ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

গত বর্ষায় আমরা একদল প্রকৃতি প্রেমি গিয়েছিলাম পাহাড়ে । বৃষ্টি আর পাহাড়কে একসাথে উপভোগ করতে । আর তখনই ঠিক হয়ে গেল পরবর্তি গন্তব্য ‘নাফাখুম’ ।জায়গাটা এখনো বেশ দূর্গম, তাই দলের মধ্যে আলাপ করে ঠিক করে ফেললাম বর্ষা কমার পর পরই আমাদের অভিযান হবে ‘নাফাখুম’ এর পথে । Face book এ আমদের গ্রুপ ‘Bangladesh Adventure’ এ এই অভিযানের খবর পোস্ট করে দিল সবুজ আর আনেকেই যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলো । কিন্তু আমদের প্ল্যান ছিল দলটি বেশী বড় না করার এবং দূর্গম এলাকা বলে শুধু সেই সব সদস্যদেরই সুযোগ দেওয়া হবে, যাদের পাহাড়ে অভিযানের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে ।

আমি আর শরিফ শুরু করে দিলাম প্রস্তুতি । দলে একে একে যোগ হলো সবুজ, আবির, নুর, জিমি, সিদ্দিক, সাদিক, মোহ্‌সিন, ফাহিম, আর শেষ সময়ে এক রকম নাছর বান্দা হয়ে রাসেল ও অহন । সকল প্রস্তুতি শেষ করে ১৪ আক্টোবর রাতে ঢাকা ছাড়লাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে । পরদিন সকালে আমাদের বাস বান্দরবান শহরে পৌছালো । পিকআপ ঠিক করাই ছিল । শহর থেকে গাইড মং কে উঠিয়ে রওনা হলাম থানচির পথে । পথে মিলনছড়িতে প্রাতরাশ সারা হলো ।

পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথ ধরে ছুঁটে চলেছে আমাদের গাড়ি । সকলেরই পরিচিত এ পথ । দলের সকলেই কোন না কোন দলে এ পথ ধরেই ছুঁটে গেছে রূমা, বগা লেক, কেওক্রাডং, তাজিংডং, সিপ্পি, রিজুক, থানচি, তিন্দু সহ পাহারের নানা জায়গায় । বান্দরবান শহর থেকে থানচি প্রায় ৮০ কিলোমিটারের পথ । একে একে শৈল প্রপাত, ওয়াই জংশন, চিম্বুক, নীলগিড়ি, জিবন নগর পাহাড়, বলিপাড়া হয়ে আমরা যখন থানচি ঘাটে পৌছালাম তখন সূর্য্য মনি মাথার উপড়ে এসে ভালই তাপ ছড়াচ্ছে । খেয়া নৌকা পাড় হয়ে আমরা থানচি বাজারে উঠলাম গাইড মং এর দিদির পান্থশালায় । সেখানেই দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো মুরগি দিয়ে ভাত আর সাথে সবজি ও ডাল । আমি ও মং এইফাঁকে থানা ও বি, ডি, আর ক্যাম্পে আমাদের নাম ঠিকানা জমা দিয়ে আনুমতি নিলাম । থানচি বাজার থেকে কিছু সদাইও করা হলো । কারন এর পর কোনো বাজার ঘাট পাওয়া যাবে না, হয়তো প্রয়োজনীয় জিনিষ নাও মিলতে পারে।


সূর্য্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে । সব বাক্স প্যাট্রা আর রসদ সহ আমাদের নৌকা ছাড়লাম । দিনের আলো থাকলে চেষ্টা করা হবে রিমাক্রি পর্যন্ত চলে যাওয়া । ভঁট ভঁট আওয়াজ তুলে নৌকা চল্লো শংখের বুকে । দুপাশে পাহাড় সাড়ি, তাড়ি মধ্যে বয়ে চলেছে শংখ । বর্ষা শেষ তবুও নদীর স্রোত প্রচন্ড।

কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে ফেললাম থানচি । ধীরে ধীরে সকলের মোবাইল নেটওয়ার্ক মিলিয়ে গেল । দুপাশের পাহাড় গুলো বড় হয়ে যাচ্ছে। তথা কথিত সভ্যতা আর নগর জীবন থেকে আমরা প্রবেশ করে ফেলছি প্রকৃতির কোলে। সবুজ পাহাড় সারি, মাঝে মাঝে দূরে কোন উপজাতি পাড়া। কোথাও পাহাড়ের গায়ে জুম ঘর। চারিদিকে পাহাড় ঘেড়া এ যেন এক সবুজের রাজ্য। দলের সকলেই যেন একেজন প্রকৃতি সন্তান বনে গেল। কথা কম, শুধু যেন উপভোগের পালা আর স্মৃতির মনে ছবি একে রাখার সাথে ক্যামেরায় ছবি তলার প্রতিযোগিতা।

