ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

১৮জুলাই,২০১২ বুধবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মনজুর আলম ও ৫৫জন কাউন্সিলরের দুই বৎসর ফুর্তি অনুষ্ঠানে যা হয়ে গেল তা এক কথায় ব্যতিক্রম এবং অভূতপূর্ব। যা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন সংযোজন। এই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন বর্তমান মেয়র মনজুর আলমকে। যা অবশ্যই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক বিরল ঘটনা।

২০১০ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনজুর আলম ১৭ বছরের ক্ষমতাসীন মেয়র এবং চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি দোর্দান্ড প্রতাপশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করেন। যা তখন চট্টগ্রামেতো বটেই সারা দেশেরই আলোচিত ঘটনা।

মনজুর আলম ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনৈতিক শিষ্য। ১৭ বছর মেয়র থাকা কালে করপোরেশন পরিচালনায় মহিউদ্দিন চৌধুরীর সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তখনকার ওয়ার্ড কমিশনার মনজুর আলম।

মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে সেই মনজুর আলম তার রাজনৈতিক ঠিকানা পরিবর্তন করে আওয়ামীলীগ থেকে ভিড়ে গিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে। স্বাভাবিকভাবে এক সময়ের গুরু শিষ্য মহিউদ্দিন- মনজুর প্রতিনিধি হয়ে যান আওয়ামীলীগ- বিএনপির মত দুই বিপরীত ধারার।

২০১০ সালে নির্বাচনে গুরু শিষ্যের নির্বাচনী লড়ায়ের প্রচারনায় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিদ্যমান কাদা ছোড়াছোড়িসহ সবগুলো দিকই বিদ্যমান ছিলো। সেই সময়কার এই নির্বাচনী বৈরীতার উত্তাপ আরো বৃদ্ধি পেয়েছিলো যখন মনজুর বিজয়কে চ্যালেঞ্জ করে মহিউদ্দিন চৌধুরী আদালতে মামলা করায়।

দুই বছরের কার্যকালে মনজুর আলম চেষ্টা করেছেন সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে পরিবর্তন নিয়ে আসতে। করপোরেশন পরিচালনায় মহিউদ্দিন চৌধুরীর চালু করা বিভিন্ন নিয়ম আমূল পরিবর্তন করে ফেলেন মনজুর। তাতে এই ধারনা তৈরি হয়েছে মহি উদ্দিন চৌধুরীর যে কায়দায় করপোরেশন পরিচালনা করতেন তা যথাযথ ছিলোনা।

এরমধ্যে মনজুর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিষ্টিটিউটের সূধী সমাবেশে স্বশরীরে এসে মেয়র মনজুর আলমকে অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন তার এক সময়কার গুরু এবং মেয়র পদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মহিউদ্দিন চৌধুরী। মনজুর আলমকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি মহিউদ্দিন চৌধুরী সাহাস এবং কিছু পরামর্শও দিয়ে গেলেন একজন সত্যিকারের শুভাকাংক্ষীর মত। এবং আশ্বাস দিয়ে গেলেন চট্টগ্রামের স্বার্থে সবরকম সহায়তার।

প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতার দূর্ভোগ এখন চট্টগ্রামবাসীর নিত্যসঙ্গী। এই দূর্ভোগের কোথায় গিয়ে পৌছাবে তা নিয়েও আছে চরম অনিশ্চয়তা। এরমধ্যে সাবেক এবং বর্তমান মেয়রের একসাথে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করায় চট্টগ্রামবাসী কিছুটা হলেও আশান্বিত হয়েছে।

মনজুর অনুষ্ঠানে এসে মহিউদ্দিন চৌধুরীর এই বদান্যতা এখন চট্টগ্রামে টক অব দ্যা সিটি। প্রচলিত ধারার বিপীরিতে প্রতিপক্ষ দলের মেয়রের পাশে দাড়িয়ে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।

চট্টগ্রামের একজন বাসিন্দা হিসেবে আমি এখন অনেক বেশি আশ্বন্বিত যে, ভবিষ্যতে এই দুই জনের মধ্যে পরস্পরকে কোনঠাসা করার নিরন্তর চেষ্টা থাকবেনা । চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে মনজুর পাশে থাকবেন মহিউদ্দিন চৌধুরী ।

এই ঘটনায় প্রমান হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু না ভেবে বন্ধুতে পরিনত করার কারিশমা দেখিয়েছেন মনজুর আর এক সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে বন্ধুতের হাত বাড়িয়ে নিজকে একজন উদারতার পথিকৃৎ প্রমান করলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। চট্টগ্রামের দুই নেতার এই ভূমিকায় চট্টগ্রামবাসী হিসেবে আমি গর্বিত।

তবে মনজুর – মহিউদ্দিন এক হলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা আছেন তাদের ভূমিকার কিন্তু কোন পরিবর্তন নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একজন মেয়রকে বলতে গেলে কোন সহযোগীতা করছেনা সরকার । গতকালের অনুষ্ঠানে এই বিষয়টি মনজরু যেমন বলেছেন তেমনি মহিউদ্দিন চৌধুরীও তা স্বীকার করেছেন।

আমাদের জাতীয় রাজনীতির ধারক বাহাকরা চট্টগ্রামের মনজুর এবং মহিউদ্দিনের এই দৃষ্টান্ত অনুসরন করলে রেহায় পেত দেশবাসী। আমরা আশা করছি, আমাদের জাতীয় পর্যায়ের নেতা নেত্রীরা দেশের স্বার্র্থে মনজুর মত বিচক্ষনতা আর মহিউদ্দিন চৌধুরীরমত উদারতার পরিচয় দেবেন।

যে কোন কিছুতে চট্টগ্রাম সব সময় এগিয়ে থাকে স্থানীয়ভাবে এমন একটি বিষয় চালু আছে। প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এক হয়ে তা আবারো প্রমান করলেন।