ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

‘অক্ষমতা চিকিৎসায় ২৪ ঘণ্টায় ফলাফল, বিফলে মূল্য ফেরত। এখানে বাতব্যথা, হেপাটাইটিস, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, নারী-পুরুষের জটিল রোগের সমস্যাসহ সব রকম জটিল ও পুরনো রোগের গ্যারান্টিসহকারে চিকিৎসা করা হয়।’

‘নিমেষেই মোটা হোন, স্লিম হোন, জোঁকের তেলের কারিশমা, এক ওষুধে ১০ রোগের মুক্তি।’

পথে-ঘাটে চলতে-ফিরতে এমন হাজারো বিজ্ঞাপন প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আমাদের চোখে পড়ে। হতে পারে তা বাসের মধ্যে, পত্রিকার (কিছু) পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায়। কখনো কখনো আবার
এ ধরনের অননুমোদিত বিজ্ঞাপন চলার পথে হঠাৎ উড়ে এসে পড়ে অজানা কোনো হাত থেকে। আর এ রকম বিজ্ঞাপনের ভাষাও হয় এমন, যা অন্যের সামনে বিব্রত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশ বিকৃত করতেও এ ধরনের ওষুধের বিজ্ঞাপন ভয়ংকর ভূমিকা রেখে চলেছে।

মগবাজারের শফিকুল এ ধরনের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে মগবাজার রেলগেটের পাশের একটি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে যান। তিনি যাওয়ার পর প্রতারণামূলকভাবে তাঁর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ২৭ হাজার টাকা। কিন্তু তিনি রোগ থেকে মুক্তি পাননি। পরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।

কেবল নৈতিকতার প্রশ্নেই এ রকম বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ হওয়া প্রয়োজন নয়। প্রতারণার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব বিজ্ঞাপন। এ দেশের অশিক্ষিত, দরিদ্র, অসহায় মানুষগুলো প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হয়ে চলেছে এসব ভণ্ড ওষুধ প্রস্তুতকারীর দ্বারা। এভাবে বিক্রীত ওষুধ যে কেবল অর্থের অপচয়ই করছে তা নয়। কখনো কখনো তা জীবননাশের ভূমিকায়ও আবির্ভূত হচ্ছে।

অননুমোদিত এসব ওষুধের বিপণন নিরোধে সামগ্রিক গণসচেতনতা গড়তে ও প্রচার বন্ধে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রচারমাধ্যমগুলোর একটু সচেতনতা মানুষের জীবনহানির পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। সেই সঙ্গে ওষুধ প্রশাসনের নজরদারি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ এ ধরনের বিজ্ঞাপন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আইনেও এ ধরনের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু এ আইনের বাস্তব কোনো প্রয়োগ নেই। আইন উপেক্ষা করে বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি চালু রেখেছে অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা। তাদের রোধ করার কোনো চেষ্টাও নেই।
আইনে বিজ্ঞাপন বলতে যা বোঝায়

১৯৮২ সালের ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশের ১৪ ধারানুযায়ী (আইনটি ১৯৯৭ সালে সংশোধিত) বিজ্ঞাপন বলতে বোঝায় যেকোনো নোটিশ, সার্কুলার অথবা অন্য কোনো কিছু, যা প্রকাশ্য জনসমক্ষে উপস্থাপন বা প্রদর্শন; যানবাহনে, সংবাদপত্রে, কোনো সাময়িকীতে বা মৌখিকভাবে কিংবা শব্দ/আলোকরশ্মির মাধ্যমে ট্রেড সার্কুলার সংযোজন ও উপযুক্তকরণ।

অন্যদিকে ১৯৫২ সালের অনাকাঙ্ক্ষিত বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ আইনের ২ ধারায় নোটিশ, চিহ্ন, দৃশ্যমান কোনো বস্তু, ঘোষণা, বিল, হ্যান্ডবিল, সার্কুলার, পুস্তিকা (চিত্রসহকারে বা অন্যভাবে) ইত্যাদিকে বিজ্ঞাপনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনটি বিশেষভাবে কেবল চিকিৎসা (গবফরপধষ) সামগ্রীর বিপণনে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে প্রণয়ন করা হয়েছিল।

