ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে চীন। প্রতিবেদনে ২০০৭ সালে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির বিবরণ পেশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেইটের পক্ষ থেকে চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছিলো।

বৃহস্পতিবার চীনের তথ্য-মন্ত্রণালয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছাড়াও দেশটি কীভাবে বহির্বিশ্বে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটিয়ে চলেছে, তার নজীর হাজির করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সর্বমোট একশো নব্বুইটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছে, কিন্তু নিজেদের মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষজনকে স্পষ্ট ধারণা দেয়া এবং নিজেদের পরিস্থিতি মূল্যায়নের ব্যাপারটি যুক্তরাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার লক্ষ্য থেকেই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। সর্বমোট ৭টি দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৭ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে বিচার করেছে চীন। এগুলো হচ্ছেঃ জীবন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নাগরিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার, বর্ণ-বৈষম্য, নারী ও শিশুর অধিকার এবং ভিনদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন।

চীনের প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সহিংস অপরাধপ্রবণতা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা দেশটির জনগণের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সাংঘাতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে দেশটির ভিতরের একাধিক সংস্থার তথ্যসমূহ অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে প্রকাশিত খোদ এফবিআই’র হিসাব-মতে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১ দশমিক ৪১ মিলিয়ন সহিংস অপরাধ সংগঠিত হয়েছে, যা ২০০৫ সালের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এছাড়া আলোচ্য বছরটিতে পূববর্তী বছরের তুলনায় খুন বেড়েছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ। ১৯ ডিসেম্বর ২০০৭ বার্তা-সংস্থা রয়টারের এক হিসাবে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর গড়ে ৩০ হাজার লোক আগ্নেয়াস্ত্রের জখম থেকে প্রাণ হারায়। ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের হিসাব-মতে, ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন হবার ঘটনা বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ৫ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের দেয়া হিসাব-মতে, গত ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েদীর সংখ্যা বেড়েছে পাঁচশো শতাংশ।

চীনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকারগুলো দিনকে দিন কমেই যাচ্ছে। প্রতিবেদনমতে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কর্ম-স্থানে ইউনিয়ন করা লোকের সংখ্যা মাত্র ৩ লক্ষ ২৬ হাজারে নেমে এসেছে, এটা সর্বমোট কর্মী-বাহিনীর মাত্র ১২ শতাংশ। ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট কর্মী-বাহিনীর ২০ শতাংশ ইউনিয়নের সাথে যুক্ত ছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমস গত বছরের ২৬ জানুয়ারী জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগদাতারা বাধার কারণে ৫৩ শতাংশ কর্মী ইউনিয়নে যোগদান করা থেকে বিরত থেকেছেন। সুপারস্টৌর ওয়ালমার্টের উদাহরণ দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, কর্মীদেরকে ইউনিয়নে যোগদান থেকে বিরত রাখার প্রয়াসে এ-প্রতিষ্ঠানটি আড়িপাতা থেকে শুরু করে গোপনে ক্যামেরা বসানো বা ছাঁটাইয়ের মতো কার্য-কলাপে লিপ্ত হয়েছে।

