ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

অপমৃত্যু ঘটেছে পৌনে ১৩ জনের (১২ জন + পৌনে ১ জন) কথাটি – শ্রদ্ধেয় সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক দৈনিক প্রথম আলোয় তার নিয়মিত কলামে  লিখেছেন।

রামপুরার হাজীপাড়ায় ঝিলের ওপর গড়ে ওঠা একটি দ্বিতল টিনশেড বাড়ি দেবে গিয়ে একই পরিবারের চারজনসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন এই খবর টি পুরনো যা গত বুধবার ঘটেছিল। আজ জানলাম সেদিন আদতে মৃত্যু ঘটেছিল পৌনে ১৩ জনের।

জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন এভাবে – “সবুজ মিয়ার স্ত্রী রোখসানা ছিলেন ছয় মাসের গর্ভবতী। অনাগত শিশুটি তার পেটে হাত-পা ছুড়ত। ছেলে হোক মেয়ে হোক, সে তার সন্তানের একটি নামও ঠিক করে রেখেছিল। নাতনি বা নাতির জন্য পুরোনো কাপড় জোড়া দিয়ে সবুজের মা কিছু ছোট ছোট কাঁথাও সেলাই করে রেখে থাকবেন। কয়েক মাস পরেই শিশুটি পৃথিবীতে আসত। নিজের ভাড়া ঘরের ভেতরে বসে সবুজের বাবা-মা ও স্ত্রী ঝিলের পানিতে ডুবে মারা যান। তাঁদের সঙ্গে তাঁদের বংশধর জন্মের আগেই একটি নির্মম ভূখণ্ড থেকে বিদায় নেয়।”

আহা কি নিষ্ঠুর! কি হৃদয় বিদারক! কি মর্মান্তিক!

কিন্তু ওখানে যে বাড়িটি দেবে গেছে, তার কোনো ফাউন্ডেশন ছিল না। রড ও কংক্রিটের পিলারের ওপর লোহার অ্যাঙ্গেল বসিয়ে তৈরি ঘরটির পাটাতন ছিল কাঠের। ওই কাঠের ওপর কংক্রিটের আস্তরণ দিয়ে ছাদ করা হয়। বাড়িটির একতলা পানিতে দেবে যাওয়ায় নিচতলার বাসিন্দারা কংক্রিটের ছাদের নিচে চাপা পড়েন।

আরও অবাক হলাম জেনে যে বাড়িটিতে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সবকিছুরই সংযোগ ছিল। হায় আমাদের দেশ। তার অর্থ হল এই হত্যাকাণ্ডে শুধু ক্ষমতাসীন দলের একজন পাতি নেতাই জড়িত নয় তার সাথে যারা বা যে সংস্থাগুলো পানি- গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছেন তারাও।

কারণ যেখানে বৈধভাবে নির্মিত ও বিশালবহুল আবাসনে সরকার গ্যাস সংযোগ দিতে পারেনা সেখানে ওই অবৈধ বস্তী বা ভবনটিতে কিভাবে সংযোগ পায়!

একজন মনির হোসেন চৌধুরী ক্ষমতার অপব্যাবহার করে সরকারি জমি দখল করে নির্মাণ করেন সেই মৃত্যুকুপটি, যেখানে ১৩ টি তাজা প্রাণ মাসিক নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করে আসছিলেন  অকালে মৃত্যুর স্বাদ নেওয়ার জন্য।

জানাই ছিল প্রশাসন ও সরকার উঠে বসে লাগবে এখন ওই বস্তির উপর, তা অপসারন করার জন্য বা ওখানে নির্মিত অন্যান্য অবৈধ ভবন উচ্ছেদের জন্য। ওই মনির হোসেন সাহেব কে খুঁজে বের করে ধরেও আনতে পারে কিছুদিন পরেই ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কারণ আমরা তো কিছুদিন পরেই ঘটনাটি পুরোপুরি ভুলে যাব। পরবর্তীতে হাজারো মৃত্যুর ভিড়ে এই হত্যাকাণ্ডটি পদদলিত হয়ে যাবে।  প্রসাশনও কেসটি পুরাতন ফাইল হিসেবেই রেখে দিবে অথবা অন্য অজুহাত দেখিয়ে বন্ধও করে দিতে পারে।

শ্রদ্ধেয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ সঠিক বলেছিলেন – আমরা বাঙালিরা হলাম “গোল্ড ফিসের” মত একবার পানিতে ডুব দিয়ে উঠলেই ভুলে যায় আগে কি ঘটেছিল। আমাদের মেমোরিও তার কাছাকাছি বৈকি।

তা না হলে এর আগেও মোহাম্মদপুরের জাফরাবাদ, তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িসহ অনেক এলাকায়ই এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘরবাড়ি দেবে গিয়ে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। প্রতিবারই এভাবে প্রাণহানির পর প্রশাসনের টনক নড়ে। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চেয়ে মিছিল মিটিং করে, মানব মন্ধন করে, সভা- সমাবেশ করে এবং তখন এসব ভবন নির্মাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় (যদিও ক্ষমতার জরে পরক্ষনেই উনারা বের হয়েও যায়), উচ্ছেদ করা হয় ভবন। কিন্তু পরে আবার সবকিছু ভুলে যায় প্রশাসন, পাশাপাশি আমরাও।

এর এভাবেই মৃত মানুষের সংখ্যা গুনবে সবাই – খুঁজে বের করবে আমাদের মিডিয়া, প্রশাসন  ও ফায়ার সার্ভিস এবং দুই – একজন সমাজসেবক ও সুনাগরিক হয়তো আরেকটু এগিয়ে গেয়ে আমাদের বলবেন না মৃতের সংখ্যা ১২ লক্ষ নয় পৌনে ১৩ লক্ষ!

ফেসবুক ঃ https://www.facebook.com/rmorshad?ref=hl

২১/০৪/২০১৫ সময়ঃ সন্ধ্যা ৭ ঘটিকা।