রণালয়ের করা উচিত ছিল সে কাজটি সংসদ সদস্যরা স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছেন। বিষয়টি সাধুবাদ পাবার যোগ্য। অতীত অভিজ্ঞতা হতে দেখা যায়, বেশিরভাগ জনকল্যাণকর বেসরকারি বিলই আলোর মুখ দেখে না। অদ্যাবধি নয়টি সংসদে মাত্র সাতটি বেসরকারি বিল পাস হয়েছে! আমাদের সংসদ সদস্যরাও হিতকর আইন তৈরিতে বেশি আগ্রহ দেখান না। সেক্ষেত্রে বর্তমান বিলটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। বর্তমান সরকার নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণে প্রস্তাবিত বিলটি পাস করে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হবেন বলে আশা রাখি।