ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মতামত-বিশ্লেষণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুতের কিছু অজানা বিষয় আপনার এবং দেশবাসীর জানা দরকার, যে কারণে হয়তো অতিরিক্ত বিদ্যুতের সুফল জনগণ পাচ্ছে না। যারা জানে তারা হয় ব্যর্থ নয় জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি কী জানেন , প্রতিদিন আমরা যে লোডশেডিং দেখছি বা জানি তার সিংহভাগ আসলে লোডশেডিং নয়!! একটা এলাকায় যদি ২৪ ঘণ্টায় ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হয় তাহলে ৩/৪ ঘণ্টা হচ্ছে প্রকৃত লোডশেডিং (যা আমরা লোডশেডিং হিসেবে জানি, চাহিদার থেকে সাপ্লাই কম হাওয়ার কারণে যেটা হয়)। কিন্তু বাকি ৮/৯ ঘণ্টা তাহলে কোন শেডিং? কী কারণে জনগণের উপর এই বাড়তি দুর্ভোগ, কারা এর জন্য দায়ী? এটা না থাকলে তো এই সংকটময় মুহূর্তেও দুই-তৃতীয়াংশ লোডশেডিং কমে আসত।

বিধিবহির্ভূত এই ভুতুড়ে লোডশেডিং এর নাম ফোর্সড লোডশেডিং। যার সাথে চাহিদা এবং যোগান এর কোনও সম্পর্ক নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এন,এল ,ডি ,সি (ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টার ) যে, সুইচিং এবং ফোনের মাধ্যমে সারা দেশে ঘন্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন এলাকাকে বিদ্যুত্‍ শূন্য করে রাখছে ( ফোর্সড লোডশেডিং) , এটা কী তাদের রুটিন দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ? ফ্রিকোয়েন্সি কেন কমে, ফ্রিকোয়েন্সি কমার জন্য দায়ী কারা ? দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে , তাদের লাইন না কেটে বা বিদ্যুত্‍ শূন্য না করে নির্বিচারে নির্দোষ গ্রাহকদেরকে সারাদিন রাত ধরে বারবার বিদ্যুত্‍ শূন্য করা হচ্ছে কেন? এবং এন,এল,ডি,সি এই বিষয়টি রেকর্ড করে বা লিখে রাখে না কেন? সারা দেশে এন,এল ,ডি,সির বিভিন্ন গ্রিড কন্ট্রোল রুমে অবস্থিত মনিটরে , ওই মনিটর হতে সারা দেশের বিদ্যুত্‍ উত্পাদন এবং ব্যবহারের চিত্র দেখা যেত, যেমন খুলনার একটি মনিটর হতে সারা দেশের বিদ্যুত্‍ উত্পাদন এবং ব্যবহারের চিত্র অর্থাত্‍ এন ,এল ,ডি ,সির পুরা কার্যক্রম দেখা সম্ভব ছিল (কে বেশি বা কম নিচ্ছে ,উত্পাদন এবং সরবরাহ কোথায় কত )। কিন্তু এন,এল, ডি,সি অতিসম্প্রতি সে ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়েছে, এখন প্রতি জেলা, সে শুধু তারটাই দেখতে পারবে। এন,এল, ডি,সির স্বেচ্ছাচারিতা আর অনিয়ম ধরা পর্বে বলে কী এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে?