এ ছাড়াও ১৯৬৩ সালের অশ্লীল বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ আইনানুযায়ী (আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই আইনটির প্রস্তাবনায় এখনো পাকিস্তান শব্দটি লেখা রয়েছে) কোনো বাড়ি, ঘর বা দেয়ালে নোটিশ, সার্কুলার অথবা অন্য কোনো প্রকাশনা প্রদর্শন; পত্রিকা বা সাময়িকীতে প্রকাশ এবং কোনো মৌখিক বা অন্য কোনো ঘোষণা অথবা শব্দ বা আলো দ্বারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পণ্যের/সেবার বিপণন বোঝানো হয়েছে। (ধারা ২ক)

তবে চিকিৎসকের কাছে ওষুধ প্রস্তুতকারী কর্তৃক পাঠানো ট্রেড সার্কুলার ইস্যু বিজ্ঞাপনের অন্তর্ভুক্ত নয়।

বিজ্ঞাপন প্রচারে বিধি-নিষেধ
১৯৮২ সালের ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, ওষুধ প্রশাসনের (লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ) অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি ওষুধের ব্যবহার সম্পর্কিত কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে বা প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।

অশ্লীল বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ আইনের ৬ ধারার বিধানানুযায়ী কম্পানির ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের সময় যারা দায়িত্বে ছিল তারা প্রত্যেকে এবং তাদের সঙ্গে কম্পানির পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও সচিবও দায়ী হবে।
অননুমোদিত ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচারে শাস্তি

ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধিত) আইন, ১৯৯৭-তে বলা হয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘন করে বিজ্ঞাপন প্রদান করলে বিজ্ঞাপন প্রদানকারীকে সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় প্রকারের দণ্ড দেওয়া যাবে।

অনাকাঙ্ক্ষিত বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ আইনের ৫ ধারায় চিকিৎসাপণ্যের বিজ্ঞাপনের দায়ে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে এ আইনে।
অশ্লীল বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ আইনানুযায়ী (ধারা ৪) অশ্লীল বিজ্ঞাপন প্রচারের দায়ে প্রথমবার সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে একই অপরাধ করলে এক বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

ব্যতিক্রম : তবে এ আইনের আওতায় যেকোনো প্রকার গবেষণাগ্রন্থ বা বই; যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গোপনীয়তার সঙ্গে কেবলমাত্র কোনো চিকিৎসক (এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদি, ইউনানি বা অননুমোদিত) বা পাইকারি বা খুচরা ওষুধ বিক্রেতার কাছে ব্যবসায়িক কারণে পাঠানো যেকোনো রকম বিজ্ঞাপন, বস্তু বা দ্রব্য; সরকারের পূর্বানুমতিসহকারে তৈরি, ছাপানো বা প্রকাশিত যেকোনো রকম বিজ্ঞাপন প্রচার বৈধ।

অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রস্তুতকৃত এসব ওষুধ একদিকে যেমন আপামর সাধারণ মানুষের অর্থ, শ্রম, সময় অপব্যয় করছে, অন্যদিকে সারা জীবনের মতো ঘটাচ্ছে অঙ্গহানি বা জীবনহানি। অশিক্ষিত, দরিদ্র মানুষগুলো অননুমোদিত ও ক্ষতিকর এ রকম ওষুধ প্রস্তুতকারীদের প্রতারণায় বিশ্বাস করে চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আর সরকার বঞ্চিত হচ্ছে প্রচুর রাজস্ব থেকে। এসব অননুমোদিত ওষুধ সেবনের ফলে আমরা এক বিকলাঙ্গ, দুর্বল ও শারীরিক শক্তিহীন জাতি গড়ে তুলছি। সংবাদমাধ্যমগুলো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে যদি এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করা থেকে বিরত থাকে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারি চালিয়ে বিজ্ঞাপন প্রদানকারীদের যথাযথ আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারে তবেই এসব ওষুধের বিপণন ও প্রচার বন্ধ করা যেতে পারে।

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল: দৈনিক কালের কণ্ঠ, শনিবার, ১৮ জুন ২০১১