ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

বদলে যাও, বদলে দাও , এই নীতিতে অনুপ্রাণিত হইয়া আমার মতো সবাইকে আলোকিত মানুষ বানাইবার খায়েশ লইয়া লিখাটি ছাড়িলাম । আলোকিত মানুষ হইবার, ইহার চাইতে ভাল তরীকা আর আমার জানা নাই । সকলকে আলোকিত করিবার এক মহান ব্রত হাতে লইয়াছি । ব্লগটি পড়িয়া কেহ আলোকিত হইলে নিজেকে স্বার্থক বলিয়া মনে করিব।

কিভাবে আলোকিত মানুষ হইলাম তাহা বর্ণনা করিবার আগে, শুরুটা কিভাবে হইল, তাহার সামান্য ইতিহাস না বলিলেই নহে। সেই ছোট বেলায়, তরীকাটি পাইবার হাতেখড়ি হইয়াছিল । তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করাইয়া কিংবা বানরের বাচ্চাকে পুকুর হইতে বাঁচাইয়া, বেহেস্তে যাইবার সবচাইতে সহজ রাস্তার খোঁজ পাইয়া যারপরনাই পুলকিত হইয়াছিলাম । মনের ভয় তখন হইতে উধাও হইয়া এক অনাবিল শান্তি বিরাজ করিতেছিল । ইহা নিশ্চিত হইয়া গিয়াছিলাম যে, সহজে মাফ পাইবার ফাঁকফোকর আরও অনেক রহিয়াছে । উহা আত্মস্থ করিতে পারিলেই, যত গুনাহ আর পাপ করিনা কেন, মরদে মোমিন হইয়া যাইবার রাস্তা একেবারেই খোলা । একটু বড় হইতেই বুঝিয়া ফেলিলাম, মহান আল্লাহ্‌ “ক্ষমাকারী” নাম ধারণ করিয়াছেন আমদিগকে মাফ করিয়া দেওয়ার জন্য । আমরা পাপ না করিলে, সেই মহান নামের গুন আর থাকিবে না । কাজেই, পাপ করিতে আমার অন্তর একটুও কাঁপিয়া ওঠে না।

তাই নামাজ পড়িয়া মসজিদ হইতে বাহির হইবার সময় সুন্দর আর নতুন জুতার লোভ সামলাইতে পারি না । রাত্রিবেলা, ভুল করিয়া নিজের ঘর মনে করিয়া অন্যের ঘরে ঢুকিয়া পড়ি । তাহাদের ঘরে ঢুকিয়া টাকাপয়সা-সোনাদানা গ্রহন করিয়া গৃহস্থের যাকাতের ভার লাঘব করিয়া থাকি । জীবনে সব পেশার স্বাদই গ্রহণ করিয়াছি। ওজনে ঠকাইয়াছি, ভেজাল দিয়াছি, খাবারে ক্যামিকেল মিশাইয়াছি, চোরাচালানি-চোরাকারবারী, মজুতদারি সব করিয়াছি । এতিমের হক মারিয়াছি, আমানতের খেয়ানত করিয়া হাত পাকাইয়াছি । রোজার মাসে রোজাদারদের পকেট কাটিয়া রমরমা ব্যাবসা করিয়াছি । আন্ডার- ইনভয়েসিং, ওভার-ইনভয়েসিং, মানিলন্ডারিং, রাতের আঁধারে কনটেইনার পাচার, ডলার পাচার, কি করি নাই ? নদী-নালা, খাল-বিল, জমি, সব দখল করিয়া জনগণের কল্যাণ সাধন করিয়াছি । নিজের দেশের তেল-মবিল আর সার পাশের দেশে পাচার করিয়া, সেখান হইতে উপকারী ঔষধি ফেনসিডিল-ইয়াবা আনিয়াছি । হাতেগড়া সেতু-কালভার্ট, বিল্ডিং, এক নিমিষেই বাতাসে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে । রোগীর গলাকাটা ফি লইয়া প্যাথলজি হইতে কমিশনও খাইয়াছি । মিথ্যা মামলা লইয়া, ছয় মাসের মামলা ষোলো বছর ঝুলাইয়াছি। লাশ হইতে পয়সা বানাইয়াছি, আসামিকে ছাড়িয়া নিরীহ পাবলিকরে গারদে ঢুকাইয়াছি ।

