ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

আমার অনেক আগের একটা লেখায় দেশের নাগরিকদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে লিখেছিলাম যার হেডলাইন ছিল – “এত দেশ দেশ করে কি হবে দেশ আমাদের কি দিয়েছে” – হেডলাইন টি যেটাই অর্থবহন করুক না কেন বিষয়বস্তু ছিল আমাদের নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই লেখাটা আমার ব্লগ থেকে ডিলেট হয়ে গিয়েছে বা ভুলবশত ডিলেট করে ফেলেছি তাই লেখার থিমটা ঠিক রেখে কিছুটা পরিমার্জন করে পাঠকের উদ্দেশে পুনরায় প্রেরণ করলাম।

আমাদের দেশে অনেক বিচক্ষণ, চিন্তাশীল ও দেশপ্রেমি ব্যাক্তিত্ব আছেন যারা সর্বদাই দেশকে নিয়ে ভাবেন, দেশের ভালর জন্য কাজ করেন এবং নাগরিকদের চেতনা বৃদ্ধি ও মূল্যবোধের জন্য লিখে ও বলে থাকেন। সুবিশাল জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা, কর্মসংস্থান, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন এতোগুলো বিষয়ের সার্বিক ও পারিপার্শ্বিক উন্নীত পরিবর্তনের সাথে দেশের উন্নয়ন অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। তাই অল্পকিছু চিন্তাশীল ব্যাক্তি ও সরকারের অঙ্গপ্রতঙ্গ মিলিয়ে একসাথে কাজ করলেও নাগরিক ও দেশের উন্নয়ন পুরোপুরি তরান্বিত করা সম্ভব নয়।

যতক্ষণ আমরা নিজেদের নাগরিক চিন্তাবৃত্তির পরিধির আকার বৃদ্ধি না করি, যদি আমরা দেশের উন্নয়নে ভুমিকা না রাখি, যদি আমরা আমদের নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন না করি, যদি আমরা আমাদের নিজেদেরকে আত্মমর্যাদাশীল ব্যাক্তি হিসেবে গড়ে না তুলি।

আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে ধাবিত হচ্ছি এবং সুনির্দিষ্ট মিশন ও ভিশন নিয়ে এগিয়েও যাচ্ছি যা আমাদেরকে দেশের নাগরিক হিসেবে গর্বিত করতেছে এবং নতুন ভাবে স্বপ্ন বুননের পথ প্রদর্শন করতেছে। যদিও সবাই জানি পথ বহুদুর কিন্তু দূরলক্ষ্যবস্তু স্থির করে পথচলায় যতটুকু পথ অতিক্রম করা যায় সেটাই তো ভাল।

ঢাকায় কিছু জনবহুল এলাকায় ফুটপাথ দিয়ে চলতে গেলে যে পরিমান দুর্গন্ধের মধ্যদিয়ে যেতে হয় তা আবর্জনা ফেলানর কন্টেইনার বা স্তূপের দুর্গন্ধ থেকে কম না, ভিক্ষুক থেকে রিকশাওয়ালা – পথচারী থেকে চাকুরিজিবি ও ব্যাবসায়ি সবাই জনসম্মুখে দাড়িয়ে প্রসাব করতেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেই বিশুদ্ধ পানিতে নিজের জুতা বা পা পবিত্র হচ্ছে তাতেও থামার জো নেই, লজ্জার – ‘ল’ টা হয়তো বাসায় ভুলকরে রেখে বেরিয়েছে কিন্তু পাশেই সরকারিভাবে লাগানো টয়লেট যে ডাকতেছে আমাকে ব্যাবহার করুন সেটাও কি আঁখি হতে বহুদুর।

সরকারের অপ্রতুল ব্যাবস্থাকে পাশকাটিয়ে যাওয়ার উপায় নাই কিন্তু আমরা আমাদের মানসিক প্রবৃত্তিটাকে উন্নত করলে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কি খুবই কঠিন!

ঢাকাসহ অন্যান্য ছোটবড় শহরগুলতে ‘জ্যাম’ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সরকার সাদ্ধের মধ্যে পরিকল্পিত ভাবে যতটুকু করার কথা তার পুরটা হয়তো করতে পারতেছেনা কিন্তু আমরা কি দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের কাজটুকু সঠিকভাবে করতেছি!

