ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

আমার অনেক কথার সাথে একমত পোষণ না করলেও পুঁজিবাজারের বর্তমান এ নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ প্রয়োজন- এ কথার সাথে অনেকেই একমত হবেন বলে আশা করি। পুঁজিবাজার সকল দেশেই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বাজার যেখানে একটি তুচ্ছ ঘটনাও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে আবার সামান্য সুখবরও বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে পারে। পুঁজিবাজার একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির একটি প্রতিবিম্ব মাত্র। অর্থনীতির এই মানদণ্ডে এত মানুষের প্রতিক্রিয়া একই সংগে এত তড়িৎ গতিতে আর কোথাও প্রতিফলিত হয় না। মন গড়াই হোক আর উদ্দেশ্য প্রণোদিতই হোক আমাদের একটি মন্তব্য করা চাই। স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ শাহ এএমএস কিবরিয়া সাহেব বলেছিলেন শেয়ার মার্কেট কি, আমি বুঝি না। অনেকেই বিরূপ সমালোচনা করলেও এমন স্বীকারোক্তির উদাহরণ কিন্তু খুব কমই দেখা যায়। উনার ব্যর্থতার দায়ভার ছিল তা আমি অস্বীকার করিনা। আমি শুধু বলতে চাই কেউ যদি না বোঝেন তবে মন্তব্য করার দরকার কি? মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তৃতি আর মত প্রকাশের স্বাধীনতায় আমরা বোঝে নাবোঝেই মন্তব্য করে ফেলি। পুঁজিবাজারের সূচকসমূহের উপর নূন্যতম ধারণা না নিয়ে এই সংবেদনশীল বাজারের উপর মন্তব্য না করার জন্য আমি সকলকে সবিনয় অনুরোধ করছি। ডি,এস,ই এর ইনডেক্স এর তুলনায় সি,এস,ই এর ইনডেক্স প্রায় দুই গুন তার মানে এই নয় যে চট্টগ্রাম পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম দ্বিগুণ। দুইটি বাজারে দুইভাবে ইনডেক্স গণনা করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে শেয়ারের দাম বাড়লে ইনডেক্স বাড়ে কমলে কমে এটা সবাই বোঝে কিন্তু কিভাবে অঙ্ক কষে এই ইনডেক্স নির্ণয় করা হয় তা আমরা অনেকই বুঝি না। না বুঝেই বলি ইনডেক্স সাড়ে চার হাজার হওয়া উচিৎ। আবার বাজার মূলধন সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা থাকলে আমরা বলতে পারতাম না বাজার থেকে ৮৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। এন,বি,আর এর পরিসংখ্যান জানলে সি,পি,ডি এর কর্তা ব্যক্তি ১০ লক্ষ থেকে ৩৪ লক্ষ করদাতা এক লাফে বানিয়ে দেয়ার অবান্তর প্রস্তাব উত্থাপন করত না। এসব মন্তব্য করে দেবতাদের প্রিয় (দেবপ্রিয়) হওয়ার চিন্তা বাদ দেয়াই ভাল। শুধুমাত্র পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থায় বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি যতটুকু বিনষ্ট হয়েছে তা আপনাদের মত সহস্র বিবৃতিজীবি একসাথে বিবৃতি প্রদান করেও পুনরুদ্ধার করতে পারবেন না। তাই সংবাদমাধ্যম সমূহ কেও বিনীত অনুরোধ করব বিবৃতি বিশ্লেষণ কম করে তথ্য উপাত্ত পরিবেশনে অধিকতর মনোনিবেশ করলে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবে।

এবার দেখা যাক সাম্প্রতিক পতনের দিকে- এবারের বাজার পতনে কিছু কারসাজি হয়েছে, কিছু অনৈতিক কাজ হয়েছে আর কিছু হয়েছে দুর্নীতি। কারসাজি এবং অনৈতিক কাজ দুটিই হয়েছে নীতি বা আইনের মধ্যে থেকে। বর্তমান আইনে এর বিচার সম্ভব নয়, বিচার চাই বিচার চাই বলে গলা ফাটালে লাভ নেই। যারা পদে থেকে আইন ভঙ্গ করে কাজ করেছেন তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং বিচার হবে। একজন বিনিয়োগকারী ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান কম দামে শেয়ার কিনে বেশী দামে বিক্রয় করে অনেক মুনাফা নিয়ে চলে গেছে এটা তো কোন আইন ভঙ্গ নয়। এখন শেয়ারের দাম কমেছে সে আবার বিনিয়োগ করবে তাকে অনর্থক আইনি ভয় দেখিয়ে বাজার থেকে দূরে রাখা মানে বাজারেরই ক্ষতি। সরকারের যে সকল দায়িত্বশীল ব্যক্তি আইন ভঙ্গ করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে সে ব্যাপারে সরকারকেই কাজ করতে দিন। দোষীদের সাজা প্রদান আর নতুন আইন তৈরি করে হোক সে দায় এখন সরকার এর। যারা পুঁজি হারিয়েছে তাদের ভয় নেই আর যারা পুঁজি অর্জন করে ভয় করছে তারা কোন কোন ক্ষেত্রে অনৈতিক কাজ করলেও বেআইনি কোন কাজ করে নাই এই মর্মে আশ্বস্ত করা যাতে তারা আবার নতুন করে বিনিয়োগ এ আগ্রহী হয়। সকল বিনিয়োগকারীদের বাজারমূখী করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

