ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

”রোহিঙ্গারাদের জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে জাতিসংঘের শরনার্থী ক্যাম্প অথবা তৃতীয় কোন দেশ ।” মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন কোন রকম রাখডাক না করে রোহিঙ্গা সম্পর্কে এই কথাটি বলেছেন স্বয়ং জাতিসংঘের বিষয়ক শরনার্থী হাই কমিশনের কর্মকর্তাদের কাছে।

একজন রাষ্ট্র প্রধান যখন তার দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে প্রকাশ্যে এই বক্তব্য দেন তখন সেই দেশের সেনাবাহিনী , পুলিশ সহ অন্য সংস্থাগুলো এই জনগোষ্ঠীর সাথে কি আচরন করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। সম্প্রতি টেলিভিশন চ্যানেল আল- জাজিরার অনুসন্ধানে গত জুনের দাঙ্গার পর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানদের এখনকার প্রকৃত অবস্থা উঠে এসেছে ।

‘মাস গ্রেইভ ফর মায়ানমার’স রোহিঙ্গা’ শিরোনামে আল জাজিরার এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে রোহিঙ্গাদের অবস্থা আমাদের ধারনার চেয়েও অনেক বেশি নাজুক। রাখাইনের রাজধানী সিটুয়া শহরে বসবাসকারীদের মধ্যে রোহিঙ্গাদেরই সংখ্যাধিক্য ছিল। অথচ এখন এই শহরটিতে রোহিঙ্গার নৃগোষ্ঠির মানুষ খুব একটা চোখে পড়ছেনা। একই নৃগোষ্ঠির হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে বৌদ্ধদের হামলা এড়াতে মাথায় বিশেষ কাপড় পেছিয়ে রাখে।

সিটুইয়া শহরের হাজার হাজার রোহিঙ্গা এখন পার্শ্ববর্তী ভুমেয় গ্রামের অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করছে। এখানে রোহিঙ্গাদেরকে নিরাপত্তার নামে ঘিরে রেখেছে মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী । এখান থেকে রোহিঙ্গারা নিজ বাড়ি ঘরে ফিরে যেতে চাইলেও নিরাপত্তার অজুহাতে সরকারি বাহিনী তাদের সেখানে যেতে দিচ্ছেনা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বাড়ি ঘরে গিয়ে লাভ হবেনা , সেখানে তোমাদের কোন চিহ্ন নেই। অনেক রোহিঙ্গা নিজ নিজ বাড়ি ঘরে গিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আবার চালুর উদ্যোগ নিলেও কর্তৃপক্ষ সেগুলো বন্ধ করে দেয় একই অজুহাতে।

আল জাজিরার অনুসন্ধানে জানা গেছে রোহিঙ্গাদের সংশ্রবে না আসার ব্যাপারে সেখানকার বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাখাইনরা সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে । রোহিঙ্গাদের সিটুইয়া শহরের বড় বড় বাজার এবং গুরুত্বর্পূণ স্থানগুলোতে যেতে দেয়া হয়না। রোহিঙ্গাদের ব্যবসা বাণিজ্যের উপর এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে রোহিঙ্গারা খাদ্য এবং ঔষধ সংগ্রহ করতে পারছেনা , সেই সাথে চলাচল এবং যোগাযোগের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

আমাদের মধ্যে অনেকের ধারনা, রোহিঙ্গারা যেকোন ভাবেই বাংলাদেশে প্রবেশ করার জন্য অজুহাত খোজে। যেকোন একটা কিছু হলেই তাদের দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করা যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। গত জুনে দাঙ্গার পর রোহিঙ্গাদের দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টাকেও সেই রকম কিছু বলে মনে হয়েছিলো। তবে আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রমাণ হয়েছে তারা বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে। আর রাখাইন প্রদেশের অবস্থা যে এখনো খারাপ তা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাতে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে আল জাজিরায় দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন রোহিঙ্গাদের দায় দায়িত্ব মায়ানমারের। গত জুনে সীমান্তবর্তী রাখাইন প্রদেশে দাঙ্গার পর রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টার সময় প্রধানমন্ত্রী যে মনোভাব দেখিয়েছেন আল জাজিরার সাক্ষাৎকারেও তিনি একই কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাব আসলে একটি নিরেট বাস্তবতা। বাংলাদেশের মত বিশ্বের সবচেয়ে ঘন বহুল দেশে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ না নেয়ার সিদ্ধান্ত অবশ্যই বাস্তব সম্মত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ না দেয়ার নীতিও গ্রহন যোগ্য।