একটা এলাকার মোট চাহিদা মনে করা যাক ৪০ মে:ও:, উত্পাদন কম হওয়ার কারণে তাকে দেয় হচ্ছে ২০ মে:ও: বিদ্যুত্‍। ফলে কর্তৃপক্ষকে ২০ মে:ও: বিদ্যুত্‍ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এই লোডশেডিংই হচ্ছে প্রকৃত লোডশেডিং যা আমরা জানি। যদি পুরা ৪০ মে:ও: বিদ্যুত্‍ দেয়া হতো তাহলে ওই এলাকায় কোনও লোডশেডিং হতো না। কিন্তু এই ২০ মে : ও : বিদ্যুত্‍ লোডশেডিং চলার সময় এক ঘণ্টা পরপর ওই ২০ মে:ও: বিদ্যুত্‍ও তুলে নিয়ে তাকে বিদ্যুত্‍ শূন্য করে দেয়ার নামই হচ্ছে ফোর্সড লোডশেডিং। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাকে কেন দিনে ৮/৯ বার বিদ্যুত্‍ শূন্য করা হচ্ছে (প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা ), আমার ভাগের বিদ্যুত্‍ কোথায় যাচ্ছে? কাকে দেয়া হচ্ছে? চাহিদার তুলনায় উত্পাদন কম হওয়ায় সে অনুযায়ী একটা সাব স্টেশনকে যা দেয়া হচ্ছে সেটা দিয়ে লোডশেডিং করা হচ্ছে , কিন্তু ওই বরাদ্দকৃত বিদ্যুত্‍ টুকুও কেটে নিয়ে বিদ্যুত্‍ শূন্য করা হচ্ছে ক্যানও বারবার ? উত্পাদন অনুযায়ী বিদ্যুত্‍ , সারা দেশে ভাগ করে দেয়া হয়। কেউ তার বরাদ্দের চেয়ে বেশি ব্যাবহার করলে ওই অতিরিক্ত ব্যবহার্য বিদ্যুত্‍ টুকু অন্য কারও কাছ থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে। এন ,এল ,ডি ,সির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ওই বেশি ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করার সিস্টেম থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বা তাদেরকে বিদ্যুত্‍ শূন্য না করে অন্যায়ভাবে নির্বিচারে সকল ফিডার ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুত্‍ শূন্য করে রাখছে। তা হলে কী এন ,এল ,ডি ,সি , বরাদ্দের চেয়ে বেশি ব্যবহারকারীদের অবৈধ সুবিধা দিচ্ছে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অতিরিক্ত বিদ্যুত্‍ উত্পাদনের সুফল জনগণের কাছে যাচ্ছে না কেন? অতিরিক্ত বিদ্যুত্‍ কী আসলে সরবরাহ করা হচ্ছে না সরকারকে মিথ্যা তথ্য দেয়া হচ্ছে। দুর্মুখেরা যাকে বলে স্যাবোটাজ। এন ,এল ,ডি ,সি মোট উত্পাদিত বিদ্যুত্‍ ২৩০ কে. ভি ২০ টি এবঙ ১৩২/৩৩ কে. ভি. ৮২টি মোট ১০২ টি চ্যানেল বা লাইন দিয়ে সরবরাহ করে। উত্পাদিত মোট বিদ্যুত্‍ ১০২ টি চ্যানেল দিয়ে গ্রিড সাব স্টেশন হয়ে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছায়, এই পর্যায়ে চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি কাজ করবে। কিন্তু উত্পাদন বৃদ্ধি হলে তো ওই ১০২ টি চ্যানেল দিয়ে বিদ্যুত্‍ সরবরাহও বেড়ে যাবে। ২০১০ সালেও ওই ১০২টি চ্যানেল ছিল , তাহলে ২০১০ সালে প্রত্যেক চ্যানেল দিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুত্‍ এন, এল, ডি, সি সরবরাহ করতো, বিদ্যুত্‍ উত্পাদন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে, ২০১২ সালে তার চেয়ে সরবরাহ বেশি হাওয়ার কথা। যেমন ধরুন, ২০১০ সালে ৪০০০ মে:ও: বিদ্যুত্‍ উত্পাদন হলে যে চ্যানেল দিয়ে ৩০০ মে:ও: বিদ্যুত্‍, কিংবা ২০০ বা ২৫০ মে:ও: বিদ্যুত্‍ সরবরাহ হত, ২০১২ সালে ৫০০০ মে:ও: বিদ্যুত্‍ উত্পাদন হলেও ওই চ্যানেল দিয়ে বিদ্যুত্‍ সরবরাহ যাচ্ছে যথাক্রমে ২৫০, ১৫০, ২০০ মে:ও: বিদ্যুত্‍, অর্থাত্‍ বিগত বছরের তুলনায় উত্পাদন অনেক বৃদ্ধি পাওয়ার পরও সরবরাহ না বেড়ে কমে গিয়েছে। ২০১০/২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে বিদ্যুত্‍ উত্পাদন অবশ্যই বেড়েছে, তা হলে ওই ১০২টি চ্যানেল এর প্রত্যেকটিতে বিদ্যুত্‍ সরবরাহ কম হচ্ছে কেন? চাহিদা বেড়েছে সেটা তো পরের কথা, উত্পাদন বাড়লে ন্যাশনাল গ্রিড হতে সরবরাহ কমবে কেন? সেটাও তো তুলনামূলকভাবে বাড়ার কথা । ১০২টি গ্রিড সাব স্টেশন হতে ডাটা নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে । সবকটি উত্পাদন কেন্দ্রের মোট উত্পাদন , সেটার সঙ্গে এন,এল,ডি,সির হিসাব এবং ১০২টি গ্রিড সাব স্টেশনকে কত ন্যাশনাল গ্রিড হতে সরবরাহ পাচ্ছে তা মিলিয়ে দেখলেই সব অনিয়ম আর গোঁজামিল বের হয়ে যাবে। কিন্তু তা কোনও সময়ই করা হয় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুত্‍ খাতের কোথায় যেন অমানিশার অন্ধকার ঘুরপাক খাচ্ছে, যেটা থেকে বের হতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। এন,এল,ডি,সির মধ্যে ভূত আছে কিনা তা যাচাই করে দেখা আবশ্যক। এন, এল, ডি, সি কোনও একটি উত্পাদন কেন্দ্রের উত্পাদন সম্পূর্ণ বা আংশিক শুধু একটি মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে বন্ধ করে দিতে পারে কিন্তু তা রেকর্ড বা লিখিত প্রমাণ রাখার ব্যবস্থা করা হয়নি। সেই উৎপাদন কেন্দ্রেরও সেটার কারণ জানা বা সে বিষয়টি কোথাও উপস্থাপন করার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। একচেটিয়া কর্তৃত্ব সঠিক এবং যথাযথভাবে পালন করার মত যোগ্যতা আমদের এখনো হয়নি। তাই বিদ্যুতের উত্পাদন এবং শেডিং এর মত জন দুর্ভোগের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তা না হলে সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকা স্বত্বেও সব ভেস্তে যাবে।

