ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

মহেশখালীর মিষ্টি পান এই মুহূর্তে তিতা লাগছে রহিম শেখের মুখে। এই হয়েছে এক জ্বালা, মেজাজটা খিঁচে থাকলে মিষ্টি পান তিতা লাগে, চায়ে দুই চামুচ চিনি বেশি লাগে। কাদা মাখা শক্ত হয়ে যাওয়া লাশগুলো দূরে পাহাড়ের নীচে সারি করে শুয়ে রাখা হয়েছে। আর কয়েকটা দিন পর মরলেও এই মাসের ভাড়াটা আদায় হতো। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, এতে রহিম শেখের কোন কষ্ট নাই, তবে বাচ্চাগুলার লাশ দেখে বুকটা একটু মোচড় দিয়ে উঠেছিল। মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলল সে, মনটা হঠাৎ ভাল হয়ে গেল। আধা খাওয়া পানটা মনে হচ্ছে মিষ্টি লাগছে এখন। যেগুলো ঘর একেবারে খালি হয়ে গেছে, নতুন ভাড়াটিয়ার কাছে অগ্রিম বেশি রাখতে হবে। প্রতিবারেই সে এরকম ঘটনার পর ভাড়াও বাড়িয়ে দেয়। পাহাড়টির কাছে কৃতজ্ঞতায় তার অন্তর ভরে ওঠে। এই পাহাড়ের কারনেই তার বিত্ত-বৈভব, প্রতিপত্তি। সরকারী দলের সঙ্গে তার অসম্ভব দহরম মহরম সম্পর্ক। তবে রহিম শেখ কখনো দল বদল করে নাই, একটাই দল করে সে, সরকারী দল।

মাঝে মাঝে একটু বিপদই এসে যায় রহিম শেখের জীবনে, যেমন এবার এসেছিল। তবে সরকারের তরফ থেকে পাহাড়ের পাদদেশ হতে সরে যাওয়ার মাইকিং করলে, সবাইকে না যাওয়ার জন্য হুশিয়ার করে দিয়েছে সে। যে সরে যাবে, সে ফিরে এসে আর জায়গা পাবে না। কথা রেখেছে সবাই, সরকারী লোকজন আসলে, বিশেষ করে মহিলারা দা-কুড়াল নিয়ে অসীম সাহসের সাথে প্রতিরোধ করেছে। রহিম শেখ ভাল করেই জানে, কেউ যাবে না। তাদের যাবার কোন জায়গা নাই, একজন গেলে আরও দশজন আছে। রেললাইন থাকলে বস্তি থাকবে, নদী থাকলে লঞ্চ থাকবে, লঞ্চ থাকলে মরণ থাকবে। তেমনি পাহাড় থাকলে ধ্বস হবে, নীচে ঘর থাকলে, চাপা পড়বে। এই সহজ নিয়মটা সে বুঝলে অন্যেরা কেন যে বুঝে না তা রহিম শেখ ভেবে পায় না।

সরকারী পাহাড়গুলো দখলে রাখতে তাকে বিরাট বাহিনী পালতে হয়, এতে কত ছেলেপুলের চাকরির ব্যাবস্থা হয়েছে। দেশের প্রতি তার একটা কর্তব্য আছে, দেশপ্রেম উথলে ওঠে রহিম শেখের। এই জনকল্যাণমূলক কাজে সব সময় বাঁধা দেয় সরকারী লোকজন। ২০০৯ সালে পাহাড়ের নীচ থকে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের ব্যাবস্তা করলে, ওই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ২০১০ এ হাইকোর্টে মামলা ঠুকে দিয়েছিল সে। আদালত উচ্ছেদের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ জারি করে, যা এখনো বহাল আছে। বাঘাবাঘা ব্যারিস্টার তার পক্ষে লড়েছে। এক ব্যারিস্টার আপা বলেছিলেন, তুমি অনেক ভাল কাজ করেছ রহিম শেখ, উদ্বাস্তুদের থাকার ব্যাবস্থা করে দিয়েছ। অথচ সরকার ক্লাইমেট ফান্ডে যত টাকা পেয়েছে, তার সামান্য অংশ দিয়ে তাদের স্থায়ী ব্যাবস্থা সহ পাহাড়গুলি রক্ষা এবং চট্টগ্রামে ১৫টি খালে স্লুইস গেট দিয়ে শহরকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে পারে। নিজেকে ধন্য মনে করে রহিম শেখ। যারা বেঁচে আছে, তারা যে সাহায্য পাবে, তার একটা অংশের ভাগও সে পাবে। সবদিক দিয়েই লাভ রহিম শেখের, আনন্দে গান ধরে রহিম শেখ, আর একটা খিলি পান মুখে দেয় সে। পানটা বেশ মিষ্টি লাগছে এখন, বেটা দোকানি মিষ্টি জর্দা বোধহয় বেশি দিয়েছে।

ইনজাংশন থাকা সত্বেও সরকার সকলকে উচ্ছেদ করেছে, সরকারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করবে সে হাইকোর্টে, হাজতে বসে ভাবে রহিম শেখ। গ্রেফতার হয়েছে সে। ফলাফল কি হবে ভাল করেই জানে রহিম শেখ। পাহাড় থাকলে, থাকবে রহিম শেখ, রহিম শেখ থাকলে বস্তি থাকবে, বস্তি থাকলে চাপা পড়া থাকবে, গোলাকার বৃত্তে ঘুরতে থাকে রহিম শেখ, মুচকি হেসে।