ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ। ছুটির দিনের অলস দুপুর। খাবার শেষ করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই চ্যানেল আইয়ের পর্দায় ভেসে উঠে “কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১”। সমকালীন কৃষি অর্থনীতি ও উন্নয়নের উপর তথ্যভিত্তিক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান “হৃদয়ে মাটি ও মানুষ” খ্যাত শাইখ সিরাজের পরিকল্পনা, উপস্থাপনা ও পরিচালনায় অনুষ্ঠানটি। এর আগে কৃষকদের নিয়ে তাঁর ব্যতিক্রমী অভিনব ভাললাগার অনুষ্ঠান “কৃষকের ঈদ আনন্দ” ও “কৃষকের বৈশাখী আনন্দ” দেখেছি। মনটা ছুঁয়ে গেছে। অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই হেসেছি আবার মানুষের মানবেতর জীবন যাপন দেখে চোখের কোণে জমে উঠেছে বিষাদের অশ্রুবিন্দু। তিনি যেমন মানুষকে হাসাতে পারেন, পারেন কাঁদাতেও।
শাইখ সিরাজের পরিশ্রমী ক্লান্ত চেহারা দেখে নিজেকে অনেক ছোট মনে হয়েছে। একজন কৃষকের ছেলে হয়েও আমি- আমার মত অনেকেই রঙচটা শহরের মোহে চার দেওয়ালের ভেতরে বন্দি হয়ে গেছি। ভুলে গেছি বাবা-চাচাদের কথা। তাঁদের রোদ-বৃষ্টি-কাদায় ভিজে খাবার যোগাড় করার কথা। তাঁদের ভাল লাগা মন্দ লাগার কথা। এই মাটির মানুষটি শহরের কংক্রিটের ঘরে বাস করেও ভুলতে পারেনি তাঁর শেকড়কে। তাঁর অস্তিত্বকে। তাই তিনি কৃষকদের ভাল লাগা মন্দ লাগা নিয়ে তৈরি করেন নানা অনুষ্ঠান। কীভাবে কৃষকদের একটু আনন্দ দেয়া যায় চেষ্টা করেন নিরন্তর। পাশাপাশি কৃষকদের নানা সমস্যা, সাফল্য, অধিকারসহ নানা বিষয় চিত্রিত হয় তাঁর “হৃদয়ে মাটি ও মানুষ” অনুষ্ঠানে। কাদা মাটির মানুষ শাইখ সিরাজ অবলীলায় মিশে যান কৃষকের সাথে; তার বন্ধু হয়ে। থিকথিকে কাদা, চৈত্রের ফাঁটা মাঠ, বালুর চর, সিডর, জলোচ্ছাস কোনো কিছুই তার প্রতিবন্ধকতা হয়ে সামনে দাঁড়াতে পারে না। কৃষককে কতটা ভালবাসলে একজন মানুষ এমনিভাবে মিশে যেতে পারে তাদের সত্ত্বার সাথে!

কৃষিকে আজ শাইখ সিরাজ নিয়ে এসেছেন শহরের চার দেওয়ালের ড্রয়িং রুমে। এ কাজ শুধু শাইখ সিরাজের পক্ষে করাই সম্ভব। গ্রামের পথে-প্রান্তরের-শহরে এমন কোনো মানুষ নেই এই মাটির মানুষটিকে চেনে না, ভালবাসে না, কাছে টানে না। কথা বলছিলাম “কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১” নিয়ে। প্রসঙ্গতই এর মূল কারিগরের কথা না বলে পারলাম না। এবার ফিরে আসছি মূল আলোচনাতে। বরিশালের নেছারাবাদের বিন্না গ্রাম। এই গ্রামের ঘরে ঘরে তৈরি হয় ক্রিকেটের উপকরণ ব্যাট। দেশ ছেড়ে বিদেশের খেলোয়াড়রাও এই ব্যাট নিয়ে খেলছে তা আমার মত অনেকেরই অজানা। সে কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে “কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১”-র শুরুর দিকে। বিষয়টি সত্যি ভাল লাগার মত।
রাত। আলোর বন্যায় ভাসছে ময়মনসিংহের চরপুলিয়ামারি রাজা বাঁশের স্টেডিয়াম। নারী-পুরুষ হাজার হাজার দর্শক। সাইডবারে নানা রকম রসাত্মক শ্লোগান “২ নম্বর ফিস ফিড- নিয়মিত খাওয়ালে, মরবে মাছ অকালে”, “জীবনাবসান কীটনাশক, তুলবে পটল ক্রেতা সকল”, রূপবান সার.., নকলের ভিড়ে প্রকৃত ভেজাল, রূপবান ধান…..মরা ধান” ইত্যাদি। ধারা বর্ণনায় আবদুল হামিদ ও মনজুর হাসান মিন্টু বসেছেন মাঠের এককোণে। কৃষকদের আনন্দ দেবার জন্য বিশাল এক আয়োজন। সারি বেধে ব্যাট হাতে মাঠে আসে কৃষক। পরিচয় পর্বও শেষ হয়। ঠিক যেন নিয়ম বাধা ক্রিকেট শুরু হয়েছে।