পুনশ্চ : সারা দেশে গ্রাহক পর্যায়ে গ্রিড কন্ট্রোল এবং সিস্টেম কন্ট্রোল রুম গুলোতে যারা কাজ করছেন তাদের বছরের পর ধরে অন্যত্র বদলি করা হয় না I ১৫ ,২০, এমনকি ২৫ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন একই ব্যাক্তি একই নিয়ন্ত্রণ কক্ষে , সরকারের পর সরকার গিয়েছে কিন্তু তাদেরকে অন্যত্র বদলি করা হইনি I

প্রততেক বিভাগ ও জেলা শহরের প্রধান প্রকৌশলী (পি ডি বি ) ওই এলাকায় বিদ্যুত্‍ বিতরণে নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম বা নীতি অনুসরণ করেন না I প্রধান প্রকৌশলী তার ইচ্ছা মত বিদ্যুত্‍ বিতরণ করে থাকেন , অর্থাত্‍ তার ইচ্ছার উপর জনগণের ভাগ্য নির্ভর করে I ওই জেলায় একটা কমিটির মাধ্যমে বিতরণ তালিকা করার নিয়ম থাকলেও প্রধান প্রকৌশলী নিজেই তালিকা প্রণয়ন করেন কিন্তু তা গোপন রাখা হয় , ওই এলাকার বিদ্যুতের অন্য প্রকৌশলীরাও সে তালিকা পাননা I

***
ফিচার ছবি: http://www.newsbrahmanbaria.com [২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন] থেকে সংগৃহিত