ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

কথা ছিলো ‘‍‌‌পিএনপিসি’ নিয়ে লিখবো। হ্যা, অবশেষে সময় পেলাম। জ্ঞানীগুনীজন, আপনারা নিশ্চয়ই এই শব্দটির ব্যাখ্যা জানেন। পর-নিন্দা-পর-চর্চা, হ্যা পরনিন্দা পরচর্চা আমাদের মজ্জাগত। মানবজাতির প্রায় বেশিরভাগ ইতিহাস ঘেটেই দেখা গেছে, পৃথিবীর এই অধিবাসী জীবনকালের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়ে দেয় অন্যের পেছনে লেগে, অন্যকে নিয়ে আলোচনা করে, অন্যের বিষয়ে ভেবে এবং ভাবিয়ে। ফলে প্রতি মুহূর্তেই কমে আসছে মানুষের আয়ু, ক্রমেই বাড়ছে সংঘাত আর যুদ্ধ, বাড়ছে ক্রোধ আর বিদ্বেষ, ছড়িয়ে পড়ছে লোভ-হিংসা-অপরাধের প্রবণতা। এই প্রবণতা মানুষকে মানবসমাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্যান্য পশুপ্রাণীদের রাজ্যে নিয়ে গেছে। সেখানেও পশুপাখিদের জীবনযাত্রায় বাগরা দেয়া এখন মানুষের কাজ।

জাতি হিসেবে অনেক দোষ বাঙ্গালির। দুটি গুণের কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত, এক হলো অতিথিপরায়ণ এবং দুই প্রতিবাদী-সংগ্রামী। দুটি গুণই কিন্তু অনন্য নয়; বিশ্বের বহু জাতিগোষ্ঠী এসব বৈশিষ্ট্যের ধারক। যাক সে কথা। বিপরীতভাবে অন্যান্য অনেক জাতির মতো আমরাও খুব মারাত্মকভাবে ‘পিএনপিসি’ দোষে আক্রান্ত। এই রোগের মাত্রা বোধকরি দিনদিন বেড়ে চলেছে।

যুগ পাল্টায়, বয়ে চলে সময়, বদলে যায় মানুষের জীবনের আঙ্গিক। দর্শণ, চিন্তা সামাজিক মূল্যবোধ, আচরণ-ভঙ্গিমায় আসে বদল। পিএনপিসির তাহলে কি হবে? যা হবার তাই হবে!

সময়ের সাথে সাথে সমাজের নতুন নতুন ক্ষেত্রে নবনবরূপে চলবে পিএনপিসি, চলবে অন্যের যাত্রাভঙ্গের নতুন ধরণের খেলা। অন্যান্য নেশার মতো অপরের নিন্দামুখর দিন কাটানোর নেশাগ্রস্ততা। আহা কি আনন্দ! কি মজা!

সমালোচককে বন্ধু ভাবি, নিন্দুককে ভাবি আমার সুহৃদ। হ্যা, সমালোচনাবিহীন জাতি কখনোই এগিয়ে যেতে পারেনা। কিন্তু কি অদ্ভুত! আমরা কি একটা দর্পণ বিহীন দুনিয়ায় বসবাস করছি? আমার সমাজে কি নেই কোনো আয়না। যার সামনেটায় দাঁড়িয়ে একটাবার একটি মানুষ তার মুখটা দেখবে। একবার একটুখানি ভাববে সে নিজে কি করছে! পরচর্চার অধিকার তখনই অর্জিত হয়, যখন নিজেকে পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয় কোনো মানুষ। আমরা খুব বেশি ব্যর্থ সেই জায়গাটিতে। দিনশেষে কি আমরা হিসেব করে দেখি, সারাদিনে কি অর্জন করলাম! কতটুকু নিজের জন্য, সমাজের জন্য, পরিবারের জন্য, আমার চারপাশের মানুষের জন্য, দেশ ও পৃথিবীর জন্য করলাম? অংক টা কি মেলাই, কতজনের পিছনে লাগলাম, কতজনের দোষ ধরলাম, কতজনের সমালোচনায় মগ্ন হলাম, কতজনের জাত-পাত ধুয়ে দিতে পারলাম? কিসের অধিকারে করছি এসব? আমাদের কর্মক্ষেত্রে, আমাদের সমাজে এখন ফ্যাশন তো এটাই। এই হালফ্যাশনে, দশজনে মিলে সিগ্রেটের ধোয়ার সঙ্গে কোনো একজনের অন্তেষ্টিক্রিয়া করে ফেলছি। এরপর আরেকজনের, তারপর আরেকজন! সেই মানুষটা কি আমার পর্যায়ের, আমার সমকক্ষ, আমার প্রতিযোগি, আমার গুরুজন, আমার অনুজ তা কিন্তু ভাবছিনা। একটার পর একটা সিগ্রেট, হাত ঘুরে হাতে; আর তার সাথে ঠোঁট থেকে ঠোঁটে নিন্দা বাণী। কার লাভ হচ্ছে এতে? যার নিন্দা করছি, সেকি বদলে যাচ্ছে? যার ভুল ধরে তার সর্বনাশ করে ফেলছি, সে কি ঠিক করতে পারছে? যার আচরণ কিংবা অর্জন নিয়ে সমালোচনা করছি, তার কোনোটিই কি রং পাল্টাচ্ছে? আমি বা আমরা যারা ‘পিএনপিসি’ করে সময় কাটাই, তারা তো এ জগতের সাধু-সন্নাসী, নির্ভুল-নির্ভীক ব্যক্তিত্ব। তাহলে কেনো চিপায়-চাপায়, কোনা-কাঞ্ছিতে, বেঞ্চে-স্টলে বসে বৃথা চেষ্টা করছি! ভাই বা বন্ধু বলে একটু ডাক দিয়ে তার ভুলটা কেনো দিচ্ছিনা শুধরে? কোনো বলছি না তাকে বদলে যেতে? কোনো সৎ উপদেশে মহতি দায়িত্বটি পালনে নিচ্ছি না ভূমিকা? নাকি আসলে সবই ভাওতাবাজি! পিএনপিসিবাজদের কাজই নিজের ব্যর্থতা আর হতাশার গ্লানি অনুভবের ডিউরেশনটা যাতে কম হয় তার জন্য অন্যের চর্চায় ব্যস্ত থাকার চেষ্টা। অথবা নিজের নোংরামি আর সুবিধাবাদি চরিত্রটি বেপর্দা হয়ে সবার সামনে বের হয়ে না আসুক, সেই উদ্দেশ্যে পরচর্চায় আশপাশের পরিবেশকে মগ্ন করে রাখার প্রবণতা। ঘটনা যেটাই হোক, এ যে চরম অসুস্থতা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নেশাখোর, বিকৃত রুচির, অসুস্থ কোনো মানুষের সাথে চলতি সময়ের পিএনপিসিবাজদের কোনো ফারাক আছে বলে বোধ করি না। আসুন না আমার পিএনপিসিবাজ বন্ধু জনেরা, বেঁচে থাকার জন্য একটু সুস্থ্য শ্বাস নেই! প্লিজ!