এবার দেখা যাক কর প্রসঙ্গ- দেশের এত বড় একটি বাজার যেখানে হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয় তা সরকারের রাজস্ব আয়ের বাইরে থাকবে কেন? যারা টিন নাম্বার বসিয়ে গেইন এর উপর ট্যাক্স আদায়ের মোটা বুদ্ধি সরকারকে দিচ্ছেন তাদের কাছে প্রশ্ন এর মাধ্যমে আপনারা সরকারকে কতটুকু লাভবান করতে পারবেন? বর্তমানে যারা বাজারে এখনো টিকে আছে এবং যে পরিমাণ পুঁজি হারিয়েছে তারা আগামী এক বৎসরে নিজের বিনিয়োজিত পুঁজি আসল ফেরত আনার পর লাভ করবে এমন চিন্তাও করে না বরং আগামী এক বৎসরে তারা ক্ষতি কমানোর চেষ্টাই করে যাবেন, যেখানে গেইন এর আশাই নাই সে ক্ষেত্রে গেইন ট্যাক্স আসবে কোথা থেকে? বিনিয়োগকারীদের উপর কোন বিরূপ প্রভাব না ফেলে কিভাবে সরকার পুঁজিবাজার থেকে রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে তার একটি পরামর্শ আমি রাখতে চাই। অনুগ্রহপূর্বক সংশ্লিষ্টদের নিচের প্রস্তাবনাটি একটু মনোযোগ দিয়ে অনুধাবন করার অনুরোধ করছি।

বিশ্বের যে ক’টি বাজার সম্পর্কে আমার ধারণা আছে তাতে দেখা যায় বাংলাদেশর পুঁজিবাজার এ শেয়ার ক্রয় বিক্রয়ের ব্রোকারেজ কমিশন অত্যন্ত বেশী। অন্যান্য দেশে ব্রোকারেজ কমিশন নেয়া হয় হাওলার সংখ্যার উপর আর বাংলাদেশে নেয়া হয় মোট লেনদেনকৃত টাকার উপর। অর্থাৎ ডাউজোন্স মার্কেটে একজন বিনিয়োগকারী যদি এক হাওলায় ৫ লক্ষ টাকার শেয়ার বিক্রয় করে তবে তার কমিশন আসে ৫ ডলার বা ৩৫০ টাকার মত অথচ বাংলাদেশে এক হাওলায় ৫ লক্ষ টাকার শেয়ার বিক্রয় করলে তার কমিশন লাগবে ২৫০০ টাকা। গত অর্থ বৎসরে পুঁজিবাজারে লেনদেন হওয়া টাকার পরিমাণ ৪০০৯৯১২.৫ মিলিয়ন টাকা। যার শতকরা ০.৫০ টাকা হারে কমিশন বাবদ ব্রোকারেজ হাউজ গুলোর মোট কমিশন আদায় হয়েছে প্রায় দুই হাজার পাঁচ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বৎসরে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি থেকে ২০০৫ কোটি টাকা কমিশন চলে গেছে। আমার জানা মতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো এ টাকার উপর কর প্রদান করে ০.০৫%। অর্থাৎ ব্রোকারেজ হাউজগুলো ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ করলেও তাদের কর এর পরিমাণ অনেক কম। যদিও সরকার ব্রোকারেজ হাউজ থেকে রাজস্ব আদায় ১৩৯ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন (বিডি নিউজ২৪-২৪/০৫/১১) তা কিভাবে এসেছে বিস্তারিত জানা যায়নি। ধরে নেয়া যাক আয় ১৩৯ কোটি টাকা। যদি প্রতি ১০০ টাকা লেনদেন এ ব্রোকারেজ কমিশন ৫০ পয়সার স্থলে ৪০ পয়সা করা হয় এবং প্রতি ১০০ টাকা লেনদেন এ ১০ পয়সা উৎসে কেটে রাজস্ব আদায় করা হতো তবে গত বৎসর এর হিসাবে সরকার রাজস্ব পেত কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা (বিনিয়োগকারীদের নিকট থেকে সরাসরি ৪০০ কোটি এবং ব্রোকারেজ হাউজ থেকে ১০০ কোটি)। এতে বিনিয়োগকারীদের উপর কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই, এবং প্রয়োজনে কোন বিনিয়োগকারী ইচ্ছে করলে টিন নাম্বার(ঐচ্ছিক) নিয়ে তার প্রদান-কৃত কর প্রদর্শন এর সুযোগ পেতে পারত।