স্পেনীয় বার্তাসংস্থা ইএফইকে উদ্ধৃত করে শুক্রবারের প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাজনীতির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান সময়ে সাংঘাতিক খরচের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। তথ্যমতে, ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীপদে বড়ো দলগুলোর পক্ষে মনোনয়ন চাওয়া ২০ ব্যক্তির মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন হচ্ছেন মিলিওনার। এএফপি’র ১৫ জানুয়ারী ২০০৭ সালের তথ্য ব্যবহার করে চীনের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটি হবে এ-যাবৎকালে সর্বাধিক ব্যয়-বহুল। ফরচুন ম্যাগাজিন সম্প্রতি জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে খরচ হবে ৩ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রে সরকারীভাবে কীভাবে সংবাদ-মাধ্যমকে ধোঁকা দেয়া হয়, তার নমুনা হিসাবে ফেডারেল ইমার্জেন্সী ম্যানেইজমেন্ট এজেন্সির (এফইএমএ) একটি সাংবাদিক সম্মেলনের উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২০ অক্টোবর তারিখে শুরু হয়ে ২ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ক্যালিফৌর্নিয়া ওয়াইল্ডফায়ারের ব্যাপারে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে এফইএমএ। সাংবাদিক সম্মেলনে এফইএমএর লোকজন সাংবাদিক সেজে পনেরো মিনিটের মধ্যে গোটা ছয়েক প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এই সাংবাদিক সম্মেলনটি বিভিন্ন টিভি-চ্যানেলে সম্প্রচার করা হয়। পরে ওয়াশিংটন পৌস্ট পত্রিকা পুরো ঘটনা ফাঁস করে দেয়।
শুক্রবারের প্রতিবেদনে আরও দেখা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে দরিদ্রের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ২০০৭ সালের আগস্টে দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্রের হার ছিলো ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে আলোচ্য বছরটিতে ৩৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ বা ৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন পরিবার দারিদ্র্যবস্থার মধ্যে কাটিয়েছে। এভাবে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৮ জনের মধ্যে ১ জন নাগরিক দারিদ্রের মধ্যে ছিলেন। দেশটিতে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান যেভাবে বাড়ছে, তাও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২০০৫ সালে মোট জনসমষ্টির ১ শতাংশের হাতে সর্বমোট জাতীয় আয়ের ২১ দশমিক ২ শতাংশ সঞ্চিত ছিলো। ২০০৪ সালে এই হার ছিলো ১৯ শতাংশ। পক্ষান্তরে ২০০৫ সালে আয়ের ভিত্তিতে নিচের দিকে থাকা ৫০ শতাংশের হাতে ছিলো মোট জাতীয় আয়ের মাত্র ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৪ সালে এই হার ছিলো ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
ক্ষুধা-পীড়িত ও গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার গত ১৪ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে জানিয়েছে, ২০০৬ সালে দেশজুড়ে সাড়ে ৩৫ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধায় কষ্ট পেয়েছে। এদের মধ্যে ১২ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ছিলো শিশু। ২০০৫ সালের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ লক্ষ ৯০ হাজার। রয়টার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ১১ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য অনিশ্চিয়তায় ভূগছে। স্বাস্থ্য-সুবিধার ক্ষেত্রেও দেশটির অবস্থা হতাশাকর। ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোকে উদ্ধৃত করে রয়টারের দেয়া তথ্যমতের ৪৭ মিলিয়ন লোক হেলথ ইন্সুরেন্সের বাইরে আছে।
বর্ণবাদের ব্যাপারে চীনা প্রতিবেদনে বলা হয় কৃষ্ণাঙ্গ ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের স্থান মার্কিন সমাজের নিচের দিকে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৭ সালের আগস্ট মাসের হিসাব-মতে, কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলোর গড় আয় ৩১,৯৬৯ পাউন্ড, যা অ-হিস্পানিক শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ৬১ শতাংশ কম। অন্যদিকে, হিস্পানিক পরিবারেরগুলোর আয় হচ্ছে ৩৭,৭৮১ পাউন্ড, যা অ-হিস্পানিক শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ৭২ শতাংশ। কাজের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের ব্যাপারটি লক্ষণীয়।
ইউএস লেবার ডিপার্টমেন্টের নভেম্বরের ২০০৭ সালের হিসাব উল্লেখ করে চীনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। অ-হিস্পানিক শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে এ-হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। হিস্পানিকদের ক্ষেত্রে এ-হার ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ন্যাশনাল আরবান লীগের তথ্য-প্রদান করে চীন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গদের (বিশেষতঃ পুরুষ) কারারুদ্ধ হবার সম্ভাবনা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ৭ গুন বেশি।
প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে নারী ও শিশুদের পরিস্থিতিও বেশ উদ্বেগজনক। হিসাব অনুসারে, জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী হলেও, একশো আসনের সিনেটে নারীর সংখ্যা মাত্র ১৬। পক্ষান্তরে ৪৩৫ আসনের হাউস অফ রিপ্রেজেনটেভিসে নারী আছেন ৭০ জন। অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভাতে নারীর সংখ্যা ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্মক্ষেত্রেও ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার মার্কিন নারী। ২০০৬ সালে ২৩,২৪৭টি লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক তৎপরতার অভিযোগ পেয়েছে দেশটির ইক্যুয়াল এমপ্লয়মেন্ট অপারচুনিটি কমিশন, যা সর্বমোট বৈষম্য সংক্রান্ত অভিযোগের ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ।

শিশুদের অবস্থাও খারাপ দেশটিতে। হাউস্টন ক্রনিক্যাল পত্রিকা জানিয়েছে, জাতিসংঘের জরিপ অনুসারে বিশ্বের ২১টি সর্বাধিক ধনী দেশের মধ্যে শিশু-কল্যাণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান ২০তম। চীনের প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীদের করুনতম এক চিত্র। ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের তথ্য-মতে, ১৮ বছরের কম বয়েসী ১ থেকে ৩ মিলিয়ন নারী দেহবিক্রিতে নিযুক্ত আছে। এফবিআই’র তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রে দেহব্যবসায় জড়িত নারীদের ৪০ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক।

বিস্তারিত