সন্ধ্যার আগে তিন্দু আর বড় পাথর পার হতে হবে। নৌকার উপজাতি মাঝিকে জিজ্ঞেশ করলাম পারব কি না ? মাঝি অংশুই এর মুচকি হাসি আর মাথা নাড়া দেখেই বুঝলাম সম্ভব হবে না। নদীর কিছু জায়গায় যেখানে সরু হয়ে আছে, সেখানে প্রচন্ড তোরে পানি নামছে, আসে পাশে বড় বড় পাথর। সেরকম ৩ জায়গায় আমদের নামিয়ে দেওয়া হলো আর মাঝিরা কোন ভাবে টেনে ঠেলে নৌকা পার করলো।

আমরা যখন তিন্দুর কাছাকাছি পৌছালাম তখন দিনমণি পাহাড়ের আরালে লুকিয়ে পশ্চিম দিগন্তের কাছাকাছি। নদীতে পাহাড়ের ছায়া, চারদিকে প্রকৃতি যেন উজাড় করে দিচ্ছে বিকালের নরম আলোয়। আমাদের ঊপড় দিয়ে নাম না জানা কিছু পাখি উড়ে গেল, হয়ত ফিরছে দূর পাহাড়ে তাদের বাড়িতে। সবুজ পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে গাড় সবুজ থেকে ছায়ায় রুপান্তরিত হতে লাগল। সন্ধ্যা যেন হঠাত করেই নেমে আসে পাহাড়ে, চারদিকে ফিকে হয়ে এলো, বুঝলাম অন্ধকারের আগে বড় পাথর এলাকাটা পার হওয়া যাবে না। ঠিক হলো তিন্দুতেই নৌকা ভিরানো আর রাত্রি যাপন।

আমরা যখন তিন্দু ঘাটে ভিরলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, পাহারের উপরে শুধু ফিকে আলোর ছটা ছাড়া কোন আলো নেই। সবাই নেমে উঠলাম তিন্দু বাজারে, ছোট একটা বাজার, ১০-১২ টি দোকান আর সাথে লাগোয়া বাড়ি। পাশেই উপজাতিদের পাড়া। এই পাড়াটা মাড়মা উপজাতিদের বাস। এই নির্জন পাহাড় ঘেরা জায়গাটা সত্যি অপূর্ব। চারিদিকে পাহাড় মধ্যে যেন একটুকরো স্বর্গ্য ।

থাকার জন্য আমি আর মং ঘর খোঁজা শুরু করলাম। মং থনচির ছেলে, এই পাড়াতেও ওর জানাচেনা আছে। ঠিক হলো জায়গা। নিচে ছোট একটি দোকান ঘর, উপড়ে থাকার ব্যবস্থা। কাঠের এই ছোট্ট ঘরটিই হয়ে উঠল আমাদের প্রথম রাত্রি যাপনের ‘ফাইভষ্টার হোটেল’ । থাকার জায়গা ঠিক হওয়ার পর সেই সন্ধ্যা আলোতে সবাই গিয়ে নামল নদীতে। পাথুরে জায়গার পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে শংখ আর সবাই যেন দূরন্ত কৈশরে ফিরে গিয়ে ইচ্ছে মত ঝাঁপাঝাপি করল। নদী থেকে যখন সবাই ফিরল তখন চারিদিকে অন্ধকার রাত নেমে গেছে।

রাতের খাবার তৈরী করতে হবে, মুরগি যোগার করে রান্নাও সাড়া হলো । রান্নার ফাঁকে ব্যবস্থা হলো হাল্কা খাওয়া আর চা । রান্নার শেষে সবাইকে খোঁজ করলাম। দেখি সবাই মিলে নদীর ধারে কিছু গাছের গুড়ির উপর বসে যমপেশ আড্ডা হচ্ছে। নদীর স্রোতের কল কল আওয়াজ আর কৃষ্ণ পক্ষের চাঁদ পাহার বেয়ে উঠে এসে এক অদ্ভুদ সর্গীয় পরিবেশ তৈরী করেছে। হাল্কা শরতের মেঘ ভেসে যাচ্ছে, লক্ষ কোটি তারারা প্রদীপ জ্বেলে বসেছে সেই রাতের আকাশে। কেওই উঠতে চাইলো না সেই কাব্যিক পরিবেশ থেকে।

