ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

সরকারের কর্মকান্ড দেখে গ্রামের এক লোকের বউ পেটানোর গল্পটি মনে পড়ে গেল । হাইস্কুলের গন্ডি শেষ হয় হয় এমন সময়। লেখাপড়ায় না যতটুকু মনযোগ তার চেয়েও বেশি মনযোগী ছিলাম গ্রামের অলিগলির খবর রাখায়। পাশের বাড়ির এক ব্যক্তি, পেশায় বলতে গেলে কিছুই করতেননা, কিন্তু পরিবারের একমাত্র উপর্জনাম ব্যক্তি তিনি। মাঝে মাঝে গ্রামের চায়ের দোকানে বসে উচ্চস্বরে কথা বলতেন, আর লোকজনের সাথে ঝগড়া করতেন। এক দিন জানতে পারলাম এই লোকটি তার মার সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করে, আর একটু এদিক ওদিক হলে বউকে বেদম পেটায়। এই লোকের পরিবারটি মোটামুটি ভদ্র গোছের ছিল, তাই তাদের পরিবারের সদস্যরা এসব কাহিনী যতটুকু সম্ভব চেপে রাখার চেষ্টা করতো। কিন্তু এক কান দুই কান করে তা আমার মত গ্রামের অনেকের জানা হয়ে গেল। এই লোকটি সম্পর্কে গ্রামের লোকের বলতো, কাজ কর্ম কিছু করতে না পেরে সে ঘরে গিয়ে বউ পিটায়, আর মার সাথে দূব্যবহার করে মনের ঝাল মিটায় ।

এরপর থেকে আমার ধারনা হয়েছে, বাইরে সামর্থহীন ব্যক্তিরাই নিরীহ মা বউ অথবা বোনদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। সম্প্রতি দুই দফায় জামাত- শিবিরের মহিলা শাখার বেশ কয়েকজন পর্দানশীন বোরকা পড়া মহিলাকে গ্রেফতারের ঘটনার কারনে সরকার আর সেই বউ পেটানো ব্যক্তির আচরন অনেকটা মিলে যাচ্ছে।

প্রথম দফায় মগবাজারের একটি বাসা থেকে এক অন্ত:সত্তা মহিলাসহ ২০ নারীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হলো। শুধু রিমান্ডই নয়, পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগও করা হয়েছে। কেন তাদের গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়া হলো তার কোন সুনিদিষ্ট কারন আজো আমরা জানিনা। এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রেসকাবে আয়োজিত একটি সভায়ও র‌্যাব পুলিশ হানা দিয়ে আরো কয়েকজন পর্দানশীন মহিলাদের গ্রেফতার করেছে, তাও কোন অভিযোগ ছাড়া।

সরকারের এই আচরনে যখন দেশের ধর্মপ্রান মানুষ চরমভাবে ব্যথিত ঠিক তখনই এইসব মহিলাদের বোরকা খুলে আদালতে হাজির করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এমন আচরনে সেইসব ধর্মপ্রান মানুষরা বলতে গেলে একেবারেই হতবাক। এই মহিলারা দোষী হলে, কোন বেআইনী কাজ করলে পুলিশ আদালতে রিপোর্ট দেবে, আর সাক্ষী প্রমানের ভিত্তিতে আদালত তার বিচার করবে। কিন্তু এর মধ্যে কোন আইনে বোরকা খুলে নেয়া হলো তার একটি ব্যাখা আমরা যারা ধর্মে বিশ্বাস করি তাদের জানা প্রয়োজন। মুসলমান মহিলাদের অন্যতম ধর্মীয় প্রতীক হিজাব এইভাবে কেড়ে নেয়ার কি কারন থাকতে পারে? তার উত্তর একদিন অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে।

