ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

২৫শে মার্চের ভয়াল কালো রাত্রিতে ঘুমন্ত-নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর পাকিস্তানি হানাদার-জালিম বাহিনীরা যে নির্মম, বর্বর, অমানুষিক, হিংস্র তাণ্ডব ঘটিয়েছিল তার পুরটা কেউ কোনদিন বর্ণনা করতে পারবেনা কারণ হিংস্রতার পুরোটাই ছিল রাতের অন্ধকারে, কোন পূর্বসতর্কতা ছাড়াই – হঠাৎ আক্রমণ। আমরা বর্তমান প্রজন্ম তৎকালীন হিংস্রতার শিকার লাখো মানুষের মধ্যে হাতেগোনা কিছু মানুষের রক্তিম বর্ণনায় শুনেছি, ২-১ টি ভিডিওতে দেখেছি, কিছু মানুষের লেখায় পড়েছি এবং উপলব্ধি করেছি এবং যতই শুনেছি বা পড়েছি ততোই বীভৎসতার গভীরতা বেড়েছে।

(অনলাইন থেকে সংগৃহীত) তেমনি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের হত্যাযজ্ঞের সময় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমানে শেরাটন) এ ছিলেন নিউয়র্ক টাইমস এর সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ। সেই রাতের বর্ণনা তার ভাষায়-

~~ ডেটলাইন: ঢাকা ২৫ সে মার্চ ১৯৭১~~

৭৫ মিলিয়ন মানুষের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ধ্বংস করার জন্য নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাকবাহিনী কামান ও ভারি মেশিনগান ব্যবহার করছে। কোন সতর্কতা ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতে আক্রমণ শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা, সেনাবাহিনীতে রয়েছে যাদের সংখ্যাধিক্য, প্রদেশিক রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন শক্ত ঘাঁটি অবরোধের উদ্দেশ্যে।

কত নাগরিক আহত বা নিহত হয়েছে সেটা জানার কোন উপায় নেই। প্রদেশের বাদবাকি অংশে কী হচ্ছে তারও কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ঢাকা আক্রমণের আগে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য ও নাগরিকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথমদিকে গোলাগুলি চলছিল বিক্ষিপ্ত, তবে রাত একটার দিকে তা জোরদার ও বিরামহীন হয়ে ওঠে এবং প্রায় তিনঘন্টা ধরে এমনি চলে। প্রাণের ভয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আটকে থাকা বিদেশি সংবাদদাতারা কামানের গোলাবর্ষণের আগুন দেখতে পেয়েছেন, শুনেছেন এর শব্দ।
উত্তর ঢাকায় অবস্থিত আমাদের হোটেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বাঙ্গালীদের সংখ্যাধিক্যসম্পন্ন আধা-সামরিক বাহিনী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস- এর ব্যারাকসহ শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল দহনযজ্ঞ দেখা যাচ্ছিল।
আজ খুব সকালে যখন ৩৫ জন সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখনও গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল এবং ইতস্তত আগুন জ্বলছিল।
“হায় আল্লাহ, হায় আল্লাহ,” হোটেলের জানালা থেকে এসব দেখে একজন পাকিস্তানি ছাত্র বলছিল, “ওদেরকে মেরে ফেলছে। ওদেরকে জবাই করছে”।

ঘরে ঘরে অগ্নিসংযোগ

সামরিক ট্রাকের বহরে কঠোর পাহারায় বিমানবন্দরের দিকে যেতে যেতে সাংবাদিকরা দেখেছিলেন সৈন্যরা গরীব বাঙ্গালীদের আবাস রাস্তার ধারের বস্তিগুলোতে আগুন জ্বালাচ্ছিল। স্বশাসনের আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে এই বস্তিবাসী বাঙ্গালি। বৃহস্পতিবার রাতে সামরিক অভিযানের শুরু থেকে সৈন্যরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় “জিন্দাবাদ” ধ্বনি দিয়ে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মেশিনগান ও রিকয়েলেস রাইফেলে প্রথমে দালানকোঠায় গোলাগুলি ছোঁড়ে ওপরে গোটা অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

বিদেশি সাংবাদিকরা সকলেই অবস্থান করছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। কী ঘটছে বোঝার জন্য বাইরে যেতে চাইলে ব্যাপকভাবে মোতায়নকৃত সেনাবাহিনী তাদের জোর করে ভেতরে ঠেলে দেয় এবং বলে ভবনের বাইরে পা বাড়ানোর চেষ্টা নিলে তাঁদের গুলি করা হবে।হোটেলের আশেপাশে গোলাগুলি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং রাত একটার দিকে গোটা শহরেই গুলি বর্ষণের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।

১ টা ২৫ মিনিটে বাইরের মিলিটারি গার্ডদের হুকুমে হোটেলের টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়। একই সময়ে টেলিগ্রাফ টাওয়ারের বাতি নিভে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভারি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে।