পরদিন খুব ভোরে উঠতে হবে , তাই সকলকে তাড়া দিয়ে ঘুম পাড়ানো হলো। কাকডাকা ভোরেই উঠে খিচুরি খেয়েই রওনা হলাম । প্রায় চল্লিশ মিনিট চলার পরই আমরা পৌছালাম বড় পাথর এলাকায়। জায়গাটার সৌন্দর্য্য কথায় প্রকাশ করা যাবে না। এক কথায় অদ্ভুদ, অসাধারন। নদীর দুপাশে খাড়া উচু পাহাড়, সবুজে ঢেকে আছে , পাহাড় চূড়ায় মেঘেদের ভেলা, নদীর উপড় ছড়ানো ছিটানো অতিকায় সব বড় বড় পাথর, তারি ফাঁক দিয়ে প্রচন্ড স্রোতে বয়ে চলেছে শংখ। নৌকা থেকে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো আর খরস্রোতের মধ্য দিয়ে নৌকা টেনে উঠাতে হলো মাঝিদের, এক পর্যায় দরি বেধে আমরা সকলে নৌকা টেনে পার করলাম সেই পাথুরে জায়গাটা। রিমাক্রি পর্যন্ত এভাবে আরো দু জায়গায় নৌকা টেনেছি।

রিমাক্রি পৌছে চা- বিস্কুট খাওয়ার বিরতি নিয়ে তৈরী হলাম আমাদের আসল গন্তব্য নাফাখুম এর পথে। এবার হাঁটা পথ। রিমাক্রি বাজার থেকে বের হয়েই সুরু হলো পাহারের চড়াই-উতরাই । ২০-২৫ মিনিট হাঁটার পর আমরা নেমে আসলাম রিমাক্রি খালে। বাকি পথ এই খালের গা ঘেষেই যেতে হবে। আধা ঘন্টা পরেই প্রথম বাধা এলো, এবার খাল পআর হতে হবে । বড় ছোট পাথরের উপর দিয়ে প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে নিজেদের ধরা ধরি করে কোমড় সমান পানি পারি দিলাম। কিছুক্ষন হাঁটার পর আবার পার হতে হল রিমাক্রি খাল। এবার পানি বেশী। নিচে বড় বড় বোল্ডার, প্রচন্ড স্রোতে বুক সমান পানি পার হতে হলো। স্রোত এতটাই বেশী যে একটু হাল্কা হলেই ভেসে যেতে হচ্ছিলো। কিচ্ছুক্ষন আবার হাঁটার পর আবার পার হলাম সেই খাল, এইবার পানি এতোটাই বেশী যে সাতার ছাড়া পার হওয়া যাবে না। আমাদের গাইড কয়েকটা বাঁশ কেটে আনলো আর তাতে তৈরী করা হল ভেলা, সে ভেলাতেই একে একে পার হলাম সবাই। আরো ঘনটা খানেক হাঁটার পর আমার শুনতে পেলাম পানির গর্জন, বুঝতে পারলাম আমরা পৌছে গেছি নাফাখুম এর কাছাকাছি । পাহাড়ের কোল বেয়ে একটু হাঁতার পরই আমরা দেখতে পেলাম নাফাখুম ।

দুপাশে পাথুরে পাহাড়ের ঢাল আর তারই মধ্যে দিয়ে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে পানি। আছড়ে পড়া পানি ছিঁটকে তৈরী হচ্ছে পানির ছঁটা। জল প্রপাতটি পাশে ৪৫-৫০ ফুট আর পানি আছড়ে পড়ছে প্রায় ১৫-২০ ফুট নিচে। চারিপাশে সুউচ্চ সবুজ পাহাড়। আশে পাশে কোথাও বসতি নেই। একটানা পানি পরার গর্জন, চারিদিকের সবুজ পরিবেশ। সব মিলিয়েই এক অসাধারন ভাল লাগার পরিবেশ। যে সৌন্দর্য্য কেবলি উপভোগ করা যেতে পারে চোখে দেখে, কোনো ভাষায় হয়ত তা প্রকাশ করা যাবে না।

বেশ কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে আমরা ফিরতি রওনা হলাম রিমাক্রির পথে। রাতে রিমাক্রিওই থেকে গেলাম, পরদিন সকালে ফিরে আসলাম থানচি।। পথে আবার তিন্দুতে থেমে কিছুক্ষন সময় কাটালাম। বিকালে থানচি হয়ে পৌছালাম বান্দরবান…। আর রাতের বাসে রওনা হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে।

পিছোনে পরে রইল প্রকৃতি…।। সকলেই এক রোমাঞ্চকর ভ্রমনের স্মৃতি নিয়ে আর প্রকৃতির কোলে আবার ফিরে আসার প্রত্যয় বুকে ধরে ফিরে আসলাম ঢাকায়।