ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

উচ্চ আদালতে ভাষা হিসেবে বাংলার ব্যবহার যে চরমভাবে অবহেলিত সে কথা অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। কালেভদ্রে দু’একজন বিচারপতির বাংলায় রায় লেখার মধ্যেই এখন বাংলা চর্চা সীমাবদ্ধ। এখনো পর্যন্ত উচ্চ আদালতে ব্যাপকভাবে বাংলার প্রচলন ঘটেনি। উচ্চ আদালতে বাংলার জন্য দুয়ার না খোলায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আদালত বন্দি হয়ে থাকছে কেবল উচ্চবিত্তের তরে। এর কারণ হিসেবে অনেকেই আদালত পাড়ায় ভাষা হিশেবে বাংলার সীমাবদ্ধতার কথা বলে এড়িয়ে যেতে চান, কিন্তু কেউকে এ বিষয়ে কার্যকর কোন উদ্যোগ নিতেও দেখা যায় না।

ভাষা আন্দোলনের মাস এলেই কেবল বিষয়টি আলোচনায় আসে এবং এ বিষয়ে আমাদের আবেগ উথলে পড়ে। আবার ফেব্রুয়ারির বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলনের যে স্ফূলিঙ্গ ’৫২-তে ছড়িয়েছিল তার চেতনা কিন্তু এরকম ছিল না। বরং সর্বস্তরের বাংলার প্রচলনের নিমিত্তেই ভাষা শহীদরা নিজেদের আত্মোৎসর্গ করেছিলেন।

মামলার রায় অধিকাংশ সময়ই ইংরেজিতে দেয়ার কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে আদালতের কথার মর্ম ঠিকমতো উপলব্ধিও করা সম্ভব হয় না। ফলে জনস্বার্থে দায়ের করা মামলাগুলোতে যুগান্তকারী রায় পাওয়া গেলেও কেবলমাত্র ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে এদেশের গণমানুষ তার সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উচ্চ আদালতের রায়গুলি বঙ্গানুবাদ করে জনমানুষের জন্য আইন ও বিচারের বাণী সহজলভ্য করতে সরকারের এখনই উদ্যোগ নেয়া উচিত।

আইনকে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার উপযোগী করে ব্যবহার করতে হলে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনের বিকল্প নেই। তাই আইন শিক্ষা থেকে শুরু করে বিচারের শেষস্তর পর্যন্ত সর্বত্র বাংলার পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। যথাযথ গবেষণার ব্যবস্থা করা হলে তা বেশি সময়সাপেক্ষ হবে না। বরং সহজ বাংলার ব্যবহার আইনকে আরো মাধুর্যময় করবে। আইন তখন আর কোনো খটমটে দুর্বোধ্য বিষয়ে পরিণত হবে না। তবে ভাষান্তরের ক্ষেত্রে সহজ এবং সকলের জন্য বোধগম্য শব্দ চয়ন করার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আইনি শব্দকোষ থেকে শুরু করে স্বল্প পরিসরে মূল আইনগুলি বাংলায় ভাষান্তরের কারণে ইতোমধ্যে প্রাণহীন আইনও যথেষ্ট সরস হয়ে উঠেছে। এখন প্রয়োজন শুধু বাংলার জন্য রুদ্ধ দুয়ার উন্মুক্ত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন চর্চা চালিয়ে যাওয়া।

তবে একথাও সত্য যে, আইনি অনেক শব্দের পরিভাষা বাংলায় নেই বা অন্যান্য ভাষার তুলনায় বাংলায় আইন বিষয়ক শব্দের ভাণ্ডার খুব বেশি সম্বৃদ্ধ নয়। আইনি পরিকাঠামোর মধ্যে ভাষার সব দ্যোতনাও বাংলায় সব সময় সঠিকভাবে প্রকাশ করা কষ্টসাধ্য। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানে সরকারি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। আইনের পারিভাষিক শব্দগুলোর অভিধান তৈরি করে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। ব্যবহার করতে করতেই এক সময় পরিভাষা দাঁড়িয়ে যায়।