বাসের ড্রাইভারগণ যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তুলেন এবং পেছনে জ্যামের পাহাড় দাড়িয়ে যায় যা দেখার কেউ নেই বলেই মনেহয় কিন্তু এই যাত্রী তো আমরাই, আমাদের জন্যই তো ড্রাইভার বাস থামান (ড্রাইভার সাহেবের দোষ বা আইন অমান্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ অবশ্যই) তাই আমরা একটু সাবধানতা অবলম্বন করে বাসস্টপ এ দাড়িয়ে থাকলেই তো বাস আমাদের কাছেই আসবে এবং যাত্রী নামাবে ও তুলবে।

আবার যারা নিজেরা গাড়ি ড্রাইভ করি তারাও তো নিজের ইচ্ছেমত যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করি, লংরুটে সবাই আগে যাওয়ার চেষ্টা করি, দ্বিমুখী রাস্তায় কেউ কারও পেছনে না দাড়িয়ে কে কাকে অতিক্রম করে একটু আগে যাওয়া যায় এবং পরক্ষনে একদিকের পুররাস্তা বন্ধকরে দিয়ে একজন আরেকজনকে গালি দিয়ে মুখটাকে সুদ্ধ করি।

আমরা চাইলেই কি লঘু জ্যাম কমাতে পারিনা, অন্যকে বকাবকি না করে নিজেরা একটু আত্মশুদ্ধি করে নিয়ম নীতি মেনে চললেই দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব। নিজেরা অযথাই হর্ন না বাজিয়ে অন্যকে নিরুথসাহিত করলেই অনেকেই কানে দীর্ঘদিন শুনবেন এবং আমাদের ছেলে-মেয়েরাও বা বৃদ্ধ মানুষজনও একটু পরিত্রাণ পাবেন।

রাস্তা পারাপারে ফুটওভারব্রিজ থাকার পরেও আমরা তা ব্যাবহারে সঙ্কীর্ণ মনভাবের পরিচয় দিয়ে থাকি, অন্যভাবে রাস্তা পারাপার করতে গিয়ে কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে অথবা জ্যাম লাগতে পারে তার থোড়াই কেয়ার! চলার পথে এক মিনিট থামার সময় আমাদের নাই কিন্তু দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মাসের পর মাস হাসপাতালে পড়ে থাকলেও কোন সমস্যা নাই।

আবার ফুটপাথ ধরে পথচারী হেটে চলবে এটার জো নেই যখনি একটু জ্যাম শুরু হবে আমাদের “বাইক রাইডারগণ” মহাধুমধামে ফুটপাথে দেন বাইক উঠিয়ে, আপনি-আমি একটু সাইড দিতে দেরি করলেই হর্ন বাজিয়ে কানের ময়লা পরিষ্কার করে ছাড়বেন। কে তাদের কান দুটি ধরে একটু বকিয়ে দিবেন আরে আহাম্মক এটা তোর চলার রাস্তা না!

একজন বিদেশী রাস্তা দিয়ে হাঁটলে তার পিছনে ২-৩ টা ছেলে-মেয়ে ভিক্ষার জন্য জামা-কাপড় টানা-টানি করে আর আমরা সবাই মজা করে দেখতে থাকি, সাথে দায়িত্তে থাকা পুলিশও। বিদেশীদের টাকা নিচ্ছে নিক তাতে তো আমাদের দেশের উন্নয়নই হচ্ছে এটাই মনে হয় ভাবি। আসলেই কি তাই? এতে করে ওই বেচারারা বিরক্তিকর situation -এ পড়তেছে আর মনে মনে ভাবে বাবা কন দেশে আসলাম! তারাই তো আমাদের দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, একজন যাবে আর একজন পাঠাবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

আমরা নিজেরাই নিয়ম ভেঙ্গে অনিয়মের কাজ করি, ট্রাফিক আইন না মেনে জ্যাম সৃষ্টি করি, অযথাই রাস্তায় থুথু ফেলি, কাজে অকাজে নাকে আঙ্গুল দিয়ে ময়লা বের করি আবার নিজেরাই অন্যকে দেখে গালি দিয়ে বলি – শালা বাঙ্গালীদের স্বভাবটাই এমন। তাদের উদ্দেশে বলতে ইচ্ছে করে – আরে মহাশয় আপনার বাবা-দাদারা কি উর্দুভাষী পাকিস্তানি ছিলেন!

বদভ্যাস গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অভ্যাসে, তাই নিজেদের কে নিয়ে একটু ভাবার সময় এখনি। দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদেরও সেলফ উন্নয়ন করাটা জরুরি। যে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছি তা থেকেও আর একটু বেশি করার সময় এখনি। অন্যের কাজের মূল্যায়ন করার আগে আমাদের নিজেদের কাজের মূল্যায়ন করার সময় এখনি। আমাদের বিবেক কে জাগ্রত করার সময় এখনি।

সর্বোপরি আমাদের সবার মূল্যবোধ, চেতনাবোধ, নাগরিকবোধ ও দেশাত্মবোধ কে জাগ্রত করার সময় এখনি।