ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

সেদিন ঝড় বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে টেলিফোনে কথা বলছিলাম চট্টগ্রামের বিভাগীয় প্রশাসনে শীর্ষ এক ব্যক্তির সাথে। গণমাধ্যম এবং জাতীয় সংসদে এই দুর্যোগে যথাসময়ে ত্রান কার্যক্রম শুরু করতে না পারায় প্রশাসনকে তুলোধুনো করায় ক্ষোভ ঝারছিলেন এই কর্তা ব্যক্তি। প্রায় ১০ মিনিট ক্ষোভ প্রকাশের পর তিনি বললেন কিছুই হবেনা এই দেশে। প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার আশায় কর্তা ব্যক্তিটির কথায় এতক্ষন কোন তেমন সাড়া না দিলেও এখন আর চুপ থাকতে পারলামনা। বললাম ভাই আমি কিন্তু দেশটাকে নিয়ে অনেক আশাবাদি।

এই আশাবাদের কারন হিসেবে বললাম, এতটুকু একটা দেশে এত বিশাল সংখ্যক মানুষ, আমরা আর কিছুই করতে না পারি খেয়ে পড়ে বেচে বর্তে যে আছি এটাই বা কম কিসে? পৃথীবির সবচেয়ে বেশি ঘনত্বের দেশ বাংলাদেশে যে ১৫০ মিলিয়ন মানুষের খাওয়া পড়ার নূনঃতম একটা ব্যবস্থা হচ্ছে(অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে) এটাইতো অনেক বড় অর্জন। অন্তত আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশের মানুষের তুলনায় আমরা ভালো আছি। এরপর বেচারার এতক্ষন ধরে দেখানো হতাশা কেটেছে কিনা বুঝতে পারলাম না, তবে তিনি আর এই নিয়ে আমার সাথে কথা বলেননি।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি রক্ত দিয়ে মুখের ভাষা আদায় করা জাতি হিসেবে আমাদের দিয়ে অনেক কিছু সম্ভব। আর বাস্তবতা হলো এই সম্ভবটাকে আমরা ঠিক সম্ভব করতে পারেনি। পারিনি কারন, আমাদের সর্বগ্রাসী দূর্নীতি এবং সর্বনাশা দ্বিধা বিভক্তি। শুধু পদ্মা সেতু নয় আরো অনেক বড় কিছু এতদিনে হয়ে যেত যদি আমরা দুর্র্নীতিমুক্ত স্থিতিশীল একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে পাতাম।

যা হোক, যা পায়নি তা নিয়ে হাপিত্যেশ করলে চলবে কেন? এগিয়ে যাওয়ারতো কোন বিকল্প নেই। আর এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রক্রিয়া হবে পুরো জাতিকে আস্থাশীল এবং ঐক্যবদ্ধ করা। জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকলে শুধু একটি পদ্মা সেতু নয়, সম্ভব হবে আরো অনেকবেশি কিছু ।

কিন্তু কিভাবে….
গত দুই বছরে কত টাকা শেয়ার বাজার থেকে লুট হয়েছে? কেউ বলেন ৮০ হাজার কোটি টাকা, কেউবা আরো কম বেশি বলে থাকেন। আর পদ্মা সেতু নির্মাণে তো লাগছে মাত্র দশ হাজার কোটি টাকা। যে দেশের পূজিবাজার ৮০ হাজার কোটি টাকা মুলধন হারিয়েও এখনো ঘুরে দাড়ানোর স্বপ্নে বিভোর সেদেশের অর্থনীতির জন্য দশ হাজার কোটি টাকা কোন ব্যাপার নয়।
পুজিবাজার ছাড়াও আছে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী। যারা চাইলে পদ্মা সেতুর টাকা একত্রিত করা সম্ভব। এই ছাড়াও আছে দেশের উঠতি পুজিপতিদের বিশাল একটি গ্র“প। যাদের পক্ষেও পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ সম্ভব ।

