ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

22_nari-somabesh-press-club_110513

কত শত ভাবে নারী কে নির্যাতন করা যায় তার সম্যক ধারণা আমাদের সিংহভাগ মানুষ এর ই নাই। বাল্য বিবাহ, মতের বিরুদ্ধে নারী কে বিয়ে দেয়া, বৌ পেটানো, যৌতুক, তালাক, পাথর নিক্ষেপ, দোররা মারা, নারীর যৌনাঙ্গচ্ছেদ, অপহরণ, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, সাইবার ক্রাইম, নারী – পুরুষ বৈষম্য, মানসিক নির্যাতন, খুন — এই রকম ফেরের ভেতর ও যে কত নির্মম অমানবিক বৈচিত্র আছে তার খবর আমরা কয়জন রাখি? আমরা কতটা সচেতন ভাবে নারী নির্যাতন কে কনসেনট্রেট করে তার প্রতিরোধ এবং প্রতিকারে নিয়োজিত কিংবা সচেষ্ট হই? কিন্তু বিশেষ দিনগুলো তে আমরা খুব সচেতন মানুষ এর মত ই নিজেদের ভার্চুয়াল ভূমিকা রাখি। তাতে আমাদের নাম ডাক কিছু হয় বৈকি কিন্তু সমস্যার সমাধান আর হয়না বরং এসব সমস্যার বৈচিত্রের প্রসার ঘটে। প্রতিদিন নতুন নতুন উপায়ে নির্যাতনের স্বরূপ প্রকাশ পায়। বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ নারী নির্যাতনের স্বীকার হন- এই জরীপ টা কেন কিংবা কিভাবে এলো? এই জরীপের প্রয়োজনীয়তা কি? শুধুমাত্র মানুষ নির্যাতনের জরীপ কেন হয়না? পুরুষ নির্যাতনের জরীপ কেন প্রকাশিত হয়না? আজকাল পুরুষ নির্যাতন ও হয়, যুগ যুগ ধরে কম বেশী হয়েও আসছে হয়ত কিন্তু তার পরিমাণ এত নগণ্য যে জরীপ এর প্রয়োজন পরে না সেখানে। নারী দ্বারা পুরুষ নির্যাতন থেকে পুরুষ দ্বারা ই পুরুষ বেশী নির্যাতিত, যে জন্য সেই জরীপ এর প্রয়োজন পরেনি। নারী কে সংখ্যালঘু বানিয়ে রেখেছে এই সমাজ এবং বিশ্ব, যার অন্তর্গত নয় পুরুষ।

নারী ভ্রূণ অবস্থা থেকেই তো নির্যাতনের স্বীকার এখনো এই বিশ্বে। একজন গর্ভবতী নারীর ভ্রূণের লিঙ্গ পরীক্ষা করা হয় সেই নির্যাতনের ফলশ্রুতিতে এবং নারী ভ্রুন টি কে হত্যা ও করা হয় কিংবা তাকে বাঁচানো গেলেও জন্মের পর তার উপর চলে বৈষম্যের খড়গ, চলে নারী নির্যাতন। কন্যা শিশু জন্মের পর থেকেই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা তথা মৌলিক অধিকার প্রশ্নে পরিবার থেকেই শুরু হয় বৈষম্য মূলক নির্যাতন, সাথে শারীরিক- মানসিক নির্যাতন তো বটেই। নারী জন্ম থেকে মৃত্যুর পথ পরিক্রমায় প্রতিটা স্তরে নির্যাতনের শিকার হয় গোটা বিশ্বে। উন্নত দেশ কিংবা অনুন্নত দেশ – কোথাও ই নারী মানুষ এর মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি আজ ও। নারী কোথাও নিরাপদ নয় কারণ সে নারী, সে মানুষ নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল পুরুষ নয় বরং নারী রা ও কম দেখায় না। এই সমাজ, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, গতানুগতিক বাস্তবতা, মানুষ এর তথাকথিত ধর্ম, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা –  এসবকিছু পুরুষ এর পাশাপাশি একজন নারী কে ও নির্যাতনকারী তে পরিণত করে!

আমার জন্মের পর জ্ঞ্যাণ লাভ করে প্রথম যে নির্যাতন গুলো দেখতাম কিংবা জানতাম তার থেকে ঢের বেশী রকমের নির্যাতনের কথা আজ আমরা জানতে বা দেখতে পারি। আজ থেকে বিশ বছর আগে আজকের মত পারিবারিক বা সামাজিক নির্যাতনের কথা বাহিরে প্রকাশিত হতো না খুব স্বাভাবিকভাবে। নারী যুগে যুগে নির্যাতিত হয়েছে, মুখ বুজে সয়েছে, ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে নারী পাহাড় সম নির্যাতন নিশ্চুপ ভাবে হজম করে নিয়েছে যা আজকের পৃথিবীতে অনেকটা ই উন্মোচিত বলেই আমরা জানতে পারি যে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ নারী প্রতিদিন ই নির্যাতনের শিকার হয়ে চলেছে।

