ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ


রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা এবং ভাংচূরের ঘটনা সম্পর্কে সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক মন্তব্যগুলো করেছেন আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। তার মতে এই ঘটনা স্বাধীনতার পর দেশে সংগঠিত সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়তো এই ঘটনার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতো এবং তারা জেনেও চূপ ছিল।

মিজানুর রহমানের এইসব মন্ত্যের পর স্বাভাবিকভাবে দুটি প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করছি। একটি হচ্ছে, এটি যদি সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা হয় তা হলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট কিংবা ১৯৮১ এর ২৯ মে এর ঘটনা অথবা আরো পরে পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার অবস্থান ইতিহাসে কোথায় হবে ? অপর প্রশ্নটি হচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি জানতোই তা হলে ব্যবস্থা নিলো না কেন?

মিজানুর রহমানের এই বক্তব্য সম্পর্কে প্রথম প্রতিক্রিয়া পেলাম আমার এক সহকর্মী থেকে। এই সহকর্মীর মতে, ৯১ সালে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পর দেশে যে দাঙ্গা পরিস্থিতি হয়েছিলো তা এই ঘটনার চেয়েও ভয়াবহ। তাছাড়া সম্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর নন্দির হাটে সংগঠিত ঘটনাও কম বড় ছিলোনা।


উল্লেখিত ঘটনাগুলোর সবগুলোই আমাদের জন্য লজ্জাস্কর, এবং জঘন্য। এখানে যুগ যুগ ধরে সকল সম্প্রদায় যেভাবে পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছিলো তার সাথে কক্সবাজারের ঘটনা একদমই বেমানান। উপমহাদেশের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের ঘটনা থাকলেও আরাকান ছাড়া অন্য কোথাও বৌদ্ধ- মুসলিম সংঘাত তেমন ছিলনা। এবার তার অভিজ্ঞতাও হলো আমাদের।

গত জুলাই থেকে আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর সংখ্যা গরিষ্ঠ বৌদ্ধদের আক্রমন ও নির্যাতনের ঘটনার প্রেক্ষিতে সমগ্র কক্সবাজার এলাকায় রাখাইন পল্লীগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিলো। তখন আরাকানের দাঙ্গা এপারে কক্সবাজারে ছড়িয়ে পড়ার আশংকাও ছিল। কিন্তু তখন সব কিছু ঠিকঠাকই ছিল। তিন মাস পর আরাকানের ঘটনার অনেকটা পুনরাবৃত্তি ঘটলো কক্সবাজারে।

অবশ্যই এর মধ্যে আরো কিছু ঘটনা ঘটেছে যা নিয়ে মুসলমানরা প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিলো। এই রকম একটি হচ্ছে আসামে মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে স্থানীয় বোড়ো জাতি গোষ্ঠীর সংঘাত। এই সংঘাতে প্রচুর মুসলমান নির্যাতনের শিকার হয়ে বাস্তুহারা হয়েছে। আরাকানের ঘটনার কাছাকাছি সময়ে সংগঠিত আসামের ঘটনার কোন যোগসূত্র আছে কিনা সেটা এখনো নিশ্চিত নয়, তবে দুই ঘটনায় মুসলমানরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে।


আর এর পরে এখন রামু, উখিয়া, টেকনাফ আর পটিয়াতে ঘটেছে অনেকটা একই ধরনের ঘটনা। তবে এতে মুসলমানরা হামলা চালিয়েছে বৌদ্ধদের উপর। আরকান এবং আসামে ক্ষতিগ্রস্থদের বেশির ভাগ যেমন মুসলিম তেমনি কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্তরা বৌদ্ধ।

তবে এইসব ঘটনার মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে আরাকানে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানদের সম্পর্কে সেদেশের প্রশাসনের মনোভাবের ঠিক বিপরীত বৌদ্ধদের প্রতি আমাদের প্রশাসনের মনোভাব। আরাকানে মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে মিডিয়া এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যেভাবে মুসলমানদের তাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, প্রশাসন, সুশীল সমাজ সবাই এখানকার ঘটনায় হতাশ এবং লজ্জিত।

বৌদ্ধ মন্দির এবং তাদের বসত বাড়ীতে হঠাৎ করে এই হামলার কারন অনুসন্ধান চলছে বিভিন্ন মহল থেকে। সরকারি দল , প্রশাসন, বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত করেছে এবং করছে। ঘটনা নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপের প্রতিযোগিতা চলছে ঠিকই তবে, তারা কেউ এই ঘটনায় জড়িতদের পক্ষ নেয়নি। এটাতে প্রমাণিত হয় সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাংলাদেশে সামাজিকভাবে কত বেশি অগ্রহনযোগ্য।


শুধু উপমহাদেশ নয়, বিশ্বের যেকোন সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতার ঢেউ আচড়ে পরতে পারে অন্যত্র। আরাকানে সাম্প্রতিক দাঙ্গার প্রভাব কিছুটা হলেও পড়েছে কক্সবাজারে। রোহিঙ্গাদের উপর বিরূপ মনোভাব থাকলেও তাদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় এখানকার মানুষ ঠিকই ক্ষুদ্ধ ছিল। এর পাশাপাশি হযরত মুহাম্মদ (স:)কে নিয়ে অবমাননাকর চলচ্চিত্র নির্মাণের কারনে একটি প্রতিবাদী অবস্থানে ছিল সারা পৃথিবীর মুসলমানদের মত সংখ্যা গরিষ্ঠ বাংলাদেশীরা। এরমধ্যে নিজদের ঘরের পাশে এক যুবকের ফেইসবুক পেইজে কোরআন অবমাননার ছবি দেখে কথিত গায়ের জালা মেটানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেলো সুযোগ সন্ধানীরা!

সাম্প্রদায়িকতার যে ভাইরাস আরাকানে জম্ম নিয়েছে কক্সবাজারের ঘটনা তার একটি সংক্রমন মাত্র। সামাজিক সচেতনতা, রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান এবং সম্প্রীতির অতীত রেকর্ডের কারনে এই ভাইরাস আরো আগে বাংলাদেশে সংক্রমন করতে পারেনি। কিন্তু ক্রমাগত ঘটে চলা ঘটনা প্রবাহ বাংলাদেশকে ঠিকই সংক্রমন করে বসেছে। সীমান্তের ওপার থেকে আসা সাম্প্রদায়িকতা নামক ভাইরাসের শিকার বাংলাদেশ।