স্কুলে-কলেজের ক্লাসরুমে, মোহময় কৌশলে এমনভাবে উলটাপালটা পড়াই যে, ছাত্র-ছাত্রীরা কানাগলি, চিপাগলি ডিঙ্গাইয়া আমার বাসার ঠিকানা খুজিয়া বাহির করিবার জন্য পাগলপারা হইয়া যায় । ইহাতে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অতিশয় মধুময় ও পবিত্র হইয়া ওঠে

উপরি ছাড়া কোন ফাইল সই করিনাই । স্লো-মানি লইয়া, স্পীড মানিও হস্তগত করিয়াছি । ঘুষ খাইতে নামাজের ওয়াক্ত হইলে উহা ফেলিয়া নামাজে শরীক হইয়া থাকি, তবে ফিরিয়া আসিয়া পাওনাটুকু বুঝিয়া লই, উহাতে কোন মাফ নাই । ঘুষের সহিত নামাজ-রোজার কি সম্পর্ক তাহা আজও বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না (তাহা ছাড়া রোজার মাসে বেশি করিয়া না খাইলে ঈদে পরিবারকে দামী উপহার প্রদান করিব কিভাবে) । স্বাধীনতার সুফল গনিয়া গনিয়া নিজের গোলায় তুলিয়াছি । ভোটের সময় জনগণরে মাথায় তুলিয়া, কর্ম হাসিল হইবার পর আছড়াইয়া মাটিতে ফেলিয়াছি । রাতের আঁধারে বস্তা টানিয়াছি, মিথ্যার বেসাতি করিয়া সত্যের টুটি চিপিয়া ধরিয়াছি । কমিশন খাইয়া আঙ্গুলগুলা কলাগাছ বানাইয়াছি । জনগণের নিকট ওয়াদা করিয়া, মনেমনে উহা পালন না করিবার ওয়াদা করিয়াছি । কারণ আমি জানিয়া গিয়াছি যে, বোকা আর গর্দভ জনগণ একটি ওয়াদা পালন না করিলেও তাহারা পুনরায় আমাকে মাথায় তুলিয়া লইবে ।

জনকল্যাণে শত ব্যাস্ততার মাঝেও আমি নিজের তরীকা ঠিক রাখিয়াছি । বেহেস্তে যাইবার সুযোগ তো আর হাতছাড়া করিবার নহে। স্ত্রী-কন্যারা, অকাতরে হিজাব পরিধান করিয়া স্বামীর বেহেস্তে যাইবার পথ সুগম করিয়া দিয়াছে । সন্তানদিগকে নামকরা বিদ্যালয়ে পড়াইয়া বড় মানুষ বানাইতেছি, যদিও তাহারা পিতা-মাতার জন্য কিভাবে দোয়া করিতে হয় তাহাও জানে না । পীর সাহেবের নিকট যথারীতি হাজিরা দেই, তাঁহার এবং মুরিদানদের কল্যানে নিজেকে উৎসর্গ করিয়াছি । সারারাত ধরিয়া ওয়াজ মাহফিলে উপস্থিত থাকিয়া বিশাল অংকের চান্দা প্রদান করিয়া থাকি । আল্লাহ্‌-রাসুলের নাম উঠিলেই কান্দিয়া রুমাল ভিজাইয়া দেই । দান-খয়রাত, ফকির-মিসকিন কাহাকেও অখুশি করি না । মসজিদ, মাদ্রাসা আর এতিমখানায় অকাতরে দান-খয়রাত করিয়া থাকি । খাইয়া-না খাইয়া রোজা রাখি, খতমতারাবী ভুল হয় না । রোজার সময়, মাইকে সারারাত্রিতে ওয়াজ আর মিলাদ মাহফিল করিয়া রোজাদারদের ঘুমাইতে না দিয়া উহা শুনিতে বাধ্য করিয়া থাকি । ইহার চাইতে পুণ্যির কাজ আর কি হতে পারে।