এইসব ছাড়া আছে আরো একটি উপায় । বর্তমানে আমরা ১৫কোটির বেশি মানুষ বাস করছি বাংলাদেশে। আরো প্রায় সত্তর লাখ আছে দেশের বাহিরে। এরমধ্যে দরিদ্রসীমার নীচে আছে প্রায় অর্ধেক মানুষ। অপর অর্ধেক মানুষ আছি যারা মোটামুটি স্বাবলম্বী। দরিদ্রসীমার উপরে জীবনমানে থাকা মানুষের মধ্যে আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ আছে যারা সরাসরি আয় রোজগার করছে। মোটামুটি মানের রোজাগারে থাকা মানূষরা যদি মাসে ৫০টাকা করেও কোন একটি উদ্দেশ্যে জমা করি তাহলে মাসে ১৫০ কোটি টাকা জমা হবে। এই হিসেবে সাত বছরে জমা হবে দশ হাজার কোটি টাকার বেশি । যা দিয়ে একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব(এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতুর আনুমানিক ব্যয় দশহাজার কোটি টাকা)।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে….
দেশের বিপুল এই জনগোষ্টিকে সংগঠিত করবে কে? আমাদের সরকার বা প্রশাসনের পে কি এইভাবে দেশের মানূষকে সংগঠিত করে অর্থ যোগাড় করা সম্ভব ? দেশের মানুষ কি এদের বিশ্বাস করে নিজদের কষ্টার্জিত টাকা জমা দিবে? এক কথায় উত্তর আসবে “না”। কারন এই সরকার ও প্রশাসনের সামনে দিয়ে শেয়ার বাজার থেকে লুট হয়ে গেছে সাধারন মানুষের তিল তিল করে কামানো টাকা। এই লুটেরাদের সাথে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের যোগ সাজসের অভিযোগ আছে। এই প্রসাশনের প্রতি আরো অভিযোগ আছে , সর্বগ্রাসী লুটপাট আর দূর্নীতির।

মাঠে ময়দানে আমাদের বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনলে বুঝা যায় ছোট্ট এই দেশটিতে কিভাবে লুটপাট হয়েছে এবং হচ্ছে। এই দুইজনতো এখন শুধূ পরস্পরের দুর্নীতির ফিরিস্তিই তুলে ধরছেন দেশবাসীর সামনে। দেশে দুর্নীতি কমে গেলে হয়তো এই দুইজন আর দুর্নীতির কথা তুলবেনা। আর তখনি জনগন বুঝবে দেশে দুর্নীতি কমে গেছে। এইভাবেই আসলেও আসতে পারে জনগনের আস্থা । তখন শুধু পদ্মা সেতু নয়, আরো অনেক কিছুর জন্য অনেক বেশি টাকা জোগান দিতে পারবে এই জনগনই।

তবে ক্ষমা নেই আবুল- বাবুলদের…….

শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু থেকে বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন বাতিল করায় জাতিয় স্বার্থের বিবেচনায় আমিতো মনে করি ভালোই হয়েছে। বিশ্ব মোড়লদের হাতিয়ার বিশ্ব ব্যাংকদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার নানা ধরনের নাটকের অবতারনা করে আমাদের মত গরীব দেশগুলোকে নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে। এই খেলার ফাকে সম্রাজ্যবাদীরা নানা উদ্দেশ্য আমাদের দিয়ে বাস্তবায়ন করে নেয়। বিশ্বব্যাংক নিজ থেকে পদ্মা সেতুর অথৗয়নে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশকে এক প্রকার নিজদের জাল থেকে বের করে দেওয়া। এটা হয়তো আরো বড় কোন ষড়যন্ত্র হতে পারে। আর জলঘোলা বলি আর নাটক বলি , আবুল বাবুলদের র্কীতি কালাপের কারনেই কিন্তু এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

গত এক বছর ধরে এই পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে বিশ্বব্যাংকের মত সমান দায়ি আমাদের আবুল বাবুলরাও। বিশ্ব ব্যাংকের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। যার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ, সেই সেতু মন্ত্রী আবুল হোসেন এখনো নিজকে নির্দোষ প্রমান করতে পারেনি। আর বিশ্বব্যাংকও তার উত্থাপিত অভিযোগ প্রমান করতে পারেনি। কিন্তু ইতোমধ্যে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। তিল তিল করে নির্মাণ করা আমাদের মান মর্যাদা অনেকটা ধুলোয় মিশে গেছে। তাই ক্ষমা নেই এসব আবুল বাবুল আর বিশ্ব মোড়লদের।