ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

শ্রদ্ধেয় পাঠকবৃন্দ – সমাচারের শুরুতে জানাই মহান মে দিবসের শুভেচ্ছা! দুঃখিত মে দিবসের আবার শুভেচ্ছা হয় নাকি? জ্বি! আজ্ঞে হয়! পহেলা মে তে হয়। এই একটি দিনে হয়! এই দিনটিতে আমাদের যত দিনমজুর ভাইবোনেরা আছেন, আমাদের যত শ্রমিক ভাইবোনেরা আছেন, আমাদের দেশে যত শ্রমজীবী মানুষ আছেন- তাঁরা সবাই তো এই একটি দিনেই শুভেচ্ছা পেয়ে থাকেন আমাদের খবরের কাগজগুল থেকে! আমাদের টেলিভিশনে প্রচারিত মহান মে দিবসের অনুষ্ঠান গুলো থেকে! টেলিভিশনের আকর্ষণ বিভিন্ন বুজুর্গ ও সুনাগরিক ব্যাক্তিগণের মাধ্যমে ‘টকশো’ নামক অনুষ্ঠান গুলো থেকে এবং এই একটি দিনেই তো মালিকগণ তাদের কর্মচারীদের খোঁজখবর নেন এবং মহান মে দিবসের শুভেচ্ছা জানান!

এবার নিশ্চয়ই বুঝেছেন।

মে দিবস হল শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন, শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার দিন, কাজের সুন্দর পরিবেশ পাওয়ার দিন, মালিকদের গোলামী থেকে মুক্ত হওয়ার দিন, সমমানে ও সমপরিবেশে আত্মমর্যাদা নিয়ে সমাজের সবার সাথে বসবাস করার দিন। কিন্তু তাঁরা কি পাচ্ছে?

টেলিভিশন বা পত্রপত্রিকা গুলোকে মে দিবসে কিছু খবর বা প্রোগ্রাম করতেই হয় তাই তাঁরা করে এবং লেখে। এগুলোতে ওনাদের দায়িত্বের প্রয়োগ যতটুকু হয় তার থেকে বেশি থাকে লাভের হিসেব অথবা কিছু রিপোর্টার তার ক্যারিয়ার কে ঊর্ধ্বগামী করার জন্য কিছু এক্সক্লুসিভ খবর জনসম্মুখে প্রকাশ করে যেমন- চা বাগানে কাজ করা হাজারো শ্রমিকের করুণ জিবনাতিপাত। তাদের চৌদ্দপুরুষ কিভাবে এসব বাগানে গোলামী করেছেন এবং তারাও করে চলেছেন এসব খবর। অথবা বগুড়ায় মিল শ্রমিকদের (মহিলা মাত্র ৪০ টাকা এবং পুরুষ ৭০ টাকা) অতি অল্প বেতনে তাদের পরিবার নিয়ে কাটানো কষ্টের কথা। শিশু শ্রমিকদের অমানবিক কষ্ট ও নিতান্তই অল্প পারিশ্রমিক পাওয়ার খবর। তাদের শিক্ষা তাদের বাসস্থান তাদের পরিবার তাদের সুস্বাস্থ্য তাদের পরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে খবর প্রচার করে।

এই একটি দিনে দিনমজুরদের কাছে গিয়ে কোন রিপোর্টার প্রশ্ন করে ভাই আজ তো মহান মে দিবস আপনি বা আপনারা আজ কাজে কেন? উত্তরে ওই শ্রমিক ভাই টি বলে স্যার মে দিবস হইলে কি করুম কাম তো করতে হইব নাইলে খামু কি? পরিবার চলব ক্যামনে?

কিছু সাংবাদিক ভাই দের কে প্রশ্ন করতে দেখলাম কয়েকটি কারখানার মালিক দের, শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন কে বা তাদের নেতাদের। সরকারের দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রীদের। মালিকদের প্রতি প্রশ্ন- আপনারা শ্রমিকদের জন্য কি কি করেছেন? উত্তরে তাঁরা জানাল – হাতি- ঘোড়া সব করেছি!

শ্রমিক নেতাদের প্রতি প্রশ্ন – আপনারা তো শ্রমিক দের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেচলেছেন তো আপনারা কি মনে করেন শ্রমিকদের জীবন মান কতটুকু উন্নত হয়েছে? তাঁরা কি ন্যায্য পারিশ্রমিক পাচ্ছে? উত্তরে তাঁরা জানাল – না কোন শ্রমিক পারিশ্রমিক পায় না! কাজের সুস্থ পরিবেশ পায় না! আমরা শ্রমনীতির পরিবর্তন চাই! – যা পুরটাই ওনাদের মুখস্থ বিদ্যা। বলতে হয় তাই বলে। কারণ ওই নেতারাও তো চায় না শ্রমিকদের উন্নয়ন হক! তাঁরা কাজের ন্যায্য মজুরি পাক! সবই যদি পায় তাহলে তাদের থেকে আর কি হবে? বাড়ি গাড়ি ক্যামনে হবে?

আমাদের দায়িত্তপ্রাপ্ত মাননীয় মন্ত্রীগণের প্রতি মোটামুটি সেসব প্রশ্নেরই পুনরাবৃত্তি – উত্তর তো সবারই জানা! যাক তাও বলি – হাতি ঘোড়ার জন্য বাজেট দিয়েছি- কাজের উন্নত পরিবেশের জন্য সবমহল কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে! আগামীতে শ্রমিকদের বেতন কাঠামোর পরিবর্তন করা হবে! …….. থাক স্যার আর কিছু বলতে হবে না!

মে দিবস আজ মহান হয়েছে শ্রমিকদেরই আত্মত্যাগে। তাঁদেরই রক্ত দিয়ে। তাঁদেরকেই জুলুম-অত্যাচার ও নিপীড়নের মধ্যদিয়ে কিন্তু আমাদের অনেক রিপোর্টার হয়তো তা জানেন না! তাই কিছু চিতাচরিত প্রশ্নই ঘুরে ফিরে করে থাকেন। এই একটি দিনেই তাদের মনে পড়ে শ্রমিক রা ন্যায্য মজুরি পায় না! কাজের সুস্থ পরিবেশ পায় না! মালিকরা তাদের উপর নিপীড়ন করেন! প্রতারনা করেন! সুস্বাস্থ্য পায় না- সু চিকিৎসা পায় না! ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারে না ইত্যাদি।

প্রতি বছর তাঁরা ভুলে যায় – চোদ্দ পুরুষ ধরে চা বাগানের শ্রমিক রা গোলামি করে চলেছে! ছেলেমেয়েদের কে পাঠানোর মত কোন স্কুল তাদের নাই। অন্যকোন কাজ করারও অনুমতি তাদের নাই।

তাঁরা ভুলে যায় – বগুড়া সহ সারা দেশেই মিল শ্রমিক রা অতি অল্প বেতনে কাজ করে! চারকল কারখানায় বছরের পর বছর শিশু শ্রমিক রা কাজ করে নাম মাত্র টাকার বিনিময়ে!

তাঁরা ভুলে যায় – পোশাক কারখানা গুলোতে শ্রমের সঠিক মূল্য লক্ষ্য লক্ষ্য শ্রমিক পায় না! ট্রেড ইউনিয়নের নামে কিছু অসাধু নেতার বাড়ি গাড়ির ফিরিস্তি!

তাঁরা ভুলে যায় – কৃষি শ্রমিক রা সারাদিন কাঠ ফাটা রোদে কাজ করেও শ্রমের সঠিক মূল্য পায় না!

শিশুশ্রম যে বেআইনি এবং বয়স অনুযায়ী তাঁরা যে কোঠর পরিশ্রম করে এবং এবার মজুরিও নামে মাত্র পায় এটাও তাঁরা ভুলে থাকে সারা বছর ধরে এবং শুধু তাদের মনে পড়ে মহান মে দিবসে!