বিভিন্ন জরিপে আমরা দেখি, আমাদের শিক্ষার মান, জীবন যাত্রার মান উন্নত হয়েছে, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট উন্নতির দিকে ধাবমান কিন্তু আসলেই কি আমাদের শিক্ষার মান, আমাদের মানসিকতা, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, আমাদের জীবন যাত্রার মান এর উন্নয়ন ঘটছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাবো না এখন, সে এক ভিন্ন বিষয় যার বিষদ আলোচনা হয়ত অন্য কোথাও হবে। যদি ধরে নেই এত সব উন্নতি ঘটেছে আমাদের সমাজে তথা গোটা বিশ্বে তবে নারী নির্যাতনের হার কেন কমেনি? কেন নারী আজ ও সহিংসতার শিকার হয় কেবলমাত্র নারী বলেই? কেন আজ ও নারী মানুষ এর মর্যাদা পায়নি?

৮০/৯০ এর দশকে আমরা শুনতে কিংবা জানতে পারতাম বাল্য বিবাহের কথা, যৌতুক এর কথা, তালাক এর কথা, এসিড নিক্ষেপের কথা, ধর্ষণের কথা, পাথর ও দোররা মারার কথা, বৌ পেটানোর কথা— তখন মানুষ মানসিক নির্যাতন কে উপেক্ষা করে যেতো, তাদের ভাবনার জগত কে মানসিক নির্যাতন খুব বেশী আলোড়িত করে উঠতে পারতো না। অথচ কালাদিকাল থেকে এই নির্যাতনের চর্চা হয়ে আসতেছে। মানুষ এখন আগের থেকে সচেতন হয়েছে বলেই শারীরিক সহ মানসিক নির্যাতন ও সহিংসতার কথা বেড়িয়ে আসছে লোক সমাজে কিন্তু মানুষ গুলো সেই পরিমাণ সচেতন এখনো হয়ে উঠতে পারেনি যে তারা এই নারী বা পুরুষ বা মানব নির্যাতন কে রোধ করতে পারে, নির্মূল করতে পারে।

আমাদের দেশে আজ ও গ্রামে গঞ্জে ফতোয়া দিয়ে নারী কে দোররা মারা হয়, পাথর নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত করা হয়, কখনো কখনো তারা খুন হয়ে যায়! এই রাষ্ট্র কি ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্র যে এখানে সেই বর্বরোচিত উপায়ে নারী কে শাস্তি দেয়া হয় ধর্মের নামে? কবে, কখন, কোথায় ধর্মের নামে দোররা/ পাথর মারা হতো- সেই প্রেক্ষাপটে এখন আর যাবো না তবে না প্রশ্ন করে পারছি না যে, সেই প্রেক্ষাপট কি আমাদের দেশে, আমাদের সমাজে আজ ও বিদ্যমান, কালের আবর্তন কিংবা বিবর্তনে নারী ভাগ্যের কিছুই কি পরিবর্তিত হয়নি? তাহলে আমাদের এত জ্ঞ্যাণ, এত শিক্ষা কোন কাজে, কোন উন্নতিতে প্রয়োগ হচ্ছে?নাকি আমাদের মানসিক ও সামাজিক বর্বরতা সকল শিক্ষাকে বাজিমাত করে দিতে সক্ষম যুগ- যুগান্তরে যেখানে কোন শিক্ষা কিংবা মুক্ত মন কিংবা আধুনিকতার ই কোন অবস্থান নেই?

অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজেই নিজেকে নির্যাতন করছে তার আবদ্ধ মানসিকতার মাধ্যমে। শিক্ষিত নারীরা ও অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে নিজের অধিকার, অবস্থান, দায়িত্ব- কর্তব্য সম্পর্কে। অনেক নারী শিক্ষা অর্জন করছে শুধুমাত্র একজন ভাল বর এবং প্রাচুর্য – ঐশ্বর্য মণ্ডিত ঘর পেতে। নারী নিজেই নিজেকে পণ্য করে তুলছে নানা মাধ্যমে। নিজের অজান্তেই নারী নিজেকেই নির্যাতন করে চলেছে। সামাজিক প্রেক্ষাপট এমন এক ইনফাইনাইট লুপ এবং সিস্টেম গড়ে তুলেছে যে নারী তার ভাগ্য পরিবর্তনে নিজেকে পণ্যে রুপান্তরিত করে ফেলছে জেনে বুঝে কিংবা না জেনে বুঝেই। যেখান থেকে মুক্তির পথ দেখাতে কোন মাসিহা ই এসে নারী কে কোনদিন সাহায্য সহযোগিতা করবে না বরং নারী কে ই সেই ট্যাবু থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেই আবদ্ধতা কে অতিক্রম করতে হবে নিজের জ্ঞ্যাণ ও বোধ কে কাজে লাগিয়ে।

