ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

যথা সময়েই আমাদের বাস ছাড়লো, গন্তব্য রাঙ্গামাটি। ঢাকার আকাশে মেঘের ঘনঘটা টের পেলাম । মধ্য রাতে কুমিল্লা পার হওয়ার পর থেকেই মূষুলধাড়ার বৃষ্টি আমাদের সাথী হলো । ভোরে চট্টগ্রাম পেরুনোর সময় সেই বৃষ্টি যেন আরো তেড়ে আমাদের সঙ্গি হলো । খুব সকালে রাঙ্গামাটি পৌছালাম আকাশ ভরা মেঘ নিয়ে যা অঝরে ঝরে যাচ্ছে। রাঙ্গামাটি পৌছেই বরকল উপজেলায় চলে যাওয়ার প্ল্যান ছিল । স্পীড বোটও ঠিক করাই ছিল । কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য যাত্রা করা গেল না। অজ্ঞতা এক রেস্ট হাউজে ঠাঁই নিয়ে আবহাওয়া ভালোর অপেক্ষা আর এই ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া ছাড়া কোনো কাজ রইল না ।

এই ট্যুরে আমার সাথী প্রায় সকলেই পারিবারিক সদস্য । বৃষ্টি ঝড়া আবহাওয়া তাই তাদের মন ভাল করতে পারল না। কিন্তু মনে মনে আমি খুব খুশি হলাম এই ভেবে যে, যাক এইবার সেই অল্প পরিচিত, অজানা ঝর্নাটা ভাল মত দেখা যাবে । যেই ঝরণা এখনো তেমনভাবে অভিযাত্রিদের পদচারন হয় নাই। কারন গত জুলাই মাসে এসেও ঝর্নার পানি না থাকায় উপভোগ করতে পারি নাই ।

দুপুরের দিকে বৃষ্টি অঝোরধারা থেকে ঝিরিঝিরি রূপ ধারন করল । এই ফাকে আমরা রওনা হলাম বকলের উদ্দ্যেশে । পথে মধ্যে সাক্ষাত করে গেলাম সুবলং এর ছোট ও আসল ঝর্ণার সাথে । আমরা যখন বরকল পৌছালাম তখন বৃষ্টি অনেকটাই কমে গেছে। ঘন সাদা মেঘের ভেলা বরকলের পাহাড় চূড়ায়।

কর্ণফুলি নদীর পাড়েই বরকল উপজেলা সদর ও একটু সামনেই বিজিবি ( সাবেক বিডিআর) এর ব্যাটালিয়ান হেড কোয়ার্টার । বরকল সদর ও বিজিবি ঘাটের উলটো দিকেই নদীর পার থেকেই খাড়া উঠে গেছে এক পাহাড়। স্থানীয় প্রশাসন ওই পাহাড়কে হিল ১০৫০ বলেই জানে। কারন এর উচ্চতা ১০৫০ ফুট । বরকল জায়গাটাও বেশ চমৎকার, দুদিকের সূউচ্চ পাহাড়ের মাঝে দিয়ে বয়ে চলেছে খোরস্রোতা কর্ণফুলী ।

সদর থেকে আরো আঁধা কিলোমিটার যেয়ে ডান দিকের সেই পাহারের ভাঁজ দিয়েই পৌছাতে হলো ঝর্নার শেষ ধাপে । এই ধাপ পর্যন্ত খুব সহজেই যাওয়া গেল । গত দুদিন খুব বৃষ্টি হওয়ায় প্রচন্ড বেগে পানি ঝড়ছে । পাথুড়ে গা বেয়ে উপড়ে উঠা কষ্টকর আর বিপদজনকও বটে। আমাদের সাথে ছিলেন বরকল বিজিবি ব্যাটালিয়ান এর উপ-অধিনায়াক মেজর হান্নান খান। ওনার সহযোগিতায় দড়ি লাগানো হল উপড়ে উঠার জন্য । এবার দড়ি বেয়ে বেশ ভাল করেই উপড়ে উঠা গেল ।

