ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

বর্ষা বাংলার এমন এক ঋতু, যখন প্রকৃতি নিজেকে সাঁজায় নুতন রূপে । বর্ষার সেই প্রচলিত জলে ভরা নদী, হাওর, বিল থেকে একটু ভিন্নতা পাওয়া যায় পাহাড়ে । আর তাই আমাদের ভ্রমণ সংস্থা থেকে আমরা প্রতি বছর আয়োজন করে থাকি “রেইন অ্যান্ড হিল” । যথারিতি এইবারও সব আয়োজন শেষ করে আমরা বিভিন্ন বয়সের ২০ জনের একদল বাউন্ডেলে রওনা হলাম বান্দরবান এর পথে ।
রাতে বাস ছাড়ল ঢাকা থেকে । খুব সকালে বান্দরবান পৌছে চলে গেলাম আমাদের অস্থায়ি আস্তানা মিলনছড়িতে ।

 

আস্তানায় পৌছে কিছুটা ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা সেরে সবাই ব্যাস্ত হয়ে গেল আড্ডায় । পরিকল্পনা মত একটু আগেই দুপুরের খাবার সেরে ফেলা হলো । দুপুরের সুর্য্য পশ্চিমে হেলতেই আমরা বেড়িয়ে পরলাম । গন্তব্য হাঁটা পথে টাইগার হিলের উপরে নীলাচল । ঘোর বর্ষা, তবুও আমরা বৃষ্টির কোন দেখা পেলাম না এখনো । কিন্তু আকাশে মেঘের আনাগোনা চলছিল । নীলাচলের উপরে উঠে চারিদিকের পাহাড় সারি আর মাঝে মাঝে দূর দিগন্তে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হতে দেখলাম, বুঝলাম সেই দূরের বৃষ্টি যেকোন সময় অঝর ধারায় ঝরবে আমাদের উপড় । পশ্চিমের আকাশ বেশ পরিস্কার, উত্তরে দূরে নীচে বান্দরবান শহরকে খেলনা মনে হচ্ছে, পাহাড়ের ঠিক খাড়া নিচে এক আদিবাসি গ্রাম । দক্ষিনে চিম্বুক রেঞ্জ এর কালচে পাহাড় দেখা যাচ্ছে । চারিদিকে সব পাহাড় যেন কোন শিল্পি সবুজ রঙ ঢেলে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে। নীলাচলের উপর থেকে চারিদিকের পাহাড় উপভোগ করতে করতে খেয়াল করলাম দক্ষিনের চিম্বুক পাহাড়ে মেঘ থেকে মূষল ধারে বৃষ্টি ঝড়ছে । বৃষ্টির তোড়ে চিম্বুক পাহাড় ধেকে গেল আর সেই মঘের ভেলা ভেঁসে আসছে আমাদের দিকে । এক পাহাড়ের চূড়া থেকে অন্য পাহাড়ের চূড়ায় বৃষ্টি ঝড়তে দেখা যে কত সুন্দর হতে পারে তা না দেখলে ভাষা দিয়ে প্রকাষ করা যাবে না।

 

ধেয়ে আসছে বৃষ্টি । সকলকেই দেখলাম সুধু ক্যামেরা, মোবাইল ফোন আর দরকারি জিনিস রক্ষা করার ব্যাবস্থা নিয়ে সেই মূষল ধারার বৃষ্টিকে স্বাগতইজানাতে প্রস্তুত । কিছুক্ষনের মধ্যে সেই বৃষ্টি আমাদের ভিজিয়ে চারদিক অন্ধকার করে দিল । হারিয়ে গেল দিগন্ত, দূরের পাহাড় । সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমারা নামতে সুরু করলাম নীচে, গন্তব্য পাহাড় নিচের সেই আদিবাসি গ্রাম। পিচ্ছিল কাঁদা মাখা পথে নামতে যেয়ে আনেকেই আছার খেল। গায়ে কাদা মেখে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে আমরা যখন ত্রিপুরা আদিবাস গ্রামে পৌছালাম তখন বৃষ্টির তোড় অনেকটাই কমে গেছে। সকলেই কাক ভেজা । আমরা কিছুটা সময় কাটিয়ে অন্য এক হাঁটা পথে । এই পথটা বেশ চমৎকার । দুদিকে পাহাড় আর তার মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে একটি ঝিড়ি, পাথর ছড়ানো । কিছুটা পাহাড় বেয়ে সেই ঝিড়ির হাঁটু জলে হেঁটে আমারা যখন শহরের এক প্রান্তে চলে আসলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমাদের গাড়ি আসার ফাঁকে এক ছোট চা-র দোকানে সবাই মিলে বেশ আনেক গুলো পুরি, বিস্কুট, লুচি সাবার করে চা খেয়ে একটু চাঙ্গা হয়ে নিলাম। সকলেরই কাপড় ভেজা, পরে না অসুখ বাধে, তাই সকলকে তারা দিয়ে ফিরলাম আমাদের অস্থায়ী ডেড়া মিলনছড়িতে ।