পিচ পরীক্ষা এবং টসের জায়গায় শাইখ সিরাজের উপস্থিতি কেমন যেন বেখাপ্পা লাগে আমার কাছে। খেলা শুরু হয় বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়ার। টসে জিতে বাংলাদেশ ব্যাট করছে। কি আশ্চর্য অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাদের প্রথম ওভারেই ১৫ রান! দেখতে দেখতে নির্ধারিত ১০ ওভারে ১ উইকেটে বাংলাদেশ রান তোলে ১২২। পানি পানের বিরতিতে ভ্যানে করে আসে তালুদারের ডাবের পানি আর মাঠা। আইডিয়াগুলো সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো। কৃষকদের ব্যাটিং, বোলিং, রান তোলা, ক্যাচ ধরা সত্যিই সবাইকে অবাক করে দেবার মত। কস্টিউমও ছিল নজর কাড়া। মাঝে মাঝে চার ছয় হলে বানরের নাচ ছিল উপভোগ্য। কৃষকরাও যে ব্যাট ধরে ক্রিকেট খেলতে পারে, মজা করতে পারে তার অনন্য উদাহরণ ময়মনসিংহের চরপুলিয়ামারি রাজা বাঁশের স্টেডিয়াম।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ১০ ওভারে ৬ উইকেটে অস্ট্রেলিয়া ৭৫ রান তোলে। বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার চরম পরাজয়। উচ্ছ্বাসে ফেটে পরে দর্শক। যেন এটাই চাওয়ার ছিল তাদের। পাশাপাশি সারা মাঠ ঘুরে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা আনন্দকে ভাগাভাগি করে নেয় তাদের সাথে। এরপর যথারীতি শুরু হয় ফারমার অব দ্যা ম্যাচ ঘোষণার পালা। এখানে শাইখ সিরাজ সেরা খেলোয়াড়কে ছাগল দিয়ে পুরষ্কৃত করেন। পাশাপাশি দু’দলের অধিনায়কদের অনুভূতির কথা জানতে চান। পর্যায়ক্রমে কাপ তুলে দেন বাংলাদেশ অধিনায়কের হাতে। আকাশে দেখা যায় বাজি ফোটানোর হিড়িক। “কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১” এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে এর শেষে যুক্ত হয় রয়টার্সের খবর, যা এখানে কোনোভাবেই মানায় না। বাংলাদেশ দলের বিজয় দেখিয়ে অডিওর মাধ্যমেও ক্রিকেট বিশ্বকাপে তাদের জন্য শুভ কামনা জানানো যেত বলে আমার মনে হয়েছে।
সব মিলিয়ে “কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১” একটি উপভোগ্য অনুষ্ঠান যা সব শ্রেণীর দর্শকদের মন ছুঁয়ে যেতে পেরেছে। ধারা বর্ণনার পাশাপাশি ইনসেটে শাইখ সিরাজের সাক্ষাতকার নিলে অনুষ্ঠানটা আরো জীবন্ত হয়ে উঠত বলে আমার মনে হয়েছে। শাইখ সিরাজের মত কৃষককে ভালবেসে এত দরদ দিয়ে ক’জন তাদের সুখ-দুঃখের ছবি আঁকতে পারেন? যদিও তিনি দু’বার উপস্থাপনার সময় কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১ এর জায়গায় ২০১০ উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেক ওভার শেষে বিজ্ঞাপন ছিল সত্যিই বিরক্তিকর। এত বড় একটা আয়োজনের ভেতর সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতেই পারে। তবে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য কি সেটাই মূল বিষয়। এদিক দিয়ে শাইখ সিরাজ সফল।