বাজার আক্রমণ

রাত ২-১৫ মিনিটে মেশিনগান বসানো একটি জিপগাড়ি হোটেলের সামনে দিয়ে ময়মনসিংহ রোডে ওঠে এবং শোপিং সেন্টারের সামনে থেমে দোতলায় জানালার দিকে নিশানা করে। এক ডজন সৈন্য পায়ে হেটে জিপের পিছু পিছু অবস্থান নেয়। তাদের কারো কারো কাঁধে রকেট জাতীয় অস্ত্র। দোতলা থেকে চি\কার ভেসে আসে, “বীর বাঙ্গালি এক হও” এবং সৈন্যরা ঝাঁকে ঝাঁকে মেশিনগানের এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণে ভবন ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। এরপর সৈন্যরা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে শপিং সেন্টারের পাশের গলিতে ঢোকে এবং পথ-আটকে-রাখা গাড়িগুলো উলটে ফেলে দেয়। সৈন্যদের হাতের টর্চের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল এইসব দৃশ্য এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনালের একাদশ-তলা থেকে দর্শনরত সাংবাদিকদের কাছে এসব ছিল এক অবিশ্বাস্য নাটক।

সৈনিকরা যখন গলির ভেতরে গুলি ছুঁড়ছিল তখন প্রায় ২০০ গজ দূরে থেকে ১৫-২০ জন বাংগালি তরুণের একটি দল তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তারা সৈন্যদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল, তবে মনে হচ্ছিল তারা নিরস্ত্র, তাদের কারো হাতে কিছু নেই।
জিপের ওপরের মেশিনগানের নিশানা ঘুরে গেল তাদের দিকে এবং শুরু হলো একটানা গুলিবর্ষণ। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সজ্জিত সৈন্যরাও যোগ দিল সাথে। দুইপাশের ছায়াময় অন্ধকারে সটকে পড়লো বাঙ্গালী তরুণেরা। কেউ আহত নিহত হলো কিনা এখান থেকে তা ঠাহর করা অসম্ভব।

এরপর সৈন্যরা আবার গলির দিকে দৃষ্টি ফেরালো। একটি গ্যারেজে আগুন লাগিয়ে এগিয়ে গেল। দৃশ্যত তাদের মূল লক্ষ্য, সেনাবাহিনীকে কটাক্ষকারী শেখ মুজিবের কড়া সমর্থক ইংরেজি পত্রিকা দি পিপল এর দপ্তর ও ছাপাখানা।
পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষা উর্দুতে চিৎকার করে তারা ভেতরের লোকদের আত্মসমর্পণ নতুবা মৃত্যুবরণ করার হুশিয়ারি জানালো। কোন জবাব মিললো না, ভেতর থেকে কেউ বের হয়েও এলো না। এরপর সৈন্যরা ভবনের দিকে তাক করে রকেট ছুঁড়ে মারলো এবং মেশিনগান ও হালকা অস্ত্রদিয়ে গোলাগুলি শুরু করলো। তারপর প্রেস ও যন্ত্রপাতি ভাংচুর করে ভবনে আগুন লাগিয়ে দিল।
আবার ভেতরে এগিয়ে গিয়ে গলিতে যে সকল দোকান ও ঝুপড়ি ছিল তাতে তারা অগ্নিসংযোগ করলো এবং অগ্নিশিখা দ্রুত দোতলা ভবনের মাথা ছাপিয়ে উঠলো।
রাত চারটার অব্যাহতির পর আর্তচিৎকার কিছুটা থিতিয়ে পড়লো, তবে কামান ও মেশিনগানের গোলাগুলি বর্ষণের বিক্ষিপ্ত আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। অনেক দূর থেকে ছোড়া ট্রেসার বুলেট হোটেলের পাশ দিয়ে সরে যাচ্ছিল।
৪-৪৫ মিনিটে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর হেড কোয়ার্টারের দিকে আরেকটি বড় অগ্নিকান্ড দেখা গেল।
৫-৪৫ এর দিকে সকালের ধূসর আলোয় ছটি চৈনিক টি-৫১ ট্যাঙ্কে সয়ারি সৈন্যরা ঘর্ঘর করে শহরের দিকে এগিয়ে গেল এবং রাস্তায় টহল শুরু করলো।
গতকাল সারাদিন এবং আজ সকালে সাংবাদিকদের বহিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত থেকে থেকে দহন ও গোলাবর্ষণ চলছিল।
গতকাল সকালে মাথার উপরে হেলিকাপ্টার চক্কর দিয়েছে, নিশ্চিতই তদারকির কাজে। গত নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণকাজের জন্য সৌদি আরব থেকে যে চারটি হেলিকাপ্টার পাকিস্তানকে দিয়েছিল, এই সামরিক অভিযানে সেগুলো ব্যবহৃত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

(তথ্য সূত্রঃ ডেটলাইন বাংলাদেশ নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান, সিডনি শনবার্গ

লেখাটি অনলাইন থেকে সংগৃহীত। “Sydney Schanberg ( সিডনি শনবার্গ)” – “New york Times” এ তৎকালীন সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান) অবস্থান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে “Tears of Bangladesh” নামে ১৯৭১ এর বিভিন্ন সাংবাদিকদের রিপোর্ট সংকলন এ তার অনেকগুলো রিপোর্ট সহ এই রিপোর্ট টিও প্রকাশ পায়)।