 

রাতের খাওয়া সেরে চললো আড্ডা । সুরে বেসুরে গান আর গল্প করে মধ্য রাতে ভাংল আড্ডা । পরদিন ভোর ৫টায় উঠতে হবে, জানিয়ে দেওয়া হল সবাইকে। উদ্দেশ্য নীলগিড়ি থেকে মেঘের ভেলাদের সাথে আলিঙ্গন। বর্ষায় পাহাড়ে রাতের তাপমাত্রা কমে যায় আর খুব সকালে তাই মেঘ চলে আসে নীচে। পাহাড় চূড়ায় মেঘ দেখার সবচেয়ে ভাল সময় তাই খুব ভোরে ।

 

সকলেই হাজির ভোর ৫টার মধ্যেই । গাড়িও ঠিক করাই ছিল। রওনা হলাম নীলঅগিড়ির পথে। সূর্য্য তখন উকি দেয়নি। পুব আকাশের আলোর আভায় কুয়াশার মত মেঘ গুলোতে যেন লাল রঙ্গে রঙ্গিন হতে লাগল, ক্ষনে ক্ষনে বদলাতে থাকল রং । কোথাও লালচে, কোথাও হালকা বেগুনি । চারিদিকে ভেজা সতেজ এক নির্মল পরিবেশ। আমাদের গাড়ি চলতে লাগল পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথ ধরে । অনেক আদিবাসিই নেমে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে তাদের জীবন সংগ্রামে, জুম চাষে। ভোরের সেই আলোতে পাহাড়ের গা বেয়ে ভেসে যাচ্ছে মেঘের ভেলা । চিম্বুক আর্মি ক্যাম্পের ক্যান্টিনে কয়েক মিনিটের বিরতি দিয়ে হাল্কা প্রাতরাস সেরে নিলাম।

 

আমরা যখন নীলগিড়ি পৌছালাম তখন সূর্য্যমনি দূরের পূবে পাহাড় ফূড়ে আলো ছড়াচ্ছে । চারিদিকে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় মেঘেদের ভেলা ভেসে বেরাচ্ছে। মেঘ গুলো যেন এক পাহাড় চূড়া থেকে অন্য চূড়ায় ছুঁইয়ে যাচ্ছে । সবার ক্যামেরায় সুধু ক্লিক ক্লিক শব্দ সেই অপার্থিব সৌন্দর্য্য ধরে রাখার চেষ্টায় । না না আকৃতির মেঘের ভেলা ভেসে যেতে লাগল আমাদের চারপাশে । কখনো কখনো কোন এক মেঘের ভেলা ভেসে এসে আমাদের চারিদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে দিল । নীচে ছোট ছোট পাহাড় গুলোদের ঢেকে দিচ্ছিল সেই মেঘেদের ভেলা । মেঘের ফাঁক গলে আসা রোদ্দুর পাহাড়ের গায়ে নানা রঙের সবুজ এঁকে দিচ্ছিল । সাদা মেঘের পটভুমিতে ঝাক ধরে পাখিদের উড়ে যাওয়া দৃশ্য সত্যি এক অপ্রকাশ্য অনুভুতি জাগিয়ে তুলেছিল আমাদের সকলের মনে । বেশ অনেক্ষন কাটালাম পাহাড় চুড়ায় ।

 

ঠিক করলাম বৃষ্টি না হলে নীলগিড়ির নীচেই এক মুরং পাড়ায় নিয়ে যাবো সবাইকে, তাই একটু তাড়া দিলাম । বান্দরবান ফেরার পথে পাহাড়ের নীচে মুরং আদিবাসিদের গ্রাম কাপ্রু পাড়ায় ঘুড়ে আসলাম ।
দুপুরের আগেই আমরা পৌছালাম বান্দরবান । আগেই দুপুরের খাওয়া সেরে সবাই বেড়িয়ে পড়লাম বালাঘাটায় স্বর্ন মন্দির দেখতে। সন্ধায় শহর ঘুরে রাতের খাওয়া খেয়ে আমার তৈরী হলাম ঢাকার ফিরতি বাস ধরতে ।

পাহাড় চূড়া থেকে অন্য পাহাড়ে বৃষ্টি দেখা, ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে পাহাড়ের পচ্ছিল পথে আদিবাসি গ্রাম ঘুড়ে দেখা, পাহার চূড়ায় মেঘেদের ভেলার আনাগোনা । প্রকৃতির যৌবন হয় সেঁজে উঠা । এই সব কিছুই আমার দেখে সেই অনুভুতি সঙ্গে করে ফিরে আসলাম ব্যাস্ত জীবনে ।