ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

কুমিল্লা লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দক্ষিনে বেলতলী বধ্যভূমির মাটির নীচে রয়েছে ১০ হাজার বাঙ্গালীর লাশ। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনী লাকসামের ঘাঁটিতে মানুষকে ধরে এনে নির্বিচারে হত্যা করে শত শত লাশ মাটি চাপা দিত। পাক সেনারা এ বধ্যভূমিতে কুমিল্লা জেলার দক্ষিনাংশ, বৃহত্তর নোয়াখালী ও চাঁদপুরের হতভাগ্য বাঙ্গালী যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ ও শিশুদের উপর নির্যাতনের পর মেরে ফেলে মাটি চাপা দিতো।

জানা যায়, ৭১ মুক্তিযুদ্ধে লাকসামের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। মুক্তিযুদ্ধে লাকসামের ব্যক্তিবর্গ সহ স্বাধীনতাকামী স্কুল-কলেজের ছাত্র-শিক্ষক ও পলাতক সৈনিকরা সক্রিয় অংশ গ্রহন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সু-সংগঠিত করা এবং সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য লাকসাম অঞ্চলকে ৪টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। ১নং, ২নং, ৩নং, ৪নং সেক্টর ছিল যৌথ কমান্ডের অধিন। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ চার দিকের যেকোন দু’দিকের ত্রিভূজ সীমা নিয়ে গঠিত ৪টি জোনের কমান্ডের সাথে একাধিক প্লাটুন গেরিলা যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে।

এএফ কমান্ড ও বিএলএফ কমান্ড হিসেবে পরিচিত এ বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে শক্তিশালী ছিল। লাকসাম জংশনের পাশে ৭১ সালে পাক বাহিনীর যুদ্ধের ঘাঁটি ছিল। উত্তরে বিজয়পুর এবং পশ্চিমে চাঁদপুর, দক্ষিনে সোনাইমুড়ি এবং পূর্বে ভারত সীমান্ত ছিল পাক ফৌজের যুদ্ধের এলাকা ।

অস্ত্র ও যুদ্ধের যাবতীয় উপকরন লাকসাম হতে সরবরাহ করা হয়। নোয়াখালী এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের সঙ্গে স্থল পথে যোগসূত্র ছিল লাকসাম। বধ্যভূমি হতে ৫শ গজ পশ্চিমে লাকসামের তৎকালীন একটি টোব্যাকো ফ্যাক্টরিতে লোকজনদের ধরে নিয়ে চালাতো নির্যাতন নিপীড়ন। গড়ে তোলা হয়েছিল টর্চার সেল।

কারো প্রাণ গেছে টর্চার সেলে আর কারো গেছে বধ্যভূমিতে। যাদের ধরে গর্ত করোনা হতো তাদের হাত বেঁধে গর্তের পাহাড়ে চালানো হতো গুলি। দেড় দুই মিটার গর্ত। লাথি গুতো দিয়ে ফেলা হতো গর্তে। বুকে গুলি নিয়েও বেঁচে থাকতেন অনেকে। তাদেরও শেষ রক্ষা হতো না। মাটি চাপা দেয়া হতো।

পাক সেনাদের নির্মম নিষ্ঠুর নির্যাতন, হত্যা এবং বধ্যভূমির নিরব স্বাক্ষী লাকসাম জংশন কলোনীর শ্রীধাম চন্দ্র দাশ ও তার মামা সুরেন্দ্র দাস ও উপেন্দ্র দাস। লাশ মাটি চাপা দিতে পাক সেনারা তাদের কাজে লাগাতো। নিজের জীবন বাঁচাতে সিগারেট ফ্যাক্টরী থেকে লাশ টেনে নিয়ে যেতে হতো। বধ্যভূমিতে। এরা বাধ্য হয়েছিলেন একাজ করতে।

পাক সেনারা লাকসাম বেলতলী বধ্যভূমিতে ১০ হাজার বাঙ্গালীকে হত্যা করে লাশ মাটি চাপা দিয়েছে। বর্তমানে অযত্ন অবহেলা আর রেলওয়ের পাথরের নিচে, মাটির নিচে পড়ে আছে ১০ হাজার বাঙ্গালী সাধারণের লাশ ও হাড় কংকাল। মাটি খুললেই সন্ধান মিলবে পাক বাহিনীর বর্বরতার শিকার ১০ হাজার বাঙ্গালীর হাড় কংকাল।

পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে লাকসাম জংশন এলাকায় সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হয়। সশস্ত্র পরিরোধের দায়িত্বে প্রথমে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল জলিল ওরফে লাল মিয়া বুড়িচং।

পরবর্তীতে যোগ দেন কর্ণেল মাহবুব, ব্রিগেডিয়ার দিদারুল আলম, মেজর এনাম আহমেদ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী খোরশেদ আলম, ফ্লাইট সার্জন সিদ্দিকুর রহমান প্রমুখ। যুদ্ধের সময় শক্তিশালী এফএফ বাহিনীর প্রধান ছিলেন জহিরুল ইসলাম এবং বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন মরহুম ছায়েদুল ইসলাম ও যুদ্ধকালীন কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন কমান্ডার আবুল বাশার। ডিপুটি কমান্ডার ছিলেন এটিএম আলমগীর।

পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সমস্ত অস্ত্র লাকসাম জিআরপি থানা হতে ও কিছু লাইসেন্সধারী ব্যক্তিদের কাছ থেকেও আসে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৫ এপ্রিল পেরুল তেঁতুল তলার যুদ্ধে পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করায় সেদিন রাত ১০ টায় কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে লাকসামের প্রতিরোধ যুদ্ধের বর্ণনা দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় লাকসামের আজগরা ইউনিয়নের বড়বাম গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক বাহিনীর প্রচন্ড সংঘর্ষ বাঁধে। এ লড়াইয়ে দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। নামফলকে এ দুজনের চিহ্ন আছে।

লাকসাম নবগঠিত মনোহরগঞ্জ উপজেলার হাসনাবাদ এলাকা লাল হাসনাবাদে পরিনত হয়। সেখানে পাকবাহিনীর সম্মূখ যুদ্ধে ২২ জন শহীদ হন। হাসনাবাদের গ্রামগুলো পাকবাহিনী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

সাবেক লাকসাম বর্তমান সদর দক্ষিণ উপজেলার গৈয়ারভাঙ্গা এলাকায় সম্মূখ যুদ্ধে চারজন দেলোয়ার, হারুন, মোকলেছ ও মনোরঞ্জন শহীদ হন।

খিলা রেলওয়ে স্টেশনে হাজিগঞ্জের দুই ছাত্রবন্ধু আনোয়ার ও মকরম আলী পাকবাহিনীর হাতে ধৃত হয়ে শহীদ হন।

তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন লাকসাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পাক বাহিনীর সাথে সম্মূখ যুদ্ধে বহু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মোস্তফা কামাল ও সোলায়মান দুই ভাইয়ের স্মৃতি কেউ ভুলতে পারবে না। তারা দুইজন লাকসামের উদীয়মান সাহিত্য কর্মী ছিলেন।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মিশ্রী জংশন শহীদ আবদুল খালেক, কামড্ডা গ্রামের শহীদ আবুল খায়েরের স্মৃতি বহন করছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষন ও নেতৃত্বদানের মাধ্যমে লাকসাম অঞ্চলের প্রতিরোধ গড়ে তুলেন মরহুম একে চৌধুরী, তৎকালীন এমসিএ মরহুম জালাল আহমেদ, সাবেক গনপরিষদ সদস্য মরহুম আবদুল আউয়াল, প্রবীন রাজনীতিবিদ মাওলানা ভাষানীর গনিষ্ঠ সহচর জিন্নতের রহমান (গাজিমুড়া), মরহুম মোস্তফা কামাল খান, সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর, আবদুল করিম চৌধুরী ওরফে মানু মিয়া, বিএলএফ কমান্ডার মরহুম ছায়েদুল ইসলাম, বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল বারী মজুমদার, জাহাঙ্গীর মাওলা চৌধুরী, আবুল হোসেন ননি, শেখ আহসানুজ্জামান মিরন, আবদুল হাই মঞ্জু ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সহ অসংখ্য সৈনিক।

প্রতিরোধের মুখে ৮ ডিসেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাক বাহিনী পিছনে হটে যায় এবং ১১ ডিসেম্বর লাকসাম অঞ্চল মুক্ত হয়।

লাকসাম মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবদুল বারী মজুমদার আমাদের লাকসামকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনারা মানুষকে ধরে নিয়ে হত্যা করে লাশ বেলতলী বধ্যভূমিতে মাটি চাপা দেয় এবং এ বধ্যভূমিতে প্রায় ১০ হাজার বাঙ্গালীর লাশ চাপা দেয়া হয়।

তথ্য সূত্রঃ আমাদেরলাকসাম ডট কম