ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধে বিশেষ অভিযান শুরু, অভিযাত্রীরা আবার অনেকে নাকি সাদা পোষাকে। বেশ ভাল। যারা এ অভিযান পরিচালনা করছেন তাদের কাছে কোন মাপকাঠি আছে যা দিয়ে তারা বুঝতে পারছেন যে ভাড়া সঠিক, বেশী না কম আদায় করা হচ্ছে? সরকার কোন অংকের মাধ্যমে প্রায় ৩০% ভাড়া বৃদ্ধি করেছে সে প্রসঙ্গে নাই গেলাম। ধরে নিলাম প্রতি কি.মি এ বাসে ভাড়া ১.৫৫ টাকা এবং মিনি বাসে ১.৪৫ টাকা। সম্ভবত একটি গেজেট ও প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি মাপকাঠি আছে তা হল বাসে ঝোলানো একটি চার্ট। এ চার্টটি কে করেছে? বিগত সময় দেখেছি বাস মালিক সমিতি এ চার্টটি তৈরী করলেও বি,আর,টি,এ এর একজন কর্মকর্তার সীল এবং স্বাক্ষর থাকতো। এবার মালিক সমিতি একাই এক’শ। নিজেরাই চার্ট তৈরী করে তা সরকারি বলে চালিয়ে যাচ্ছে (রুট-৩৪ডি)। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই চার্টে যে দুরত্ত্ব উল্লেখ করা হয়েছে তার নির্ভরযোগ্যতা কোথায়? এ সম্পর্কিত গেজেট এবং এক স্টপেজ থেকে অন্য স্টপেজ এর দূরত্ব আমাদেরকে জানানোর কথা ছিল বি,আর,টি,এ এর। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী উনার বি,আর,টি,এ কে কতদুর এগিয়ে নিয়েছেন দেখা যাক।

বি,আর,টি,এ এর ওয়েব সাইটে এ সংস্থাটির ভূমিকায় লিখা আছে,

BRTA is a regulatory body to control manage and ensure discipline in the road transport sector and road safety related areas in Bangladesh.
Activity-Controlling and regulating road transport by executing motor vehicle acts, issuing route permits and fixing rates and fares of buses and trucks

বি,আর,টি,এ এর ওয়েবসাইটে দেখা যায় সর্বশেষ যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে তাতে কোন তারিখ নাই। কম্পিউটারের কল্যানে ধরতে পারলাম বিজ্ঞপ্তিটি ০৯/০৮/০৯ তারিখের। এখানে দেখা যায় ১৩/০৮/২০০৮ তারিখ থেকে প্রথম ১২ মাসে ২৩ টি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও পরবর্তী ২১ মাসে সাম্প্রতিক ভাড়া বৃদ্ধি সহ কোন তথ্য জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি সংশ্লিষ্ট বিভাগটি। এখানে ঢাকা মহানগরীতে চলাচলকারী বাস রুট সম্পর্কিত কোন তথ্য নাই। নগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া কত টাকা হবে তার চেয়ে জরুরী হল কোন বাসের রুট টি কি , কোথায় কোথায় স্টপেজ এবং স্টপেজ থেকে স্টপেজ এর দূরত্ব কত। সরকার নির্ধারিত হারে কার কত ভাড়া হবে তা হিসাব করার মত গনিত জ্ঞান যাত্রীদেরই আছে। আরো মজার ব্যাপার হলো ওয়েব সাইটে কোয়েরি লিখার ব্যবস্থা থাকলেও পোষ্ট করার ব্যবস্থা নাই। আমার প্রশ্ন যদি এ সম্পর্কিত তথ্য বি,আর,টি এর নিকট থাকে তবে প্রকাশ করতে বাধা কোথায় বা কাদের স্বার্থে প্রকাশ করা হয় না? আর যদি নাই থাকে তবে কিসের ভিত্তিতে এতদিন ভাড়া ঠিক করা হলো বা এখনই বা কিভাবে ঠিক করা হচ্ছে? পোষাক পরেই হোক আর সাদা পোষাকেই হোক অভিযান কিভাবে চলছে? নাকি মালিকদের তৈরি করা মনগড়া চার্ট দেখে? এ হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ ও তথ্য অধিকার আইনের প্রায়োগিক দিক।

একটি বানানো গল্প দিয়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করি, বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে গেছে। ৯০ টাকার তেল ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে । জনমনে ক্ষোভ। কি করা যায়? সরকারের একটি দায়িত্ব আছে না। কিছু তো করা চাই। মন্ত্রী মহোদয় সকল ব্যবসায়ীকে ডাকলেন, মিডিয়ার সকলে এলো। মন্ত্রী মহোদয় সকলকে বকাবকি করলেন এবং হুশিয়ার করে দিলেন কেউ যদি তেল ১১০ টাকার বেশী দামে বিক্রয় করেন তবে তাকে শুলে চড়ানো হবে। মিডিয়াতে মন্ত্রীর প্রশংসা এলো। কয়েক ঘন্টার মধ্যে ১০০ টাকার তেল ১১০ টাকায় বিক্রি শুরু হলো। কঠোর হুশিয়ারি বলে কথা-পাবলিক সহ সকলে মেনে চলতে শুরু করল।
পরিশেষে সাম্প্রতিক জ্বালানী তেল এবং ভাড়া বৃদ্ধির পূর্বেই আমি এ ব্লগে কিছু সুপারিশ করেছিলাম। সুপারিশ গুলো পুণরায় এখানে তুলে ধরছি-

