ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

একটা সাগর কলা ছিলে বিষণ্ণবদনে হাতে ধরে আছেন রহিম বক্স, সঙ্গীও বন্ধু, প্রাক্তন কলিগ মাহতাব উদ্দিনের কথা তার কাছে অমৃতবাণী মনে হচ্ছে না। আমার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কলা মুখে পুড়লেন রহিম বক্স। বললাম চাচা ওনার কথায় মন খারাপ করবেন না। ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে স্টিমারের ডেকে আমার অবসরপ্রাপ্ত চাচার দুই বন্ধুর সাথে হটাৎ দেখা হয়ে গেল বহুদিন পর। তারা সবাই একসময়ে চট্টগ্রাম সী কাস্টমসে চাকরী করতেন। বুঝলে ভাতিজা!! – তোমার এই চাচারে চাকরী জীবনে বহুত বলেছি, দোস্ত টাকাপয়সা জমাও, ভবিষ্যতে কামে লাগবে, এত খরচ আর দান-খয়রাত করিও না। রহিম বক্সের দিকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন মাহতাব চাচা। সে তো ছিল দাতা হাতেমতাই, জীবনে কয়টা মানুষের বিয়ে দিয়েছে সে নিজেও বলতে পারবে না, দুই হাতে স্রোতের মত টাকা খরচ করত। আমি তো বুঝি না এই সামান্য টাকা নিয়ে ও ভবিষ্যৎ পার করবে কেমন করে!! আমি ভাতিজা এ ব্যাপারে খুব সতর্ক, ওর থেকে দশগুন জমিয়েছি, দুই বছর হল আমরা অবসর নিয়েছি, এখন দেখি দেশের জন্য কিছু করতে পারি কিনা। আমার ছেলে-মেয়েরা সব বিদেশে, ভাবছি রাজনীতি করব। ও!! ভুলে গিয়েছিলাম, শুনবে তোমার এই রহিম চাচা কত টাকা নিয়া চাকরী থেকে বের হয়েছে!! লোভ সামলাতে পারলাম না, বললাম কত? মাত্র ৫০ কোটি!! বললেন মাহতাব চাচা। মাথাটা ঘুরে উঠল, মাহতাব চাচার জমানো অংকটা চিন্তা করে, স্টিমারের রেলিঙটা শক্ত করে ধরে থাকলাম। এটা আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগের কাহিনী।

আমার চাচার অনেক বন্ধুর সাথে সঙ্গত কারণে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। একদিন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরছি, আমার সামনে বিরসবদনে বসে আছেন কাস্টমসের অন্য এক অফিসার। এখন পোস্টিং কোথায়, কেমন আছেন জিজ্ঞাস করাতে বদনটি ওনার আরও মলিন হয়ে গেল। বুঝলাম পোস্টিং এ ক্রীম নাই। এই ফাঁকে একটা কথা বলে নেই, কাস্টমসের শারীরিক, মানসিক ভালমন্দ বিবেচিত হয় তার বিদ্যমান পোস্টিং বিবেচনায়। সম্পর্ক এবং আমার আগ্রহের কারণে বলতে শুরু করলেন উনি। ক্যামন করে ভাল থাকা যায় বল!! আগে যেখানে দিনে কামাই হত আড়াই-তিন, এখন সেখানে প্রতিদিন হচ্ছে দেড়-দুই!! ওনার কথা বোঝার জন্য কিছুক্ষন সময় নিলাম। বুঝতে পারছিলাম না দিনে মাত্র একহাজার টাকা ইনকাম/উপরি কমাতে এত মন খারাপ হয়েছে কেন ওনার। দেড়-দুই হাজার হলেও তো মাসে ৫০/৬০ হাজার টাকা উপরি (ওনাকে আবার বন্ধের দিনেও কাজ করতে হয়)। আমাকে নিশ্চুপ দেখে আবার শুরু করলেন উনি। আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যান মুহিত সাহেবের জন্য আজ এই অবস্থা, উনি কাস্টমসের এমন সংস্কার শুরু করেছেন যে, আমাদের এখন না খেয়ে থাকার অবস্থা হয়েছে। আমি বললাম, কিন্তু চাচা পার্থক্য তো সামান্য!! আগে হত ৮০/৯০, এখন হচ্ছে ৫০/৬০ হাজার। আমার কথায় উনি খুব ব্যাথিত হয়ে যেন আকাশ থেকে পড়লেন, বললেন, ও!! বুঝতে পেরেছি!! আগের আড়াই-তিন, হাজার নয়, লাখ !! প্রতিদিন। এখন হচ্ছে হাজার।