তারপর কিছুটা পাহাড়ের মধ্যে বড় বড় পাথর বেয়ে আরো উপড়ে উঠে পেলাম সেই স্বপ্নের জলপ্রপাত । প্রায় ৮০-৯০ ফুট উপড় থেকে আছড়ে পড়ছে পানি। আমি মুগ্ধ, শুধু মুগ্ধ না, আমি বিমুগ্ধ হলাম এমন একটি সুন্দর প্রপাত দেখে যা এই গহীনে লুকিয়ে আছে। প্রপাতের চার পাশের পরিবেশ সত্যি অসাধারন । সুউচ্চ পাহাড় ঘেরা, জলের ঝঁটা আশেপাশে ছিটকে পড়ছে । রাঙ্গামাটির সুবলং ঝর্ণার চেয়েও সুন্দর বলবো আমি । অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছে । সুধু তাই নয় আমি নির্দিধায় এবং নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি আমার দেখা রুমার রিজুক, বাকলাই, জাদিপাই আর রাঙ্গামাটির সুবলং ঝর্ণা অথবা শ্রীমঙ্গলের মাধবকুন্ড বা হামহাম কিংবা খাগড়াছড়ির রিসং ও তদই ছড়া ঝর্নার চেয়ে এই অজানা জলপ্রপাতের সুন্দর্য্যো কোনো অংশে কম নয়। কারন এটা জলপ্রপাত ও ঝর্ণা একসাথে একই ধারায় বইছে।

এই ঝর্ণা বা প্রপাতের সবচেয়ে সুন্দর্য্যো হল যে, এটার প্রথম বড় ধাপের পর জল গরিয়ে আরো চারটা ছোট ছোট ধাপে পানি পড়ছে, যা তৈরী করেছে চারটি ছোট প্রপাত । সব শেষে পানি গিয়ে মিশেছে কর্ণফুলী নদীতে । কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে নেমে আসলাম সেই শেষ ধাপে, যেখানে আমার দলের সবাইকে রেখে গিয়েছিলাম ।

আমি এই জলপ্রপাতটার স্থানীয় নাম খোঁজার চেষ্টা করলাম । সবাই সাধারন ভাবে এটাকে বরকল ঝর্না বলেই জানে । আমি মনে মনে একটা সুন্দর নাম দেওয়ার কথা ভাবলাম । সাথে থাকা বরকল বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর হান্নান খান জানালেন কিছুদিন আগে উনাদের উর্ধতন কয়েকজন কর্মকর্তা এই ঝর্না পরিদর্শন করেছেন, তখনই উনাদের ব্যাটালিয়ান জোয়ানরা ঝোঁপ ঝাঁর পরিস্কার ও পাথর কেঁটে যাতায়াতের বায়বস্থা করেছেন। তাই উনিও একটা নাম দেওয়ার পক্ষে । বিজিবি বাংলাদেশের সীমান্ত প্রহরি । তাই সীমান্ত প্রহরি বিজিবি সদস্যদের প্রতি সন্মান সরূপ আমি মেজর খান কে প্রস্তাব করলাম এটার নাম “সীমান্ত প্রপাত” রাখতে । ধন্যবাদ জানালাম মেজর হান্নান খান কে তার সহযোগিতার জন্য।

নুতন এক অসাধারন জলপ্রপাত ও ঝর্নার সাক্ষাত করে আমরা ফিরলাম রাঙ্গামাটির সদরের পথে । আর আমার মনে এঁকে রইল নুতন দেখা সেই “সীমান্ত-প্রপাত” এর এক সুন্দর ছবি ।

কিভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি সরাসরি বাসে। রাঙ্গামাটি সদর থেকে বরকল যেতে হবে ইঞ্জিন নৌকায়। সময় লাগবে প্রায় ৩ ঘন্টার মত। যাওয়ার পথে সুবলং ঝর্না দেখে যেতে পারেন। যেহেতু বরকল এ কোনো থাকার জায়গা নেই, তাই খুব সকালে রাঙ্গামাটি থেকে রওনা দিয়ে দিনে দিনে ফেরত আসতে হবে।

সতর্কতা:
যেহেতু বরকল রাঙ্গামাটি থেকে প্রায় ৩৫-৪০ কিঃমিঃ দূরে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমস্যা আছে , তাই সেনা বা বিজিবির অনুমতি নিয়ে যাওয়া ভাল । অবশ্যই বরকল পৌছে বিজিবি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিবেন, তা না হলে সমস্যায় পড়তে পারেন।