০১) বিভিন্ন রুটের স্টপেজ থেকে স্টপেজ এর দুরত্ব বি,আর,টি,এ এর ওয়েব সাইটে অনতিবিলম্বে প্রকাশ করা হোক।

০২) প্রতিটি বাস বে তে নির্দিষ্ট লাইনের বাসের জন্য রাস্তায় মার্ক করে নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা করা হোক।

০৩) প্রতিটি বাসের দরজার পাশে নির্ধারিত স্টপেজগুলোর নাম স্পষ্ট করে লিখার ব্যবস্থা নেয়া হোক যাহতে যেখানে সেখানে বাসটি দাড়িয়ে যাত্রী উঠাতে বা নামাতে না পারে।

০৪) প্রতিটি বাসে চলন্ত অবস্থায় নিদিষ্ট ফি এর বিনিময়ে ফিটনেস ও ক্যটাগরি স্টিকার প্রদান করবে (যেমন নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে এ, বি, সি,) এই ক্যাটাগরি অনুসারে বাসের কি,মি প্রতি ভাড়া নির্ধারিত হবে।সরকার শুধু কি,মি প্রতি ভাড়া ঠিক করবে হিসাব যাত্রীরাই করতে পারবে।স্টিকারটি সামনের কাঁচে লাগানো থাকবে এবং ফিটনেস প্রদানকারী টিমের পরিচিতি ও তারিখ উল্লেখ থাকবে যা যাত্রীরা দেখতে পাবে।এ আয় থেকেই ব্যয় নির্বাহ করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। এ জন্য কোন গণপরিবহণকে বি,আর,টি,এ অফিসে যেতে হবে না (প্রকৃত পক্ষে যায়ও না, ফিটনেস কিভাবে পাওয়া যায় অনেকেই জানেন) এবং কোথাও দাড় করাতে হবে না। সরকার কর্তৃক বিশেষ ধরনের স্টিকার সরবরাহের মাধ্যমে এর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।এ কাজটি অবশ্যই যাত্রীদের উপস্থিতিতে চলন্ত বাসে করতে হবে, অনিয়ম হলে যে কোন যাত্রীর অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

০৫) ট্রাফিক পুলিশ কোন গণপরিবহণ চেক বা চালকের অনিয়মের জন্য বা অন্য কোন কারণে রাস্তায় দাড় করিয়ে রাখতে পারবে না। তাকে বাসে উঠে যাত্রীদের সামনে সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত বিভিন্ন অংকের টিকিটের মাধ্যমে সরাসরি জরিমানা আদায় করবে।জরিমানা না দিলে কেস করতে পারবে।

০৬) যাত্রী ও টিকিট বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় প্রতিটি বে তে একজন পুলিশ মোতায়েন করতে হবে।

০৭) বাসের প্রতিটি সীটের জন্য বর্গমিটারে জায়গা বরাদ্দ থাকতে হবে।যাতে করে ঘিঞ্জি করে অতিরিক্ত সীট বসানো না হয়।

০৮) প্রতিটি টিকিটের গায়ে এবং প্রতিটি কাউন্টারে একটি ব্যানারে বিভিন্ন স্টপেজের দূরত্ব ও ভাড়ার পরিমান লিখতে হবে। টিকিটগুলো স্টপেজ টু স্টপেজ আলাদা হবে (অর্থাৎ আরামবাগ/মতিঝিল/প্রেসক্লাব টু কলাবাগান/শুক্রাবাদ/আসাদগেট হবে না।)

০৯) টিকিট ছাড়া কোন যাত্রী বাসে উঠলে/ অথবা অতিরিক্ত ভ্রমণ করলে তাকে আইনপ্রয়োগকারী ট্রাফিক/পুলিশের হাতে সোপর্দের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং পুলিশের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

১০) গণপরিবহণের সকল কাগজপত্র প্রদানে দুর্নীতি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে/চালক লাইসেন্স প্রদান সহজলভ্য করতে হবে (দিনে দিনে)এবং লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাসিক টার্গেট নির্ধারণ করে দিতে হবে।

১১) ১৫ মিনিট পর পর বাস ছাড়তে সক্ষম এমন পরিবহণ সার্ভিসকে অনুমতি দিতে হবে অর্থাৎ অল্প সংখ্যক বাস নিয়ে কোন সার্ভিস চলতে দেয়া ঠিক নয়।

গণপরিবহণ যত উন্নত হবে রাস্তায় রিক্সা ও প্রাইভেট কারের সংখ্যা কমবে, যানজট কমবে, মালিকরা লাভবান হবেন, এ খাতে অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, সরকারের বড় একটি রাজস্ব আদায়ের ও ব্যবস্থা হতে পারে কারণ অনেক দেশেই এটি একটি বড় রাজস্ব খাত।

সম্ভব হলে দয়া করে আমার পূর্বের লেখাটি আরেকবার পড়ে নিবেন – অন্যায্য বাস ভাড়া বৃদ্ধি দেখার কেউ নেই