ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

ঠোঁট দুটো কাঁপছে মেয়েটির। কি যেন বলার চেষ্টা করছে। একটা হাত দিয়ে আমার হাত ধরে আছে। আসলে আমিই ধরে আছি, নিজে থেকে ধরার ক্ষমতাটুকু ওর নেই। পনেরদিন পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি, বিকল্প ব্যাবস্থা চলছে। নিস্পলক চোখদুটো তাকিয়ে আছে আমার দিকে, এখন আর চোখ মোছার প্রয়োজন পড়ে না। অবলা চোখদুটো মুহূর্তের মধ্যে ভিজে ফেলার ক্ষমতা ওর রহিত হয়ে গেছে। অন্য হাত দিয়ে নিজের পেটটা চেপে ধরে অন্যদের দৃষ্টির আড়াল করার চেষ্টা করছে। যে কদিন আগেও প্রাণবন্ত আর উচ্ছল ছিল, বাচ্চাদের অতিপ্রিয়, স্বজনদের অতি আদরের, কি অমোঘ নিয়তি!! মেয়েটি অভিনয় করার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। যিনি ছুরি চালালেন, দায়িত্ব আর একজনের উপর দিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। তীব্র যন্ত্রণা আর বেদনাভরা বোবা কান্না নিয়ে পাগলপ্রায় আমরা তাকেও খুজে পাই না। অসহায়ত্তের পরিক্ষায় ফেল করলাম আমরা, না হলে চোখে এত পানি আসবে কোত্থেকে।

বিগত একমাস ধরে সে ক্লিনিকের বিছানায় শুয়ে আছে। পনেরদিন ধরে তাকে কোন খাবার দেয়া হয়না, শুধু স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। শেষ দুদিন তাকে একফোঁটা পানিও খেতে দেয়নি ডাক্তার। পানির পিপাসায় কাতর মেয়েটি এক চামুচ পানির জন্য কি পরিমান আকুতি করেছে, তা যদি সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ থেকে থাকেন, তাহলে মাফটা প্রথমে তারই পাওয়ার কথা। খাবার দেবেই বা কিভাবে, অপারেশনের কাটা পেট দিয়ে ওর শরীরের ভেতরের অংশ তখন গলেগলে বের হচ্ছিল। মেয়েটির কোলন ক্যান্সার হয়েছিল, অপারেশনের পর কেমোর রিএ্যাকশনে পেটের সিলাই খুলে গিয়ে ভিতরে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার সেল গলে কাটা জায়গা দিয়ে বের হয়ে আসছিল। হে প্রভু!! মহান আল্লাহপাক!! কাউকে তুলে নিতে চাইলে এরকম কষ্ট তাকে দিও না। জীবনের শেষ মুহূর্তে ও ক্লিনিক থেকে একবার বাসায় যেয়ে ওর স্বপ্নের সংসারটা একটু দেখতে চেয়েছিল। বলেছিল, এ্যাম্বুলেন্সে করে শুধু পাঁচ মিনিটের জন্য বাসায় নিয়ে যেতে, কিন্তু ডাক্তার অনুমতি দেয়নি, ওর অবস্থাও সেরকম ছিল না। ডাক্তার ওমরাহ্‌ পালনে সৌদি আরব গিয়েছিলেন, বিকল্প ডাক্তারকে পেতে খুব কষ্ট হয়েছিল।

সংসার, সন্তান আর পরিবারের প্রতি মেয়েদের কি টান, তা এই মেয়েটিকে দেখে বুঝেছি। হায়রে!! মায়ের জাত, কতই না অবমাননা করি তোমাদের!! মাত্র বিয়াল্লিশ বছর বয়সে, কোলন ক্যান্সারে দুই মাস মরণ যন্ত্রণায় ভুগে, বাঁচার তীব্র আকুতি নিয়ে, একটিবার নিজের বাসাটা না দেখার যন্ত্রণা বয়ে, পিপাসায় ছটফট করে, ঠোঁট দুটো কাঁপতে কাঁপতে চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল আমার একমাত্র বোনের। আগামি ২ আগস্ট তার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী।

খাবারে ভেজাল, কেমিক্যাল আর বিষ মেশানো একমাত্র দেশ, আমাদের এই দেশের মহান জনগণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন আগামি ৫ জুলাই পবিত্র রাতে এই বছরের মহান কীর্তির ক্ষমা প্রার্থনা আর মাফ চাওয়ার জন্য। আমাদের প্রেমে আল্লাহ তাঁর আসন ছেড়ে পৃথিবীর নিকটে আসীন হবেন। আমারা এতই মহান যে, পৃথিবীর কাছাকাছি এসে ভেজালকারী, অন্যায় আর দুর্নীতিবাজদের মাফ না করলে আল্লাহপাক শান্তি পাননা। তাঁর কাজ শুধু একটাই, প্রতি বছর এই রাতে আমাদের কীর্তিকলাপের মাফ ও ক্ষমা করে দেয়া। আসলে আল্লাহপাক আমাদের একটা মহান তরীকা দান করেছেন। আমাদের এইসব সুমহান কর্মের জন্য পুরাদেশ ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও সমস্যা নেই, ও রকম কত প্রান অকালে ঝরে যায়, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে যায়, তাতে আমাদের অসুবিধা কি? আর তাঁর দায় বা আমরা নেব কেন। যদি এরকম মাফের রাত বা ক্ষন পাওয়া যায়!!

** হে আল্লাহ!! তোমার ওয়াদা যদি সঠিক হয়, আমার বোনের মৃত্যুর জন্য যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দায়ী, যাদের দায় ছিল সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের, কিন্তু তা তারা করেনি- তুমি মহান, তুমি ক্ষমাকারী, তুমি তাদের মাফ করতে পার, কিন্তু আমরা কখনো করবনা। যদি তাদের কাউকে বেহেস্তে পাঠাও, সে পথে আমি বাঁধা প্রদান করব। যদি তারা এরকম হাজার রাতও পায়।