ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

বাংলাদেশে ড. ইউনুস এবং মায়ানমারে অং সান সূচী শান্তিতে ভুমিকা রাখার জন্য নোবেল শান্তি পূরষ্কার অর্জন করেছেন। পাশাপাশি দুই দেশের দুইজন ব্যক্তি আলাদা আলাদা ইস্যূতে কাজ করে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের, দুজনেরই দেশ এক অভিন্ন সমস্যা নিয়ে যুগের পর যুগ ভুগছে আর তা হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা।

এই দুই শান্তি পূরষ্কার বিজয়ী পূরষ্কার পেয়েছেন তাদের যথাযথ অবদানের কারনে। ইউনুস পেয়েছেন, দরিদ্র বিমোচন করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আর সূচি পেয়েছেন তার দেশে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নজির বিহীন ত্যাগ স্বীকার করে। আমরা সম্মান জানাচ্ছি দুই জনের নোবেলকে।

কিন্তু এই দুই বিজয়ীর দেশে রোহিঙ্গা নামক মানুষদের একটি প্রজাতি(!) আছে যারা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত বলে স্বীকৃত। তাদের ভোটের অধিকার নেই, তাদের কথা বলার অধিকার নেই। তাদেরকে রাষ্ট্রিয় ভাবে “কালার” বলে গালি দেয়া হয়। দুই যুগ ধরে অনেক রোহিঙ্গা বসবাস করছে শরনার্থী হিসেবে বাংলাদেশের কক্সবাজার এবং বান্দরবানে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে সূচীর দেশ মায়ানমারের বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের উপর করছেনা এমন কোন নির্যাতন নেই। রোহিঙ্গাদের উপর যে নির্যাতন হচ্ছে তা ফিলিস্তিনিদের উপর চালানো নির্যাতনকেও হার মানায়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের বুকেই রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি বিক্ষিপ্ত ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী।

কিন্তু নিজ নিজ দেশে এই রকম একটি বিপদাপন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং বিপন্ন মানবতা থাকার পরও ড. ইউনুস আর অং সান সূচী নোবেল শান্তি পূরষ্কার বিজয়ী। তাদের শান্তি পূরষ্কার বিজয়ে কোন পরিবর্তন হয়নি রোহিঙ্গাদের ভাগ্যের। সূচী নোবেল পেয়েছেন ১৯৯১ সালে আর ড. ইউনুস পেয়েছেন ২০০৬ সালে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এতদিনেও তারা রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে একটি কথাও বলেননি।

১৯৯১ সালে নোবেল পাওয়ার পর থেকে সূচী গৃহবন্দি । তাই এত দিন এই সমস্যা নিয়ে তার কথা বলার সুযোগ বলতে গেলে ছিল না। কিন্তু বন্দি হওয়ার আগেও রোহিঙ্গারা বর্তমানের মত একই সমস্যায় ছিলো। তখনও কিন্তু সূচী কথা বলেননি। এখন সূচী মুক্ত, বিরোধী দলে থাকলেও সূচিকে মায়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব বলে ধরে নেয়া হয়।

গত ১৫দিন ধরে মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর চলামান সহিংসতার প্রেক্ষিতে সূচীকে তেমন জোরালে ভূমিকা নিতে আমরা দেখেনি। ৩ জুন তাবলীগ জামাতের দশজন কর্মীকে বৌদ্ধরা কুপিয়ে হত্যা করার পর সেখানকার মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতারা সূচীর সাথে দেখা করলে তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়েছেন, এই পর্যন্তই । এর চেয়ে বেশি ভূমিকা তিনি রাখেননি।

তবে সূচির এই আহবানে কর্ণপাত করেনি সেখানকার দাঙ্গাবাজরা। এরপরও সেখানে সহিংসতা হয়েছে। চরম নির্যাতন করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের উপর। এতসব কিছু রেখে নোবেল বিজয়ী সূচী ইউরোপ গেছেন যাকে ইতোমধ্যে ঐতিহাসিক সফর হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এই সময় তিনি নোবেল পূরষ্কার ও গ্রহন করবেন। যেটা তিনি বন্দি থাকার কারনে এত দিন গ্রহন করতে পারেননি।

২০০৬ সালে নোবেল পেয়ে ড. ইউনুস নতুন করে আলোচনায়। বর্তমান সরকার এসে গ্রামীন ব্যাংক থেকে তাকে বের করে না দেয়া পর্যন্ত তিনি ছিলেন নায়কের মত। বাংলাদেশের মানুষদের দরিদ্রতাকে জাদুঘরে পাঠানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তার বাড়ীর পাশের রোহিঙ্গাদের দু:খ দুর্দশা নিয়ে তাকে কখনো কথা বলতে শুনিনি।

রোহিঙ্গাদের সাথে সংস্কৃতিগত দিক থেকে অনেক মিল চট্টগ্রামের মানুষদের। তাই তারা নিজদেশে টিকতে না পেরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে সহজে মিশে যেতে পারছে চট্টগ্রামের লোক সমাজে। এভাবে গত কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে মিশে গেছে চট্টগ্রামে।

রোহিঙ্গাদের এই পরিস্থিতি ড. ইউনুসের অজানা নয়। চট্টগ্রামের ভাষা আর রোহিঙ্গাদের ভাষা প্রায় একই হওয়াতে বলা যায় রোহিঙ্গারা যে ভাষায় কথা বলেন ড. ইউনুসও কথা বলেন সেই ভাষায়। অথচ সারা পৃথিবীর দরিদ্র মানুষদের নিয়ে যিনি কথা বলেন তিনি তার বাড়ীর পাশের লোকজনের দুর্দশা নিয়ে টুঁ শব্দটিও করছেন না এটা গ্রহনযোগ্য নয়।

নোবেল পুরস্কার যেমন একটি অর্জন তেমনি এটা দায়িত্বও বটে। সূচী আর ইউনুস এই পূরষ্কার পেয়ে অনেক কিছুর উর্ধ্বে উঠেছেন সত্যি কিন্তু নিজের বাড়ীতে নিজের দেশে নিগৃহীত নিপীড়িত মানুষদের নিয়ে কথা বলবেন না, কাজ করবেননা এটা হয়না। আমরা আপনাদের দেশের মানুষরা, প্রতিবেশীরা এটা মেনে নেবো না। সুতরাং রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করে আপনাদের এই পূরষ্কারের যথার্থতা প্রমান করুন।