ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় : জন্ম – ১৯.০৭.১৮৬৩ (নদীয়া), মৃত্যু – ১৭.০৫.১৯১৩ (কলকাতা)

বিশিষ্ট বাঙালি কবি, নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা, তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ‘ ধনধান্যে পুষ্পে ভরা ‘ গানটির ও ‘ নন্দলাল ‘ কবিতাটির মাধ্যমে | ‘ নন্দলাল ‘ কবিতাটি আমাদের বাংলা পাঠ্য বইতে ছিল | তবে কোন শ্রেণীতে ছিল সেটা এখন আর স্মরণ করতে পারছি না | বয়সের সাথে সাথে স্মৃতিশক্তিও লোপ পাচ্ছে ধীরে ধীরে | ছন্দের যাদুকর খ্যাত সতেন্দ্রনাথ দত্ত, যতিন্দ্র মোহন বাগচী প্রমুখের কবিতার মত ‘ নন্দলাল ‘ ও আমার প্রিয় কবিতাগুলোর মাঝে একটি | তাই কবিতাটির কিছু অংশ তুলে ধরলাম :

‘নন্দলাল তো একদা একটা করিল ভীষণ পণ-
স্বদেশের তরে, যা করেই হোক, রাখিবেই সে জীবন।
সকলে বলিল, ‘আ-হা-হা কর কি, কর কি, নন্দলাল’ ?
নন্দ বলিল, ‘বসিয়া বসিয়া রহিব কি চিরকাল ?
আমি না করিলে কে করিবে আর উদ্ধার এই দেশ ?’
তখন সকলে বলিল- ‘বাহবা বাহবা বাহবা বেশ !’

কবি মাত্র ৫ বছর বয়স থেকেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করেন এবং ৯ বছর বয়স থেকেই তাঁর আনুষ্ঠানিকভাবে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয় | দ্বিজেন্দ্র লাল ১৮৭৮-এ প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। এফ. এ. পাস করেন কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে | হুগলি কলেজ থেকে ১৮৮৩ সালে কলা বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৮৮৪ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে এমএ ডিগ্রি পান | উচ্চ শিক্ষার্থে লন্ডনে গিয়ে তিনি রয়াল অ্যাগ্রিকালচারাল কলেজ ও অ্যাগ্রিকালচারাল সোসাইটি হতে কৃষিবিদ্যায় FRAS এবং MRAC ও MRAC ডিগ্রি অর্জন করেন | ভারতবর্ষে ফিরে তিনি জরিপ ও কর মূল্যায়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং মধ্যপ্রদেশে সরকারি দফতরে যোগ দেন | পরে তিনি দিনাজপুরে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ পান | ১৮৯০ সালে বর্ধমান এস্টেটের সুজামুতা পরগনায় সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় কৃষকদের অধিকার বিষয়ে তার সঙ্গে বাংলার ইংরেজ গভর্নরের বিবাদ ঘটে | পরবর্তীতে শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি সরকারি চাকরি হতে অবসর নেন |

বাল্যকালে তিনি একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে লালিত হয়েছিলেন। পিতা কার্তিকেয়চন্দ্র ছিলেন একাধারে সংগীতজ্ঞ, গায়ক ও লেখক। দ্বিজেন্দ্রলালের দুই অগ্রজ জ্ঞানেন্দ্রলাল রায় ও হরেন্দ্রলাল রায় – দু’জনেই ছিলেন লেখক ও পত্রিকা সম্পাদক | এরকম একটি পরিবেশে কৈশোরেই তিনি কবিতা রচনা শুরু করেন | তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ হয় যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯ বছর | তিনি পাঁচ শতাধিক গান লিখেছেন, যা দ্বিজেন্দ্রগীতি নামে পরিচিত |

তাঁর সাহিত্য কর্ম ও গ্রন্থ তালিকা :

কাব্যগ্রন্থ : আর্যগাথা, ১ম খণ্ড (১৮৮৪), The Lyrics of India (ইংল্যান্ডে থাকাকালীন রচিত) (১৮৮৬ ), আর্যগাথা, ২য় খণ্ড (১৮৮৪), হাসির গান (১৯০০), মন্দ্র (১৯০২), আলেখ্য (১৯০৭), ত্রিবেণী (১৯১২)

রম্য ও ব্যঙ্গাত্মক রচনা : একঘরে (১৮৮৯), সমাজ বিভ্রাট ও কাল্কি অবতার (১৮৯৫), ত্র্যহস্পর্শ (১৯০০), প্রাশচিত্ত (১৯০২), পূনর্জন্ম (১৯১১)

গীতিনাট্য : পাষাণী (১৯০০), সীতা (১৯০৮), ভীষ্ম (১৯১৪)

সামাজিক নাটক : পারাপারে (১৯১২), বঙ্গনারী (১৯১৬)

ঐতিহাসিক নাটক : তারাবাঈ (১৯০৩), রাণা প্রতাপসিংহ (১৯০৫), দুর্গাদাশ (১৯০৬), নূরজাহান (১৯০৮), শাহজাহান (১৯০৯), চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১)

দ্বিজেন্দ্রলালের সাহিত্যে তার দেশপ্রেমের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে | তাঁর কবিতার বিষয় মূলত দেশভক্তি, প্রেমভাব, তাত্ত্বিক ভাবনাচিন্তা ইত্যাদি | তাঁর লিখিত ও সুরারোপিত সঙ্গীত বাঙালির অতি প্রিয় ‘ দ্বিজেন্দ্র গীতি ‘ |

***
তথ্য উপাদ্য : কিছু অংশ ও ছবি উইকিপেডিয়া থেকে