ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মুক্তিযুদ্ধকালীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রমুখ রাষ্ট্রের তিনটি নীতি বা আদর্শের কথা বারংবার বলেছিলেন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র | ১৯৭২ সালে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পরে বঙ্গবন্ধু এই তিন নীতির সঙ্গে যোগ করেন আরও একটি : জাতীয়তাবাদ | ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে গৃহীত রাষ্ট্রপরিচালনার চারটি মূলস্তম্ভ – গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ এ অঞ্চলের মানুষের মনে কোনো না কোনো রূপে দীর্ঘকাল ধরে লালিত হয়ে এসেছিল |

আমাদের দেশের এবং বিদেশের কোনো কোনো পন্ডিত এমন মত প্রচার করেছেন যে, বাংলাদেশের যে সরকার মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সে সরকার যেহেতু ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল এবং স্বাধীনতা লাভের জন্য যেহেতু ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার মুখাপেক্ষী ছিল, সেহেতু বাংলাদেশের জনগনের সংস্রবহীন দুটি নীতি – ধম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র – তাঁরা নিজেদের আদর্শ বলে প্রচার করতে এক রকম বাধ্য হয়েছিল কিংবা এক ধরনের আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ ওই নীতি দুটি গ্রহণ করেছিল | এসব কথা যারা বলেন, তারা হয় ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, নয়তো স্বেচ্ছাকৃতভাবে তা অবজ্ঞা করেন | মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে গেলে তাই প্রথমেই সেই ইতিহাসের কাছে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন |

নভেম্বর ৪, ১৯৭২ বাংলাদেশ গণপরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু চার মূলনীতি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, তার লিঙ্কটি এখানে দেখুন |

১৯৪৯ সালে প্রবল পাকিস্তানি স্রোতের বিপরীতে বঙ্গবন্ধুরা মুসলিম লীগের বলয়বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন | এক পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন | আওয়ামী লীগের শরীর থেকে মুসলিম শব্দটি পরিত্যাগ করেছিলেন | ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং মহান ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ একটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল | বঙ্গবন্ধু সব কিছুকে বিবেচনা করেই একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সৃষ্টি করেছিলেন |

যে তরুণ প্রজন্ম মহাজোটকে সরকারে এনেছে তারা শুধু যুদ্ধাপরাধের বিচারই চায়নি, একটি রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রও দাবি করেছে | রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা নাগরিকের ধর্মাচরণের বিরুদ্ধে নয়, পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে | ত্রিশ লাখ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বাইরে হতে পারে না |


২২শে জুন, ২০১১ ধর্মভিত্তিক সংবিধানের বিপক্ষে প্রতিবাদ মিছিল

গত ২৬ জুন ২০১১ দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় একটি লেখা ছাপা হয়েছিল | লেখার শিরোনাম ছিল, ‘সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বহাল এবং শেখ হাসিনার পাকিস্তান যাত্রা’ | শাহরিয়ার কবীর তার এই নিবন্ধে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা তার পিতার জীবন এবং শহীদের রক্তদানের সার্থকতা জলাঞ্জলি দিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভাষায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছেন’ | শাহরিয়ার কবিরের এ নির্মম সমালোচনার মূল কারণ হচ্ছে, চলমান সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সম্প্রতি উত্থাপিত সংবিধান সংশোধন বিলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা হয়েছে এবং সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ রাখা হয়েছে | শাহরিয়ার কবির শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভা অনুমোদিত এ সংশোধনীর তীব্র সমালোচনা করেন | তিনি মনে করেন, এর ফলে পাকিস্তানি জাতীয়তার আলোকেই বাংলাদেশের জাতীয়তার চাকা সামনে ঘুরতে শুরু করছে | শাহরিয়ার এবং তার মতো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে যারা বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তা নিশ্চিত করতে চান তারা বিশেষ করে শেখ হাসিনার হাতে সংবিধানে এমন সব বিধান অন্তর্ভুক্ত করায় কষ্ট পেতেই পারেন | এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে, শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ দেশটিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সেই নেতৃত্ব দেয়ার সময় দেশটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার করেছিল | সেই আলোকেই এ দলটি বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন করেছিল | একই সঙ্গে তিনি একে ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে এ দুটি ধারার অসঙ্গতির কথা বলেছেন | এসব বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রী একে খোন্দকার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ পশ্চাৎযাত্রার প্রতিবাদ করেছিলেন। শেখ হাসিনা তাকে থামিয়ে দিয়েছেন। তিনি সেদিন বলেছিলেন, কাজটি এরশাদ করেছিলেন এবং খোন্দকার সাহেব এরশাদের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন | তিনি তখন কেন প্রতিবাদ করেননি তারও প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা | বিস্ময়কর হলেও এটি বাস্তবতা যে আওয়ামী লীগের আর কোন মহল এর প্রতিবাদ করেনি | এমনকি এ বিল প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-কমিটির উপনেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও কোন ধরনের প্রতিবাদ করেননি | আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউও এখন পর্যন্ত এর প্রতিবাদ করেননি | কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেছেন, আওয়ামী লীগ আবার তার জন্মের ঠিকানায় ফেরত গেল | এটি এখন আওয়ামী মুসলিম লীগ |

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন ছিল | দেশের মানুষের সর্বাঙ্গীণ মুক্তির স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম – সে মুক্তি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক | আমরা ভেবেছিলাম, আমরা এমন একটা দেশ গড়ে তুলতে সমর্থ হবো, যেখানে সর্বাধিক সংস্কার থেকে মানুষের মুক্তি ঘটবে, শোষণ-বঞ্চনার অবসান হবে, প্রত্যেক নরনারীর সৃজনশীলতা অর্গলমুক্ত হবে | সুপ্ত প্রতিভা ও সৃজনশীলতার বিকাশের মধ্য দিয়ে দেশে উন্মোচিত হবে নতুন নতুন দ্বার, তার অগ্রগতি ঘটবে নিত্য নবীন ক্ষেত্রে | আমাদের দুর্ভাগ্য, তা ঘটে নি | আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বপ্ন দেখার সাহসও আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি |

রেফারেন্স : সেক্যুলার ভয়েস অফ বাংলাদেশ ও দৈনিক সংবাদ
ছবি সংগ্রহ : নেট থেকে