ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক শীর্ষ প্রতিভা। তাঁর মহাকাব্যোপম উপন্যাস খোয়াবনামাচিলেকোঠার সেপাই এবং অসাধারণ গল্পগ্রন্থ অন্যঘরে অন্যস্বর, দুধেভাতে উৎপাত, খোয়াবনামা, দোজখের ওম ইত্যাদির জন্য তিনি জীবৎকালেই এই স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন। এগুলো যে কোনো একটি বা দুটি রচনার জন্যই একজন লেখক সাহিত্যের ইতিহাসে অক্ষয় খ্যাতির অধিকারী হতে পারেন। এমনিতে তাঁর লেখা গ্রন্থের সংখ্যা অবশ্য বেশি নয়। তবে তাঁর প্রতিটি রচনার পেছনেই আছে প্রস্তুতির দীর্ঘ ইতিহাস। সে প্রস্তুতি শারীরিক ও মানসিক উভয়তর। আর সে প্রস্তুতির পরিচয় যেমন ছড়িয়ে আছে তার গল্প-উপন্যাসে, তেমনি প্রবন্ধ, দিনলিপি, চিঠিপত্র ও সাক্ষাৎকারে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও দায়িত্বশীল একজন। শিল্পী হিসেবে আপন গন্তব্য ও পথ সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল। একইভাবে যে জীবন ও সমাজকে তিনি তাঁর রচনায় তুলে এনেছেন, তার সম্পর্কে ছিল নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচার-বিশ্লেষণ। আমাদের খুবই চেনাশোনা বলে মনে হয় যে জীবন ও পরিপার্শ্ব, তার ভেতরেও যে আরও অনেককিছু দেখারও বোঝার আছে- ইলিয়াসের লেখা আমাদেরকে তা নাড়া দিয়ে জানিয়ে দেয়। তীব্র অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে জীবন ও সমাজের আগাপাশতলা দেখেছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে।

সংস্কৃতির ভাঙা সেতু আখতারুজ্জামানের তেমনি একটা রচনা। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির স্বরূপ, সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষত বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জীবন যাপন ও তাদের সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকারভাবে। লেখাটি নব্বইয়ের দশকে লেখা হলেও আজকের প্রেক্ষিতে এখনও প্রাসঙ্গিক।

সংস্কৃতির ভাঙা সেতু প্রবন্ধটি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস শুরু করেছেন এভাবে,
সংস্কৃতি নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আজকালি বড়ো গোল দেখা যায়। প্রতিপক্ষ ছাড়া কোনো তর্ক তেমন জমে না, সংস্কৃতি বিষয়ে কথাবার্তায় একটি শত্রুপক্ষ জুটে গেছে, এই শত্রুবরের নাম ‘অপসংস্কৃতি’।

প্রবন্ধটির নাম ও শুরু থেকেই বুঝা যায় যে প্রবন্ধটি মূলত সংস্কৃতি বিষয়ে। সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তিনি এতে তুলে ধরে তার সীমাবদ্ধতা তুলে তা সমাধানে কি করনীয় তার সম্পর্কে বলেছেন।
লেখাটির পুরো সামগ্রিক পর্যালোচনা করা আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমি মূলত তার সংস্কৃতির ভাঙা সেতু প্রবন্ধে বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের যে সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।

নব্বইয়ের দশকের সংস্কৃতি চর্চা সম্পর্কে তিনি বলছেন , হাইজ্যাক, চুরি, ডাকাতি, মারামারি, লম্ফঝম্প প্রভৃতির ছবি দেখিয়ে যুব সম্প্রদায়কে এরা অর্থ সংগ্রহের শর্টকার্ট পথ রপ্ত করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এতে পয়সা কামানো চলে, অন্যদিকে পয়সা কামাবার পদ্ধতিটাও ঐ ধরনের সংস্কৃতিচর্চার অবিচ্ছিন্ন অংশ। এইভাবে Earn while you learn কর্মযোগে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুব সম্প্রদায়ের একটি অংশ একই সঙ্গে অর্থোপার্জন ও সংস্কৃতিচর্চা দুটোতেই সমান পারঙ্গম হয়ে উঠেছে।

এই যুব সম্প্রদায় আজ পরিণত মানুষে পরিণত হয়েছে। লোভ ও ভোগের সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়েই তারা বেড়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতি চর্চা সম্পর্কে পিতা-মাতাদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলছেন,
অর্থাগম হচ্ছে দেখে এদের ‘রক্ষণশীল’ বা ‘রুচিশীল’ বাপ-মাও চুপচাপ থাকাটাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন। কারণ কোনো কোনো কর্তব্যপরায়ন পুত্র তাদের উপার্জিত অর্থের খানিকটা বাড়িতেও ঢালে। এছাড়া, এইসব যুবকদের অনেকের মধ্যে আজকাল ধর্মচর্চার প্রবণতাও দেখা যায়। সব ওয়াক্ত নামাজ পড়ার সময় না পেলেও শুক্রবার এর মসজিদে যায়, মহা ধুমধাম করে ঈদ-শবেবরাত করে, পিরের পেছনে অকাতরে টাকা ঢালে, তাবিজ নেয়, সুলক্ষনা পাথর কেনে এবং মাজার দেখলেই সেজদা দেয়। এইসব দেখে পরহেজগার বাপ-মা বেশ তৃপ্ত- না, যে যাই বলুক, চুরি-ছ্যাঁচরামি, হাইজ্যাক, ডাকাতি যা-ই করুক, মদ-গাঁজা যতই টানুক, কিন্তু ছেলের আমার ধর্মে মতি আছে; পিরের তেজে এইসব উপসর্গ একদিন ঝরে পড়বে, ততদিনে ঘরে দুটো পয়সা আসছে আসুক, ছেলের কল্যাণে বাপ-মাও জাতে উঠতে পাচ্ছে, এটাই-বা কম কী?

এভাবেই আজকের মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক বিকাশ। এটা মনে রাখলে আজকের দিনে আমাদের চারপাশে যেসব অদ্ভূত ক্রিয়াকলাপ দেখতে পাওয়া যায় তার একটা ধারণা মেলে।
বাংলার মধ্যবিত্তেরে সংস্কৃতি কেন এমন তার কারণ খুজতে গিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলছেন, মধ্যবিত্তসমাজের একটি বড় অংশ নিজেদের সামাজিক ও শ্রেণীগত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। একজনের অবস্থান সমাজের কোন স্তরে, তিনি কি মধ্যবিত্ত না উচ্চবিত্তের অন্তর্ভুক্ত, মধ্যবিত্তের বিভিন্ন উপ-বিভাগগুলোর মধ্যে কোনটিতে বিরাজ করেন- এ সম্বন্ধে তার স্পষ্ট বা অস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। এখন এখানে টাকা পয়সা রোজগারের চোরাগোপ্তা অলিগলি এত বেশি যে, যে-কোনো লোক একদিন বিত্তবান হবার স্বপ্ন দেখতে পারে। পয়সার জোরে সমাজের যে কোনো স্তরে ওঠার বাসনা যে সকলের জীবনেই সফল হবে- তা নয়। বরং সিড়ির আকাঙিক্ষত ধাপটি বেশিরভাগ লোকেরই নাগালের বাইরে থেকে যায়, কেউ কেউ হোঁচট খেয়ে নিচেও গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাসনা পুষতে বাধা কোথায়? পোষা বাসনাটি দিনদিন ফাপেঁ এবং কেউ কেউ ভাবতে শুরু করে যে গন্তব্যে পৌঁছতে আর দেরি নাই। সুতরাং জীবনযাপনের মান ও পদ্ধতি এবার পাল্টানো দরকার। পাশ্চাত্য কায়দায় ওপরতলার জীবনযাপন অনুসরন করার রেওয়াজ আমাদের এখানে তেমন পরিচয় নয়। বুর্জোয়া দেশগুলোর উচ্চবিত্তের জীবনযাপনকে আদর্শ ধরে নিয়ে মধ্যবিত্ত সেটাকেই অন্ধভাবে অনুসরণ করতে শুরু করে। কিন্তু বুর্জোয়া মূল্যবোধ ও মানসিকতা তার ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওদিকে ওপরের ধাপে ওঠার জন্য মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত এতই উদগ্রীব ও অস্থির যে এজন্য হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা-ই সে আঁকড়ে ধরে। ঐ ধাপে পৌঁছবার জন্য মাজারে বা পীরের কাছে ধরনা দিতেও তার বাধে না। অথচ পাশ্চাত্য বুর্জোয়া মানসিকতা এই ধরনের ধর্মান্ধতাকে অস্বীকার করে।

এই হচ্ছে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং তার সংস্কৃতি। এই অন্ধ অনুকরণ আর লালসার ফলাফল সম্পর্কে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মত দিয়েই লেখাটি শেষ করব।
তিনি বলছেন, আমাদের মধ্যবিত্তের জীবনযাপন কিংবা ঈপ্সিত জীবনযাপন এবং মূল্যবোধ পরস্পরবিরোধী। এদের জীবন তাই নিরালম্ব, এই জীবনের ভিত্তি, বিন্যাস ও তাৎপর্য খুঁজে বের করা খুব কঠিন। এদের সংস্কৃতিও যে নিরালম্ব ও উটকো ধরণের হবে এতে আর সন্দেহ কী? সামন্ত ও গ্রাম্য মূল্যবোধের সঙ্গে বুর্জোয়া জীবনযাপনের এই উৎকট মাখামাখির ফলে যে সংস্কৃতি গজিয়ে ওঠে তাও অনেকের চোখে উটকো ঠেকে এবং তখন তাকে অপসংস্কৃতি বলে গাল দেওয়া হয়।

‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’ প্রবন্ধটিতে আরো অনেক বিষয়ে লেখক আলোকপাত করেছেন। লেখাটি পড়লে বিষয়টি সম্পর্কে পাঠকগণ আরো ভালো ধারণা পাবেন।