গ্রেফতারকৃত এই মহিলাদের দেখে আপত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তারা খুবই নিরীহ গোছের। তাদের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে কিংবা বর্তমানে আইন ভঙ্গের কোন অভিযোগ নেই। তবে একটি অভিযোগ থাকতে পারে, তা হচ্ছে তারা যুদ্ধাপরাধে অভিযোগে অভিযুক্তদের পরিচালিত দল জামাত শিবিরের অনুসারী, জামাত- শিবিরের মহিলা শাখার নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তাদের হয়ে কাজ করছে। বোরকা পড়া মহিলাদের গ্রেফতার ও ধর পাকড় শুরু হওয়ায় গত চার বছর ধরে জামাত- শিবিরের সাথে সরকারের চলমান বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। কেন সরকার হঠাৎ করে চড়াও হলো পর্দ্দানশীন নিরীহ এইসব মহিলাদের উপর, এই প্রশ্ন আমার মত যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন তাদের অনেকেরই?

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে মহিলাদের গ্রেফতার করার পর বীরপুরুষ(!) র‌্যাব কর্মকর্তা মিডিয়ায় বলেছেন, এইসব মহিলা প্রেসকাবের ভেতরে হাইড আউট নিয়েছিলো। মিছিলের চেষ্টা না করলেও তাই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আবার পুলিশ ও র‌্যাবের আরো দু একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, উপরের নির্দেশে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কে এই উপরওয়ালা, এই উপরওয়ালা গ্রামের সেই বউ পেটানো ব্যক্তির মত কেউ হবে নিশ্চয়।

গ্রামের সেই ব্যক্তি যেমন ব্যক্তিজীবনে একজন ব্যর্থ পুরুষ, তেমনি আমাদের সরকারও তাদের প্রতিপ জামাত শিবিরকে দাবিয়ে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। জামাত- শিবিরের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পারার ব্যর্থতার ঝাল মেটাতে তাদের নিরীহ মহিলা সদস্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমনইতো মনে হচ্ছে আমার কাছে।

বাংলাদেশ ধর্মপ্রান মুসলমানদের দেশ। এদেশের মানুষ ধর্মপ্রান হলেও ধর্মান্ধ নয়। কিন্তু এভাবে ধার্মিক মহিলাদের টানা হেচড়া ও নির্যাতন এদেশের বেশির ভাগ মানুষের ধর্মীয় চেতনার পরিপন্থি। এটা সরকারের মনে রাখা দরকার।

মুসলিম বিশ্বে ইদানিং হিজাব খুবই স্পর্শকাতর ব্যাপার। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলমান মেয়েদের হিজাব পড়ায় বাধা দেয়া নিয়ে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছে। হিজাব পড়া মহিলাদের এভাবে হেনস্তা করলে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় গিয়ে পৌছাবে সে ব্যাপারেও সরকারকে ভাবা উচিত।

আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগে হিজাব পড়েছিলেন। তার অন্তত জানার কথা হিজাবের শক্তি এবং ক্ষমতা কতটুকু এবং দেশের মানুষ হিজাবকে কতটুকু গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

এমনিতে মুসল্লিদের সমাবেশে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রীর অপদস্ত হওয়ার মত ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বর্তমান সরকারের ইসলাম বিদ্বেষী পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। নানা কারনে মুসিলিম বিশ্বের সাথে সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এই জাতীয় ঘটনাগুলো মুসলিম বিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায় নিয়ে যাবে তা ভেবে রাখা প্রয়োজন।

বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার সমূহের অন্যতম ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। তাই এই বিচার তারা করবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রক্রিয়া ও মানদন্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠায় নানাভাবে এই বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করছে জামাত- শিবির। আমি নিশ্চিত, মানদন্ড ঠিক রাখার পাশাপাশি জামাত বিএনপির বাইরে থাকা অপরাপর যুদ্ধাপরাধী বিচারের আওতায় আনলে জামাত- শিবির হালে পানি পাবেনা।

সুতারাং সরকারকে বলবো, জামাত শিবিরকে মোকাবেলার জন্য শুধু যুদ্ধাপরাধের বিচার কেন, আরো যা যা সম্ভব করুন। কিন্তু দয়া করে ধর্মপ্রান নারীদের উপর নির্যাতন করবেননা। মানুষের মনে আঘাত দেবেন না।