তাছাড়া এখন তো আইনগুলো আইনসভা বাংলাতেই প্রণয়ন করছে। তাহলে উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলনকে সমস্যা কোথায়? এটা এক ধরনের মানসিক সমস্যাও বটে। অনেকে উচ্চ আদালতে ইংরেজি ব্যবহার করে এক ধরনের দম্ভ প্রকাশ করেন। এটা ঔপনিবেশির মানসিকতারই একটি অংশ। আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি অন্তরে ধারণ করতে পারিনি। উচ্চ আদালতের পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতির জন্য কমপক্ষে তিনটি মামলার রায় ইংরেজিতে লেখার নিয়মও আদালতে বাংলার সার্বিক প্রচলন বাধাগ্রস্ত করছে।

দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ করা হলেও তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষীত হচ্ছেনা। বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, “এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস-আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। এই ধারা মোতাবেক কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে”।

আইনটি প্রণয়ন করার দীর্ঘ সময় পর ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ’ গঠন করা হয়। কোষের কর্মপরিধির মধ্যে অন্যতম ছিল ব্রিটিশ আমল থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও আদালতে প্রযোজ্য ইংরেজিতে প্রণীত আইন বাংলা ভাষায় রূপান্তর। কিন্তু পরবর্তীতে সে কার্যক্রমও গতি হারিয়ে ফেলে।

রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৮০০টি আইনের মধ্যে বিগত ১৪ বছরে মাত্র ১০৭টি বাংলায় অনূদিত হয়েছে। গত বছর সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সশস্ত্র বাহিনীর ৪০টিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৬৫টি আইন বাংলায় রূপান্তরের কাজ চালাচ্ছে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ কোডে ১৮৩৬ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ২৬ খণ্ড এবং ১৯৮৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১২ খণ্ডসহ মোট ৯৫৫টি আইনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৬ খণ্ডের ৭৫০টি আইন ইংরেজি ভাষায় লেখা। এসব আইনের মধ্য মাত্র ১০০টির মতো আইন গত ১৪ বছরে ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করা সম্ভব হয়েছে।

গেল বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি আইন কমিশন আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনের উদ্দেশ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে এক সুপারিশ পেশ করলেও আর একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের প্রাক্কালেও তা বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে কোনরূপ আন্তরিকতা এখন পর্যন্ত দেখা গেল না। আইন কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে আইন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদ এবং নির্বাহী বিভাগ সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধান ও ১৯৮৭ সালের আইনের বিধান পুরোপুরি অনুসরণ করছে। নিম্ন আদালতেও তা অনুসরণ করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু হাশমত উল্লাহ বনাম আজমিরি বিবি ও অন্যান্য মামলায় (৪৪ ডিএলআর ৩৩২-৩৩৮, অনুচ্ছেদ ২০) হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিয়েছেন, সরকার অধস্তন দেওয়ানি আদালতের ভাষার ব্যাপারে দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭(২) ধারায় কোনো ঘোষণা দেয়নি বিধায় বাংলা ভাষা প্রচলন আইন জারি করা সত্ত্বেও অধস্তন দেওয়ানি আদালতের কার্যক্রম ইংরেজি ভাষায় চলমান রাখা যাবে।

ফলে আজ অবধি বিচারকাজে বাংলা ভাষা পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। অনুরূপ বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৮ ধারায়ও একইরূপ বিধান বিদ্যমান রয়েছে। আদালতে বাংলার সর্বময় ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ আইন দু’টির সংশ্লিষ্ট বিধানদ্বয়ও শিগগির পরিবর্তন করা জরুরি।

দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা নির্ধারণ করে দিলেও সে সংবিধান রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যে বিচার বিভাগের ওপর ন্যাস্ত সেই সর্বোচ্চ আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে বাংলার স্বল্প ব্যবহার শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয় বরং বেদনাদায়কও বটে। আইনকে কেবল রাষ্ট্রের একটি শ্রেণীর মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ করে রাখলে সে আইন এক সময় ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার হাতিয়ার থেকে ভ্রান্তিতে পরিণত হয়। হাইকোর্ট নিজে নির্দেশনা দিয়ে শহীদ মিনার ও ভাষাসৈনিকদের মর্যাদা রক্ষার কথা বললেও এসব কিছুর প্রাণ সেই বাংলা ভাষাই উচ্চ আদালতে অবাধে বিচরণ করতে না পারলে সব আয়োজনই অর্থহীন হবে। সাধারণ মানুষ যদি আইনি প্রক্রিয়া বুঝতেই না পারে, তাহলে সে আইন রাষ্ট্রের কল্যাণ কিংবা গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে কিভাবে?

***