হাতির দুই কালের মুল্যই লাখ টাকা। কাস্টমসের বর্তমানে ভাটা চললেও মুল্য লাখ টাকা। এখন দিনে ৩ লাখ না হলেও মাসে কমপক্ষে ৩ লাখ হয়। আশির দশকের শেষ দিকে আমার এক বন্ধু, যে সিএন্ডএফ ব্যাবসা করে, সে একদিন বলেছিল, দোস্ত আজ এক অফিসারের বাসায় যেয়ে একটা প্যাকেট দিয়ে আসলাম। এরকম প্রায় যেয়ে তাকে দিয়ে আসি। বললাম, কত ছিল? এক কোটি পাঁচ লাখ, পাঁচশ টাকার নোট, উত্তর দিল বন্ধুটি। তখন গার্মেন্টস ব্যাবসা কেবল শুরু হয়েছে, লক্ষ লক্ষ গজ কাপড় পাচার হয়ে ইসলামপুর যাচ্ছে। আমার এক বন্ধুর বাবা, কাস্টমসের সুফি মানুষ, সারা জীবন ক্রীম পোস্টিং পেয়েছেন। কমপক্ষে ৪০ বার হজ্ব আর ওমরাহ্‌ করেছেন। অনেক সিএন্ডএফ এর মালিক আছেন যারা এখনো প্রতি বছর হজ্ব এবং ওমরাহ্‌ করেন পরিবার সহ। পবিত্র ও পরহেজগার এইসব বান্দারা বেহেস্তে যাবেনা তো কারা যাবে!!

বিসিএস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মেধাবীরা কাস্টমসের চাকরিকে বেছে নেন। তাদের পছন্দের তালিকার এক নম্বরে থাকে কাস্টমস ক্যাডার, জনকল্যাণ ও দেশ প্রেমের জন্য। জনগণের সেবা ও দুঃখী এবং নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য এ দেশের মেধাবীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন কাস্টমসের চাকরীতে, স্থাপন করেন দেশ সেবার এক মহান ও অনন্য উদাহরণ!! ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার দলে-দলে আসছে কাস্টমস ক্যাডারে। এই মেধার অবমূল্যায়ন কি করে পিএসসি’র ভাইভা বোর্ড সহ্য করে তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। আমি একজনকে জানি যিনি তিনবার ক্যাডার পরিবর্তন করে কাস্টমসে এসেছিলেন। ক্যাডার সার্ভিসের আমার এক বন্ধু চাকরীতে সচ্ছলতা নেই বলে আমার কাছে পরামর্শ চাইল, কোন ক্যাডার(সচ্ছল) প্রথম চয়েস দেবে। কেননা সে পুনরায় বিসিএস দিয়ে ক্যাডার পরিবর্তন করবে। পরামর্শ(কু!)দিলাম তাকে কাস্টমস চয়েস দেয়ার জন্য। অত্যন্ত মেধাবি সে বন্ধু পরের বার সুযোগ পেয়ে গেল কাস্টমস সার্ভিসে। কিছুদিন পর একদিন আমার বাসায় এসে হাজির ১০ কেজি মিষ্টি নিয়ে, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ।