ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অপরাধ সংক্রান্ত মামলার বিচারের জন্য আসামীদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণ করতে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যাবশ্যক। পক্ষপাতহীন একটি তদন্ত রিপোর্ট একদিকে যেমন মামলাটিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে পারে ঠিক তেমনি তদন্ত প্রক্রিয়া আসামীদের দ্বারা কোনভাবে প্রভাবিত হলে তা পুরো মামলার মোড় ঘুরিয়েও দিতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণত রাষ্ট্র বাদী হয়ে মামলা রুজু করে এবং ঘটনা তদন্তের দায়ভার পুলিশের ওপরই বর্তায়। অভিযুক্ত আসামীদের অপরাধ প্রমাণে প্রশ্নাতীত তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করতে পুলিশে লোকবল, সময়ের, অবকাঠামোর, আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির যেমন অভাব রয়েছে তেমনি কিছু পুলিশের কাছ থেকে অপরাধ তদন্তে যে সবসময় যথেষ্ট দক্ষতা, নিষ্ঠা, সততা ও কর্মউদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়না একথাও নিশ্চয় কেউ অস্বীকার করবেন না।

পুলিশের বিরুদ্ধে প্রভাবমুক্তভাবে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল না করার অভিযোগ অনেক পুরোনো। এ ধরণের ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আসামীদের সাথে পুলিশের যোগসাজশে কিংবা রাজনৈতিক, সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা অনৈতিক আর্থিক লেনদেন মাধ্যমে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে পুলিশকে প্রভাবিত করে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে তদন্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করার ব্যবস্থা করে।

অপরাধ সংঘটনের পর মামলা দায়ের করা হলে কিংবা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট থেকে আদেশ প্রাপ্ত হলে পুলিশ তদন্ত কাজ শুরু করতে বাধ্য। পুলিশের দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করা। তবে ঘটনা বা অপরাধের মাত্রার ওপর নির্ভর করে ক্ষেত্র বিশেষে ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে পুলিশের সময় চেয়ে করা আবেদন আমলে নিয়ে তদন্তের মেয়াদ বাড়িয়ে দিতে পারেন। আবার তদন্তের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বদলও করতে পারেন।

পুলিশি প্রতিবেদন কীঃ অপরাধের তদন্ত শেষে অভিযোগ বিষয়ে আদালতে দাখিল করে প্রতিবেদনের নামই পুলিশি প্রতিবেদন। ফৌজদারী কার্যাবিধিনুসারে তদন্ত শেষ করে পুলিশ দুই ধরণের রিপোর্ট আদালতে পেশ করতে পারেন। অভিযুক্ত আসামীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে যদি পুলিশি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় তবে পুলিশ আসামীদের সংশ্লিষ্ট আইনানুযায়ী অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দিতে পারে অথবা তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (Final Report) দাখিল করতে পারেন। পুলিশ তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট তা গ্রহণ করতে বাধ্য নন। তাই কোন মামলায় পুলিশ আসামীদের বিরুদ্ধে ফাইনাল রিপোর্ট প্রদান করলেও হতাশার কিছু নেই বরং তদন্তে অযাচিত প্রভাব পড়তে পারে জেনে আইনেও তাই তা থেকে প্রতিকার পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

কিভাবে নারাজি দিবেনঃ তাই যদি আপনি মনে করেন আপনার করা মামলায় পুলিশ নিরপেক্ষ এবং পক্ষপাতহীনভাবে তদন্ত সম্পন্ন করেনি তাহলে সে তদন্তের বিরুদ্ধে আপত্তি এবং অসন্তুষ্টি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে দরখাস্তাকারে নারাজি আবেদন পেশ করতে পারেন। মানে পুলিশি প্রতিবেদন মেনে নিতে আপনি রাজি নন মর্মে একখানা দরখাস্ত রুজু করবেন। অর্থাৎ পুলিশের দাখিলকৃত প্রতিবেদন আপনি কেন সঠিক মনে করছেন না সে কারণ দর্শিয়ে কিংবা আপনার নিকট যদি পুলিশ রিপোর্ট প্রভাবিত হওয়ার স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণাদি থেকে থাকে তবে তা সংযুক্ত করে ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর পুনরায় অথবা অধিকতর তদন্তের আবেদন জানাতে পারেন।