কিন্তু এই নীতির বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের উপর অপবাদ দেয়াটা অশোভন । জাতীয় সংসদ এবং বিভিন্ন ফোরামে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন এবং তাদেরকে আশ্রয় না দেয়ার পেছনে এটাকে একটি কারন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার ব্যাপারে সরকারের নীতি থাকতে পারে কিন্তু তাই বলে তাদের অপবাদ দেয়াটা তাদের প্রতি এক ধরনের অবিচারও বটে।

নতুন করে কোন রোহিঙ্গাকে শরনার্থী হিসেবে নেয়া না হলেও বর্তমানে কক্সবাজারে দুটি ক্যাম্পে ত্রিশ হাজার শরনার্থী বসবাস করছে। এই রোহিঙ্গারা জাতিসংঘ শরনার্থী বিষয়ক হাই কমিশনের তত্বাবধানে আছে। মায়ানমার সরকার সহযোগীতা না করায় এই সব শরণার্থীরা নিজ দেশে ফেরত যেতে পারছেনা। বাংলাদেশ সরকারও চাইলে তাদের ফেরত পাঠাতে পারছেনা। রোহিঙ্গা শরনার্থীরা দেশে ফেরত যেতে না পারার জন্য কেউ যদি দায়ি থাকা তাহলে সেটা হচ্ছে মায়ানমার সরকার। এরজন্য রোহিঙ্গাদের কোন ভাবেই দায়ি করা যাবেনা।

অথচ আমাদের সরকারের যাবতীয় আক্রোশ যেন রোহিঙ্গাদের উপর। তাদেরকে সন্ত্রাসী জঙ্গি আখ্যা দিয়ে হেয় করার পাশাপশি বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সরাকরের সহযোগিতার মনোভাব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সম্প্রতি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেয়া তিনটি সাহায্য সংস্থার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ অনুপ্রবেশের চেষ্টাকারি রোহিঙ্গাদের আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসন যেভাবে খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা দিয়েছে তা আন্তর্জাতিক অনেক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় না পেলেও রোহিঙ্গারা এই সেবা কার্যক্রমের কারনে সন্তুষ্ট ছিলো।

বিদেশী নাগরিক হিসেবে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তেমনি আবার এই নিয়ন্ত্রণ যাতে নির্যাতনের পর্যায়ে না যায় সেটা ও লক্ষ রাখতে হবে। গত জুনের দাঙ্গার পর রোহিঙ্গা ইস্যূতে মায়ানমারের গণতান্ত্রিক অর্জন আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। একইভাবে রোহিঙ্গাদের উপর নেয়া কোন সিদ্ধান্তের কারনেও বাংলাদেশ সম্পর্কেও ভুলবার্তা যেতে পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

এক সময়ের সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গার এখন কালের চক্রে পৃথিবীর সবচেয়ে সংকটাপন্ন জাতিতে পরিনত হয়েছে। তাই মায়ানমার সরকার তাদের উপর সম্ভব সব ধরনের নির্যাতনই চালাচ্ছে। মনে হয় মানবাধিকারের কোন বিধি বিধানই রোহিঙ্গাদের জন্য কার্যকর নয়। কারন রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী অধ্যুষিত মায়ানমারের কাছে যতটা না মানুষ তার চেয়েও বেশি পরিচিত বিদেশী অনুপ্রবেশকারী হিসেবে। সীমান্তের ওপারে রোহিঙ্গাদেরকে যেভাবেই চিহ্নিত করুক না কেন আমরা যেন তাদের মানুষ হিসেবে দেখি, মানুষ হিসেবে সম্মান দেয়।

মায়ানমারের আরাকান বর্তমান রাখাইন প্রদেশের মানুষের সাথে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক বিষয়। এর অন্যতম কারন যতটা রাজনৈতিক তার চেয়েও বেশি অভিন্ন কৃষ্টি কালচার এবং ধর্মীয় মুল্যবোধজনিত। এখন শুধু রোহিঙ্গার নয়, সীমান্তের দুই পাড়ের বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাখাইনরাও অভিন্ন সংস্কৃতির অংশীদার । নাফ নদীর দুই পাড়ের মানুষের এই সম্পর্ক কোন ধরনের রাজনৈতিক বেড়াজালে আটকা পড়বে বলে মনে হয়না।