ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 


আমাদের চট্টগ্রামে বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের অন্যতম একটি প্রিয় খাদ্য হচ্ছে লইট্টা মাছ। অসুখ অথবা অন্য কোন কারনে কেউ ভাত খেতে না পারলে লইট্টা মাছ দিয়ে রোগীর খাওয়ার রান্না করা হয়।

আমারা মা বাজারে তালিকায় আবশ্যিক হিসেবে লইট্টা মাছের নাম সবার প্রথমে লিখবেন। মা যখন মাঝে মাঝে অসুখে পড়ে একবারেই খেতে পারেন না তখন বলেন, ’লইট্টা মাছ হলে তাও কিছু ভাত খেতে পারতাম’। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি এই অবস্থা। আমি যখন মাঝে মাঝে বাজারে যায় তখন লইট্টা মাছ কিনবোই। কিন্তু এখন আর প্রিয় এই মাছটি বাজার থেকে আনা হয়না। আর মা মনের মাধুরী মিশিয়ে বাসায় আর লইট্টা মাছ রান্না করেন না।

গত তিন মাসে চট্টগ্রামের ভ্রাম্যমান আদালত যে কয়টি অভিযান চালিয়ে লইট্টা মাছ পরীক্ষা করেছে সব গুলোতে ফরমালিন পেয়েছে। শুধু লইট্টা মাছ কেন? বাজারে মাছ মাংস এমনি কি আছে যেখানে ফরমালিন নেই। তাই বাজারে গেলে কোন কিছু কেনার আগে শতবার , হাজারবার করে নিশ্চিত হতে চেষ্টা করি সেটি ফরমালিন মুক্ত কিনা। কিন্তু এমন প্রায় ঘটে যে ফরমালিন ছাড়া কোন কিছু বিশেষ করে কোন মাছ বাজারে পাওয়া যায়না।

সব মাছে ফরমালিন থাকলেও লইট্টা মাছে ফরমালিন মেনে নিতে পারিনা। কারন এটি আমার জননীর প্রিয় খাদ্য বলে। বাজারে অন্য মাছের তুলনায় লইট্টা মাছের মূল্য তুলনামূলক কমই। তাছাড়া চট্টগ্রামের বাজারে এটি নিয়মিত পাওয়াও যায়। হাতের কাছে থাকার পরও মাকে তার প্রিয় খাওয়ারটি খেতে দিতে পারছিনা, এই দু:খ, এই যন্ত্রনা কোথাই রাখি। আমার মাকে তো আমি আর বিষ খেতে দিতে পারিনা।


আমার বাবা যিনি সারা জীবন নিজে পছন্দের বাইরে খুব একটা খাবার খাননি। হোটেল কিংবা কোন আচার অনুষ্ঠানে খুব একটা যেতেন না পছন্দের বাইরে খাবার খেতে হবে বলে। এখন বাবা আর বাসার বাইরে খুব একটা যেতে পারেননা। সেই ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি বাবার খাবারের তালিকায় দুধ ভাত নিয়মিতই থাকতো। সংসারের দায়িত্ব বাবার হাত থেকে আমাদের( ভাই বোন) হাতে আসার পর মওসুমে যতদিন বাজারে আম কাঁঠাল পাওয়া যাবে( সামর্থ্যের মধ্যে ) ততদিন বাবার জন্য দুধের সাথে আম অথবা কাঁঠাল রাখার চেষ্টা করতাম।

পত্র পত্রিকা আর টেলিভিশনের কল্যানে বাবা ইতোমধ্যে জেনে গেছেন বিষাক্ত কার্বাইড মিশিয়ে এই আম পাকানো হয়। সেই সাথে জেনেছেন ফরমালিন, কার্বাইড আর টেস্টিং সল্ট মেশানো খাবার খেলে কি পরিনতি হয় মানব শরীরের। তাই বাবা তিনি নিজে বলে দিয়েছেন, আম আর খাবেন না।

এই মওসুমের শুরুতে বিক্রমপুরের আত্মীয় বাড়ীর গাছের বেশ কিছু আম পাঠানো হয়েছিলো। বাসার অন্য সদস্যরা সেই আম যত্ন করে বাবাকে খাইয়েছে। এর বাইরে বারবার করে বাগান থেকে নিজে দাড়িয়ে আম সংগ্রহের পরিকল্পনা করেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

এরপরও মাঝে মাঝে নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে যখনই নিশ্চিত হয়েছি যে এটি রাসায়নিক মুক্ত তখন আম বাসায় নিয়ে গেছি যদিও বাবা সেই সব আম খাননি। সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে কোন রকমের রাসায়নিক ছাড়া আম বিক্রির কারসাজিও কোন একটি টেলিভিশনের কল্যানে ফাস হয়ে যাওয়ার পর এইভাবে আম কেনা বন্ধ করে দিয়েছি।

বাবা খেতে বসলে আমি যদি তার আশপাশে থাকি তখন খুব অস্বস্তি লাগে, বাবাকে তার পছন্দের খাবারটি খেতে দিতে পারছিনা বলে। মা- বাবার অনেক ইচ্ছা আখাংকা পূরন করতে পারিনি। কিন্তু তাদের পছন্দের কিছু খাবার যেটা এই কয় বছর নিয়মিত রাখার চেষ্টা করেছি তাও এবার বন্ধ হয়ে গেল। এই বিষয়টি যখনই মাথায় আসে নিজকে খুবই ব্যর্থ মনে হয়।


সেদিন ইফতারের সময় গলির মুখে একটি চায়ের দোকানে দেখছি ম্যানেজারের পেছানোর তাকে থরে থরে টেস্টিং সল্টের প্যাকেট সাজানো। ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলাম এটি কি কাজে লাগাই তারা। মানেজার যে তথ্য দিলেন তাতে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই দোকানের চা ছাড়া তৈরী হওয়া প্রতিটি খাদ্যে টেস্টিং সল্ট দেওয়া হয়। আমি যখন তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম তখন দোকানি বললো এখানকার সব দোকানেই টেস্টিং সল্ট ছাড়া কোন খাদ্য তৈরী হয়না।

আমার মত এই রকম অনেকেই আছেন যারা এই ভাবে নিজের বাবা- মা অথবা পছন্দের মানুষদের তাদের প্রিয় খাবারটি মুখে তুলে দিতে পারছেননা। খাবার দ্রব্যে এইভাবে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো কারনে এক সময়তো নিজেরাও মুখে দেওয়ার জন্য কোন কিছু পাবো না। তাই আসুন ফরমালিন, কার্বাইড আর টেস্টিং সল্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু করি, যুদ্ধ ঘোষনা করি।

( ফরমালিন, কার্বাইড আর টেষ্টিং সল্ট শরীরে কি ধরনের ক্ষতি করে তা নিয়ে পরে পোস্টে দেয়ার চেষ্টা করবো)