কোরবানির ঈদে এমন আযদাহা গরু দিয়া কোরবানি দেই যে, গরুর সাইজ দেখিয়া এলাকাবাসী রাস্তায় বাহির হইতে ভয় পাইয়া যায়, সবাইকে আমার ক্ষমতা দেখাইবার জন্য গরু লইয়া পোলাপানগো রাস্তায় ছাড়িয়া দেই । ইহাতে তাহারা গর্বিত হইয়া আনন্দে কোরবানির তাৎপর্যই ভুলিয়া যায় । সবে-বরাত আর সবে-ক্বদরের রাতে, সারারাত ধরিয়া কান্নাকাটি করিয়া আল্লাহর নিকট হইতে চলতি বছরের পাপগুলা মোচন করাইয়া লই । যেমন ২০১২ সালের চলতি গুনাহ-খাতা সামনের ৬ জুলাই, পবিত্র রাত্রিতে মোচন করাইয়া লইব । পরেরগুলো ২০১৩ সালের রাত্রিতে । যদিও আল্লাহপাক জানেন রাত্রির শেষে ভোর হইতেই আমি আবার পূর্বের মহান কর্মে ফিরিয়া যাইব, তথাপি উনি আমাকে ওই রাত্রিতেই মাফ করিয়া থাকেন ।

এইভাবেই দিন গুজরান হইতেছে । ফাঁকফোকরে যে পাপগুলি পিছলাইয়া যায় তাহা মহান ও পবিত্র হজব্রত পালন করিয়া পাপমুক্তি লাভ করিয়া থাকি । বেতনের টাকা জমাইয়া উহা দ্বারা হ্বজ পালন করিয়া থাকি । মুফতে পাওয়া অর্থ দ্বারা সংসার ও দান খয়রাতে ব্যয় করি । ইহা একটি অতি সৌন্দর্যমণ্ডিত টেকনিক । যদিও আমি অংকে কাঁচা, কিন্তু দিনের শেষে, প্রতিদিনের পাপপুণ্যের হিসাব লইয়া বসি । আমি জানিয়াছি যে, আমার ডান কান্দের ফেরেস্তা, একটি পুণ্য করিলে দশটি পুণ্যি লিখিয়া থাকে, আর বাম কান্দের ফেরেস্তা দশটি পাপ করিলে একটি পাপ লিপিবদ্ধ করিয়া থাকে । ইহার চাইতে মোক্ষম তরিকা আর কি হইতে পারে । দশটি পাপ সমান একটি নেকি । পাপপুণ্যের পাল্লা-পাথথর লইয়া উহা মাপিয়া পাল্লাটিকে সবসময় পুন্যের দিকে হেলাইয়া রাখা যায় । প্রতিদিন কিছু দান খয়রাত আর ভাল কাজ এবং কথা বলিলেই কেল্লাফতে ।

তবে, মাঝেমধ্যে কিছু দুর্মুখ আমাকে ভয় দেখাইবার চেষ্টা করিয়া থাকে । কেহ বলে, অবশেষে সাড়ে-তিনহাত । কেহ বলে, যাহাদের জন্য এতকিছু করিয়াছ, তুমি মরিলে তাহারা কেহ তোমার কবরে একবার যাইবেও না । আবার কেহ বলে, আল্লাহর হক না হয় মাফ করাইয়া লইলা, কিন্তু হাজার লাখো মানুষের যে আমানতের খেয়ানত করিয়াছ , তাহাদের হক নষ্ট করিয়া কষ্ট দিয়াছ, তাঁহারা মাফ না করিলে তো আল্লাহও মাফ করিবেন না । মাফ চাইবার জন্য এতগুলি মানুষকে পাইবা কোথায়, তাহাদের ঠিকানাও তো জান না । আবার তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ মরিয়াও গিয়াছে । এইসব দুর্মুখদের মুখে চুনকালি পড়ুক। আমি ভয় পাইবার মানুষ নহি, কারণ মাফ পাইবার বহু তরিকা আমার জানা রহিয়াছে, ইহা ছাড়া রাস্তাঘাটে তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি খাওয়াইবার পথ তো খোলা আছেই !!