নারাজি আমলে নেয়ার ফলাফলঃ আপনার নিকট থেকে আবেদন প্রাপ্ত হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আসামী পক্ষ এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাকে শুনানি করে যদি মনে করেন সংশ্লিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে আসামীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন না দিয়ে চার্জ শিট দেয়া উচিত ছিল অথবা তদন্ত রিপোর্ট থেকে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কোন আসামীর নাম বাদ পড়েছে অথবা কারও নাম যোগ হওয়া উচিত ছিল তবে তিনি নারাজি দরখাস্তখানির গুরুত্ব বিবেচনা করে সেটিকে নালিশি দরখাস্ত হিসেবে গণ্য করে বিষয়টি তৎক্ষণাৎ তাঁর আদালতে নালিশি মামলা (Complaint Case) হিসেবে নথিবদ্ধ করে আবারো ঘটনা তদন্তে আদেশ দিতে পারেন।

কিংবা তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ঘটনাটি পুনরায় শুরু থেকে তদন্ত (Re-investigation) করার অথবা অধিকতর তদন্ত (Further Investigation) করতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি আবারো থানায় ফেরত পাঠাতে পারেন অথবা পূর্বের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করে দিতে পারেন। অথবা ফরিয়াদির আবেদনের সত্যতা নিরূপণে আবেদনকারীকে শপথগ্রহণপূর্বক পরীক্ষা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সন্তুষ্ট হলে আসামীর বিরুদ্ধে সমন জারি করতে পারেন অথবা ক্ষেত্র বিশেষে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করতে পারেন।

তবে আদালত চাইলে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তিনি নিজে বা তাঁর অধস্তন কোন ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করাতে পারেন। এ সময় তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ দিয়ে স্থানীয় তদন্তও করাতে পারেন। বিচার বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তখন আসামীর বিরুদ্ধে সমন জারি অথবা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।

এক্ষেত্রে তদন্তকালীন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার কোন গাফিলতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিতে পারেন অথবা ওই পুলিশ কর্মকর্তার কাজের মূল্যায়নের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে বিষয়টি সংযুক্ত করতে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আদেশ দিতে পারেন। তবে মামলাটি ঠিকমতো তদন্ত করা হয়েছে কিনা তা যাচাই করতে ম্যাজিস্ট্রেট মামলার বিভিন্ন নথিপত্র, কেস ডায়েরি ইত্যাদি আমলে নিতে পারেন।

নারাজি খারিজ হলে করণীয়ঃ উভয় পক্ষকে শুনে এবং মামলার প্রয়োজনীয় সকল নথিপত্র যাচাই করে ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন পুলিশি তদন্তের বিরুদ্ধে নারাজির কোন ভিত্তি নেই তবে তিনি নারাজি দরখাস্ত খারিজ করে দিয়ে পুলিশি তদন্তের ওপর ভিত্তি করে মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন। নারাজি আবেদন খারিজ হলে খারিজাদেশের বিরুদ্ধে আবেদনকারী ৬০ দিনের মধ্যে দায়রা জজ আদালতে অথবা হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন আবেদন দায়ের করতে পারেন। আর যদি নারাজি আবেদন অগ্রাহ্য করে ম্যাজিস্ট্রেট আসামীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন না করেই সরাসরি আসামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেন তবে আবেদনকারী বিষয়টি নিয়ে পুনরায় নালিশি মামলা রুজু করতে পারেন থানায় নতুন করে এজাহার দায়ের করতে পারেন।

সতর্কতাঃ আদালতের কাছে যদি প্রমাণিত হয় কেউ অযথা, মিথ্যা কিংবা হয়রানিমূলকভাবে নারাজি দিয়েছে তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই ঘটনা সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে অযথা নারাজি দেয়াও ঠিক নয়।

শেষ কথাঃ পুলিশি প্রতিবেদনে তাই আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিকভাবে উপস্থাপিত না হলে বিচলিত না হয়ে অথবা নিজেকে অসহায় মনে না করে নারাজি আবেদন দাখিলের আশ্রয় নিতে পারেন। প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে আসামীপক্ষ পুলিশি প্রতিবেদন থেকে রেহাই পেলেও ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপনি ঘটনা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে ন্যায় বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেননা। কারণ আসামী আইনের ফাঁক গলিয়ে পালাতে চাইলেও আইনই অবিচারের পথ রুদ্ধ করে ন্যায় বিচারের দুয়ার উন্মুক্ত করেছে।

***
প্রকাশিত হয়েছে: দৈনিক প্রথম আলো, ২০-০৫-২০১২