ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড

ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড জন্ম গ্রহণ করেন হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামে ৬ই ডিসেম্বর ১৯১৭ সালে | জীবিকার তাগিদে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি হল্যান্ডের বাটা কোম্পানিতে জুতা পরিস্কারকারী হিসেবে যোগ দেন | ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের তথা নাৎসী আগ্রাসনের প্রাক্কালে তিনি রাজকীয় ডাচ সিগনাল কোরে সার্জেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং নাৎসী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন | ডাচ এবং জার্মান ভাষায় সমপারদর্শিতার ফলে সহজেই জার্মান হাই কমান্ডের সঙ্গে খাতির জমিয়ে ফেলেন যা তাকে পরবর্তীতে স্বল্পকালিন বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিল | অধিকৃত হল্যান্ডে হিটলারের নাৎসী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ গেরিলা যুদ্ধে রেডিও কারিগর, গোলাবারুদ বিশেষজ্ঞ, গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠায় ডাচ মুক্তি বাহিনীর কমান্ডো কোরের কমান্ডার নিযুক্ত হন |

ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে তিনি পুনরায় তার পূর্ব কর্মস্থল বাটাতে যোগ দেন | মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ছ’মাস পূর্বে ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার টঙ্গীস্থ বাটা কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হয়ে আসেন এবং খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে প্রমোশন পান | ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বর গণহত্যা দেখে তার মনে পড়ে যায় সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের বর্বরতা ও তার গেরিলা যুদ্ধে যোগ দেয়ার কথা | তাই সিদ্ধান্তে উপনীত ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবেন | এর জন্য একটি পরিকল্পনার ছক তৈরী করেন এবং পরিকল্পনামাফিক তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান বাটার পার্সোনেল ম্যানেজার কর্নেল (অবঃ) নেওয়াজকে কোম্পানির কাজে ঢাকায় ডেকে আনেন | পরবর্তীতে এই অবসরপ্রাপ্ত কর্নেলকে এবং নিজের অবস্থানকে (প্রথমত বড় কোম্পানির প্রধান ও দ্বিতীয়ত বিদেশী নাগরিক) কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসারদের তথা জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল নিয়াজি ও জেনারেল রাও ফরমান আলী প্রমুখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন | ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্বর হানাদারবাহিনীর অনেক বড় বড় গোপন তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিকল্পনার কথা নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে বাটার বিশ্বস্থ কর্মচারীদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সমর নায়কদের কাছে পাঠাতেন |

শুধুমাত্র গোয়েন্দা তৎপরতায় ক্ষান্ত হননি তিনি, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য টাকা, ঔষধপত্র, কাপড় এবং অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন, এমনকি কোম্পানির জুতো এবং নিরাপত্তা রক্ষীদের আগ্নেয়াস্ত্রও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন | নিজের ব্যক্তিগত পিস্তলটিও যুদ্ধের কাজে দান করেছিলেন দু’নম্বর সেক্টরের একজন প্লাটুন কমান্ডারকে | তিনি নিজেও সরাসরি দুঃসাহসিক গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন | তার নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে বহু পাওয়ার হাউস ধ্বংস করেছিল এবং হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল |

ওডারল্যান্ড ১৯৭১ সালে গোপনে লুকিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শিশুঘাতী নারীঘাতী বর্বরতার অনেক ছবি তুলেছিলেন, যা বিশ্ব বিবেককে জাগাতে সে সময় যথেষ্ট সাহায্য করেছিল | বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার এই বীরত্বচিত অবদানের জন্য স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার তাকে “বীর প্রতীক” উপাধিতে ভূষিত করেন | পরবর্তীতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ত্ব গ্রহণ করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন | বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিবেদিত এই মহান মানুষটি ১৮ই মে, ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন | পরম শ্রদ্ধার সাথে আমাদের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে অমর হয়ে থাকবেন |

তিনি শুধু বীর নন, একজন কিংবদন্তির মানুষ | বড় হতভাগ্য আমরা বাঙালি জাতি | নইলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অতুলনীয় ভূমিকা নিয়ে কেন কোনো গল্প, উপন্যাস, নাটক লেখা হয়নি ? কেন নির্মান হয়নি চলচ্চিত্র ? যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতক দালালরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পায় অনায়েসে আইনের মারপ্যাচে | অথচ এ দেশের জন্য যুদ্ধ করেও তার সে সৌভাগ্য হয়নি | কৃতজ্ঞতার বোঝা কী এতই ভারী ?

***
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া