গতানুগতিক ধারার নারী নির্যাতনের সাথে সমসাময়িক সময়ে নতুন আরেক ধারা সংযোজিত হয়েছে। টেকনোলোজি, যা মানুষ এর জীবন কে উন্নত ও সহজ করতে উদ্ভাবিত সেই টেকনোলজি আজ নারী নির্যাতনের এক মোক্ষম হাতিয়ার। সাইবার ক্রাইম এর এক অন্যতম অধ্যায় আবর্তিত হয় এই নারী নির্যাতন কে ঘিরে। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে সামাজিক নেটওয়ার্ক এখন কাজ করে এক অভাবনীয় ফাঁদের মত। অডিও ভিডিও ক্যাপচার করার টেকনোলজি এবং তার আউটপুট ফুটেজ এখন সকলের হাতের মুঠোয়। চাইলেই ভার্চ্যুয়াল জগত এর মাধ্যমে আমরা অশ্রাব্য ভাষা এবং ছবির মাধ্যমে নারী কে নির্যাতন করতে পারি। কপি, কাট, পেস্ট, এডিট এর মাধ্যমে আমরা পারি এক শরীর এর সাথে আরেক মুখায়ব কে মিলিয়ে দিতে। আমরা খুব সহজে পারি অন্যের ফোন নাম্বার টি কিছু অশ্লীল সাইটে প্রচার করতে, খুব সহজেই আমরা পারি প্রেমিক এর অন্তরঙ্গ মুহূর্ত টি ক্যাপচার করতে ছবি কিংবা ভিডিও’র মাধ্যমে এবং সেকেন্ডের ভেতর তা বিশ্ববাসীর চোখের সম্মুখে পৌঁছে দিতেও পারি। সামাজিক অবক্ষয়ের চমৎকার এক মাধ্যম এখন এই অনলাইন টেকনোলজি এবং টেলি কম্যুনিকেশন তথা মোবাইল টেকনোলজি।

নারী নির্যাতন রোধের আইন, সাইবার ক্রাইম রোধের আইন ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক আইন ই হয়েছে আমাদের দেশ তথা সমগ্র বিশ্বে কিন্তু তারপর ও গোটা বিশ্বে নারী নির্যাতনের হার কমেনি বরং বেড়েছে। আইন এর পর্যাপ্ত প্রয়োগ নেই সবখানে – এই কথা যেমন সত্য ঠিক এক ই ভাবে তার থেকেও বড় সত্য আমাদের করাপ্টেড মানসিকতা, আমাদের করাপ্টেড শিক্ষা, আমাদের করাপ্টেড সামাজিক চর্চা। আইন তৈরী এবং আইন প্রয়োগের সাথে সাথে অনেক দ্রুত গতিতে আমাদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির রিপেয়ার করা প্রয়োজন। প্রয়োজন নিজেদের কে বদলানো। নিজের ঘর থেকে শুরু হয় নারী নির্যাতন এবং সেই নারী নির্যাতনের প্রতিরোধ ও প্রতিকার ও শুরু হওয়া প্রয়োজন নিজের ঘর থেকে। আপনার আমার শিশু কে কখনো চোখে আঙ্গুল দিয়ে বলা উচিত নয় তুমি ছেলে কিংবা তুমি মেয়ে। শিশু কে মানুষ এর মর্যাদা দিয়ে বড় করতে পারলে, বৈষম্য মুক্ত রাখতে পারলেই এই নারী নির্যাতন রোধ ও প্রতিকারের প্রথম ধাপটা আমরা পার করে যেতে পারি অনায়াসে। ঘরে কিংবা বাহিরে ছোট কিংবা বড় যেকোনো রকম বৈষম্য এবং নির্যাতন দেখার সাথে সাথে রিঅ্যাক্ট করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সাহস ও মানসিকতা আমাদের অনেকের ই নাই। এই সাহস আর মানসিকতা অর্জনের নিরন্তর চেষ্টা করে চলতে পারলে আমরা নারী নির্যাতন প্রতিকার ও রোধের দ্বিতীয় ধাপ টা ও অতিক্রম করে যেতে পারবো অনায়াসে। এভাবে ধীরে ধীরে প্রতিটা ধাপ পেরিয়ে একদিন আমরা নারী নির্যাতন কে নির্মূল করতে পারবো বলেই স্বপ্ন দেখি এবং কেউ কেউ সেই পথে কাজ ও করি কিন্তু এই কেউ কেউ টা কে রুপান্তরিত হতে হবে সবাই তে তবেই আমাদের স্বপ্ন সফল হবে, মানব্জাতি সার্থক হবে।

নারী কোথাও নিরাপদ নয় কারণ সে নারী, সে মানুষ নয়—- এই আবদ্ধতা কে ভেঙ্গে ফেলার প্রত্যয় এবং প্রয়াসে প্রতিটা মানুষ কাজ করে যাবে নিরন্তর, নারী মানুষ হবে একদিন – এই প্রত্যাশা, এই আকাংখা, এই স্বপ্ন আছে বলেই প্রতি মুহূর্ত অনুভব করি “বেঁচে থাকার সে কী আনন্দ…!”