ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ব্যাপারটা অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি, একটি বিশেষ সময় তারা হাসে। আমার জন্য তা বিব্রতকর এবং দৃষ্টিকটু তো বটেই। আমি সৃষ্টির সেরা, আমার জন্যই সব রহমত নেয়ামত ঢেলে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। অথচ, এই অবজ্ঞা ধীরে ধীরে আমাকে বিক্ষুব্ধ করে তুলছে। জানালার পাশে বসি বলেই এহেন লজ্জাকর পরিস্থিতির স্বীকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিবার নামাজ শেষ করার পর মসজিদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাই, জানালার পাশেই কিছু পড়ে থাকা ইটপাথরের উপর স্যাতস্যাতে জাগায় আটকে থাকা শামুকটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। বলছে, আমিও তো সেজদা থেকে উঠলাম, আমার তো কোন পাপ নেই, হিসেব নেই। বেহেস্ত নেই, দোজখ নেই, নেই হুর-পরী। তারপরেও আমি সম্পূর্ণ আত্নসমর্পণ করে আল্লাহকে সেজদা দেই। আর তুমি!! সমস্ত রহমত-নেয়ামত-বরকত প্রাপ্ত হয়েছ, সুখ-দুখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা পেয়েছ, পেয়েছ সন্তান, পরিবার পরিজন। সৃষ্টিকর্তা সারাক্ষণ তোমাদের মঙ্গল চিন্তায় রত, তার বিনিময় কি তোমার সেজদায় হচ্ছে!! পাশে ঘুরে বেড়ানো পোকামাকড়ের দল থেমে যায়, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। সবার চিৎকার শুনতে পাই, “আমাদের সাথে পারবেনা তুমি”।

কি এক অদ্ভুত আকর্ষণে আমি ওই জানালার পাশে বসেই নামাজ পড়ি। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি!! এত অকৃতজ্ঞ কেন আমি, কেন আমি ওই পোকা মাকড়ের সাথে পেরে উঠি না। সেজদায় পড়ে কেন মনে হয়, হে আল্লাহ আমি হেরে গেলাম ওই সামুক আর পিপীলিকার সাথে। তুমি এত মহান!! এত বড়!! এত বিশাল!! আমি এত ক্ষুদ্র, এত পাপি!! আমার এই সেজদা দিয়ে তোমার সন্তুষ্টি অর্জন কোনদিনই সম্ভব না। আমি হেরে গেছি ওই অন্ধ লোকটির কাছে, যে নামাজে দাড়িয়ে দিক ঠিক করতে না পেরে সেজদা দেয় উত্তরে বা দক্ষিনে সরে গিয়ে। আমি হেরে গেছি ওই বিকলাঙ্গ লোকটির কাছে যে দাঁড়াতে পারে না, সারা দেহ কাঁপতে থাকে, সেজদায় কপাল মাটিতে ধরে রাখতে পারেনা, উঠতে আর নামতে থাকে। হে মহান আল্লাহ পাক আমার সেজদা কবুল কর, এতটুকু বলার যোগ্যতাও আমার নেই। নামাজে দাঁড়ালে সরকারী দল, বিরোধী দল থেকে শুরু করে মহাজাগতিক সব তথ্য এসে ভিড় করে। হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে পাওয়ার তথ্য পেয়ে যাই। রমজান মাসেও সামান্য ধৈর্য্য আর সহনশীলতাটুকু আমার নেই, পরনিন্দা আর সমালোচনায় আমি ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছি। আমার রোজা আর নামাজ যদি কবুল হয়, তবে ইফতারি আর সেহরির ফযিলত যাদের কপালে জোটেনি, তাদের রোজা নামাজের কি হবে!! যারা আমাদের পাপ মোচন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দিবা রাত্রি সেজদায় পড়ে আছেন, হাত নেই, পা নেই অহর্নিশি আল্লাহকে ডেকে চলেছেন, তাঁদের তুলনায় আমার সেজদা কোন স্থানে পড়ে আছে!!

গতকাল রাতের নামাজে এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, মসজিদের জানালার পাশে পড়ে থাকা শামুক আর পোকা মাকড়গুলো হাসছে না, তাদের মুখগুল ভেজা চকচক করছে। যার উদ্দেশ্যে সেজদা তাঁকে বলেছিলাম, হে আমার রব, তুমি রাসুলে(সাঃ) পাকের মালিক, তুমি হযরত জিব্রাইল, ইস্রাফিল আর মিকাইল(আঃ) এঁর মালিক, তুমি সারা জাহানের মালিক, আর আমি অক্ষম অসহায় এক, দু’ফোটা চোখের পানির মালিক। আমি বাঁচাতে পারিনি আমার বোনকে, আমার দিকে তাকিয়ে ছিল ও বাঁচার আকুতি নিয়ে। আমি অসহায় এক ভাই, আমার একটি সেজদা তুমি কবুল করো। হে আমার রব, আমাদের শান্তি-আনন্দ আর উত্তম পুরস্কারের জন্য আটটি বিশেষ স্থান আছে, নাম তার জান্নাত, যার গৌরবান্বিত মালিক তুমি। আর আছে তোমার হাবীবে পাকের জন্য হাউজে কাওসার এর পবিত্র পানি। আমার অসহায় একমাত্র বোনটি মৃত্যুর সময় তিনদিন পর্যন্ত একফোঁটা পানি খেয়ে যেতে পারেনি। তোমার মালিকানায় থাকা ওই আটটি বিশেষ স্থানের কোন একটিতে একটু জায়গা ওর জন্য নির্ধারিত রেখ। পবিত্র হাউজে কাওসার এর একফোঁটা পানি ওর মুখে দিও। ওকে পরিভ্রমণ করাইও তোমার সমস্ত সৃষ্টি জগত, গ্রহ থেকে গ্রহান্ত্ররে, নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রলোকে, গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সিপুঞ্জে, সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত………………

আজ আমার বোনের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী। আমি জানি আজ ওরা কেউ হাসবেনা।

## আমাদের ব্যাথায় যারা ব্যাথিত, হে আমার রব, তাঁদেরকে তুমি কোন কষ্ট দিওনা, হেফাজত করো, কেননা তুমিই একমাত্র হেফাজতকারী।