ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

১।
মহাকাশ যাত্রীদের মন খারাপ হওয়াটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। আমারও হয়। সেটা মনে হয় এই মহাকাশ যানের অন্যদের তুলনায় একটু বেশি।
অবশ্য এই মহাকাশযানে মানুষ খুব বেশি নেই। শীতল ঘরে শুয়ে থাকা এক তরুনী নাম নিকি, আমি আর আমাদের দলনেতা। দলনেতাকে এখানে ডাকা হয় “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী”। দলনেতার নাম “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী” রাখার একটা কারণ আছে। এই শতাব্দিতে যেসকল মহাকাশযান মহাশূন্যে পাঠানো হয় সেগুলোতে অতীত পৃথিবীর কিছু ছোঁয়া দিয়ে দেওয়া হয়। যাতে অন্য কোন মহাজাগতিক প্রাণী আমাদের সাথে মিশলে আমাদের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে একটা ধারনা পায়। যেমন এই মহাকাশযানে দলনেতার নাম “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী” রাখা হয়েছে প্রাচীন পৃথিবীর বাংলাদেশ নামক একটা দেশের একটা গুরত্বপূর্ণ একটা পদবী অনুসারে। এরকম বিচিত্র নিয়ম বিজ্ঞান একাডেমী কেনো আবিষ্কার করলো কে জানে!

যা বলছিলাম, আমার মন খারাপ। এই মহাকাযানটিতে বিনোদনের সব রকম ব্যাবস্থাই রাখা হয়েছে। তারপরেও একজন রক্ত মাংসের মানুষের অভাব আমি প্রায়ই অনুভব করি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন। তবে তিনি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়া বের হন না। আর উনার সাথে আমার বোঝাপড়াও বেশি ভালো না। এই মহাকাশযানের নিয়ম অনুসারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আদেশ অমান্য করা ৫ম মাত্রার অপরাধ। এবং এই অপরাধের শাস্তিও ভয়াবহ। না হলে আমি কবেই………

মন খারাপ হলে আমি সিডিসি-র সাথে কথা বলি। সিডিসি ৭ম মাত্রায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার। সব রকম মানবিক গুনাগুনই এর মাঝে দেওয়া হয়েছে।
আজকেও কথা বলছিলাম। কথার মাঝখানে সিডিসি হঠাৎ সিকিউরিটি এলার্ম বাজাতে শুরু করলো। সিডিসির এলার্ম মানে ভয়াবহ বিপদের আশংকা। আমি তৎক্ষনাৎ সিডিসি-কে ডিটেইলস জানাতে বললাম। সাথে সাথে হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে বিস্তারিত লেখা দেখা গেলো-
“৭ম মাত্রার বিপদ। হিংস্র কিন্তু শক্তিশালী মহাজাগতিক প্রাণীর আক্রমন। মহাকাশ যান দ্ধংশ হওয়ার সম্ভবনা অনেক। বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার সম্ভবনা ২.১০০৯ ভাগ।”

৭ম মাত্রার বিপদে দলনেতা মানে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বের হওয়ার কথা। কিন্তু বিচিত্র কারনে তিনি বের হচ্ছেন না। আমি বুঝতে পারলাম যা করার আমাকেই করতে হবে। আমি সিডিসির সামনে বসে কিছু কোড টাইপ করলাম। এই কোডগুলার প্রবেশের সাথে সাথে ৮ম মাত্রার সিকিউরিটি সিস্টেম একটিভ হয়ে গেলো। মহাজাগতি প্রাণীর আক্রমন এই সিকিউরিটি সিস্টেমকে ভেদ করতে পারবে বলে মনে হয় না।

২।
সিডিসেকে আমি সর্বশেষ অবস্থা জানাতে বললাম। হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে যে মেসেজ উঠে এলো সেটা অনেকটা এরকম।
“সপ্তম মাত্রার সিকিউরিটি সিস্টেম পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। মহাকাশ যানটির অনেক অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। মহাজাগতিক প্রাণী এবার ফেরত গেছে। কিন্তু অতি দ্রুত আবার ফিরে আসবে। পরেরবার সিকিউরিটি সিস্টেম ১১ চালু করতে হবে। ১১ চালু হলে মহাকাশযানে জ্বালানী অর্ধেক শেষ হয়ে যাবে।”

আমি একটা ঢোক গিললাম।

৩।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের ঘর থেকে বের হলেন। সোজা চলে এলেন আমার সামনে। আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলা শুরু করলেন।
“রুখ, টেনশনের কিছু নেই। পরিস্থিতি সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রনে আছে X((।”
আমার একটু হাসি পেলো। পুরো বিপদটা যতটুকু কাটানো গেছে তার পুরোটাই করেছি আমি। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে সান্তনা দিচ্ছেন!

“রুখ, তুমি নিশ্চিত থাকো। মহাজাগতিক প্রাণী আবার এলে তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তাছাড়া সিকিউরিটি ব্যাবস্থা অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে ভালো আছে” 😀
“তাই নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?” আমার মুখে আবারও হাসি খেলে গেলো।
“ হ্যা। অবশ্যই। কোন ধরনের নাশকতা বরদাস্ত করা হবে না। ” B-)

তার কথা মাঝখানেই আবার সিডিসি এলার্ম বাজাতে শুরু করলো। আবার আক্রমন করেছে মহাজাগতিক প্রাণীরা।
এখন কি করবেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?
– “কিছুই করবো না। চুপচাপ বসে থাকবো।”
আমি বললাম, “সে কি!! আপনিই না বললেন- মহাজাগতিক প্রাণী আবার এলে তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে!”
এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেগে উঠলেন।
-শুন রুখ। তুমি কি জানোনা যে দলনেতাকে কোন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করাটা ৮ম মাত্রার অপরাধ? এই অপরাধের শাস্তি কি জানো? ডাইরেক্ট “বন্দুকযুদ্ধ” ;)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাত দিয়ে বন্দুক ধরার একটা ভঙ্গী করলেন।
“আমি তোমার প্রতি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করছি। :|”
আমাই ভয় পেয়ে গেলাম। বন্ধুক যুদ্ধ, ক্রসফায়ার, এগুলো হলো মহাকাশ ইতিহাসের সব চেয়ে প্রচলিত এবং কার্যকরী শাস্তি।

৪।

মহাজাগতিক প্রাণীর দ্বিতীয় দফা আক্রমনে আমাদের মহাকাশযানটা প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেলো। বিদ্যুৎ ব্যাবস্থা প্রায় নুয়ে পড়লো। জ্বালানী অর্ধেকটার বেশী নিয়ে গেলো মহাজাগতিক প্রাণীরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মানে আমাদের দলনেতা তখন পর্যন্ত নির্বিকার। তিনি আস্তে আস্তে বলে যাচ্ছেন-
“পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রনে।
তিনি আরো বললেন- আমি নাকি মহাকাশযানে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছি। আমি নাকি প্রতিহিংসার মহাকাশনীতি অনুসরণ করছি। ;);) তাছাড়া তিনি সিডিসি-কে ব্যান করে দেওয়ারও হুমকি দিলেন।।
আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেলো। এতো বড় কথা! আমার হাতের কাছে একটা রড ছিলো। আমার রডটা হাতে নিয়ে আচমকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাথায় একটা বাড়ি দিলাম।
ওমা!! এ কি!! মাথা থেকে টুপ করে একটা কপোট্রন বেরিয়ে আসলো। তার মানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাথায় কোন মস্তিষ্ক নেই! যা ছিলো তা একটা কপোট্রন!

তৎক্ষনাৎ সি ডি সি আমাকে একটা রিপোর্ট ধরিয়ে দিলো।
“ মহামান্য রুখ। আমি এই মাত্র জানতে পারলাম আসলে এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটা রোবট ছিলেন। আগে থেকে তার মাঝে কিছু প্রোগ্রাম সেট করা ছিলো। তিনি সেই অনুযায়ী কাজ করতেন।
যাই হোক, মহাকাশ যানের নীতিমালা ৪৫৬ অনুযায়ী আপনিই এখন এই মহাকাশযানের দলনেতা। এই প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া যানটি দিয়ে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। আশা করি আপনি পারবেন। আমি সাথে আছি।”

মহাকাশযানের দলনেতা হিসেবে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিলাম শীতল ঘরে শুয়ে থাকা সুন্দরী “নিকি”কে জাগিয়ে তুলতে হবে। এই মেয়েটাকে আমার অনেক আগে থেকেই পছন্দ। এই দীর্ঘ ভ্রমনে নিকি-কে আমার ভীষণ প্রয়োজন।

বিঃ দ্রঃ
* এই মহাকাশযানের প্রথম দলনেতার সংলাপের সাথে আর কারো সংলাপের মিল খুঁজতে গেলে তা নিজ দায়িত্বে খুঁজবেন।
** কিছু কিছু লাইন ইটালিক হয়ে গেছে। এটা যান্ত্রিক ত্রুটি হিসেবে ধরবেন।
*** সজ্ঞানে ড: জাফর ইকবাল স্যারকে ফলো করার চেষ্টা করেছি। বাট ফলাফল হলো- “কচু হয়েছে”।