ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

এখন পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার এই ভূবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মর্ত্যরে মানুষরা নোবেল পূরষ্কার পাওয়াকে জম্মের সেরা অর্জন বলে মনে করছে। আমরা না হয় পশ্চিম্ বিশ্বের একটি স্বীকৃতিকে অনেক বড় করে দেখি, কিন্তু ছয়টি বিষষের বিশ্ব পণ্ডিতরা কখনো নোবেল পূরষ্কারকে অবজ্ঞা করেছেন, তেমন নজির খুব কম।

১৯৬৪ সালে ফরাসী দার্শনিক ও সাহিত্যিক জন পল সাত্র্যেঁ ও ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের বিপ্লবী লি দোক থো মাত্র এই দুইজন সেচ্চায় নোবেল গ্রহন করেননি। নোবেল গ্রহন না করে তারা যে বিশালত্বের স্তরে নিজেদের নিয়ে যেতে পেরেছেন তা সম্ভব হয়েছে মূলত নোবেলের বিশালত্বের কারনে।

তখনকার পূর্ব- পশ্চিমের সাংস্কৃতিক দ্বন্ধের কারনে পশ্চিমা নোবেল কমিটির কাছ থেকে সাত্র্যেঁ নোবেল গ্রহন করেননি । পরবর্তীতে নোবেল পূরষ্কার গ্রহন করবেন বলে সে পূরষ্কারটি তাকে দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে নোবেল কমিটিকে চিঠি দিয়েছিলেন সাত্র্যেঁ, এমন কথা নোবেল পূরষ্কারের ইতিহাসে প্রায় প্রতিষ্ঠিত ।

১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চূক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জারের সাথে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পূরষ্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন ভিয়েতনামের জেনারেল, কূটনৈতিক ও রাজনীতিবিদ বিপ্লবী লি দোক থো। প্যারিস শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনামে শান্তি প্রতিষ্টা হয়নি উল্লেখ করে লি নোবেল শান্তি পূরষ্কারের জন্য নিজের মনোনয়নকে যথাযথ মনে করেননি তিনি।

এর বাইরে নোবেলের চূড়ান্ত মনোনয়ন বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে হাতে গোনা কয়েকবার। তাছাড়া মানব সভ্যতার অন্যতম যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদি এডলফ হিটলার আইন করে জার্মান নাগরিকদের জন্য নোবেল পূরষ্কার গ্রহন নিষিদ্ধ করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে নাজি শাসনের কট্টর সমালোচক কার্ল ভন ওসিটজকি নোবেল শান্তি পূরষ্কারের জন্য মনোনীত হওয়াতে হিটলার জার্মানদের জন্য নোবেল নিষিদ্ধ করে নিজেই একটি শান্তি পূরষ্কার দেয়া শুরু করেছিলেন।

আবশ্যই নাজি প্রশাসন নোবেল কমিটিকে এই পূরষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলো। আর শান্তিতে নোবেল পাওয়ায় বেচারা কার্ল ওসিটজকি এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যে, পূরষ্কার ঘোষণার দেড় বছরের মাথায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

নোবেল নিয়ে আমাদের সমস্যাটা একটু ভিন্ন। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে সামাজিক স্তরের নীচের দিকে অবস্থান করা একটি জাতির সন্তান ড. ইউনুস নোবেল পুরস্কার পাওয়াতে আমরা অনেকেই একটা নতুন ইস্যূ পেলাম আলোচনার। ইউনুসের এই পূরষ্কার যখন আসে তখন কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাকই ছিলো। বর্তমানে সমুদ্র বিজয় উৎসবের চেয়েও অনেক বড় উৎসবের মাধ্যমে দেশবাসি ড. ইউনুসকে অভিনন্দন জানিয়েছি। আমাদেরই এক শিক্ষক, উদ্যোক্তা আর স্বপ্নবাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি বলে স্বীকৃতি দিয়েছি। পৃথীবির এপ্রান্তে ওপ্রান্তে বাংলাদেশীরা ড. ইউনুসের দেশের মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেলাম।

বিপত্তি বাধলো ২০০৮ সালে রাজনীতিবিদরা মুক্ত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর। ক্ষমতাসীনরা ড. ইউনুসের নোবেল প্রাপ্তিকে বড় অপরাধ হিসেবে দেখতে শুরু করলো। শাস্তিও দেয়া হলো তাকে। নানা টালবাহানায় কেড়ে নেয়া হলো তার ঘামে শ্রমে গড়া গ্রামীন ব্যাংক। শুধু তাই নয়, তার সম্পর্কে ফ্রি ষ্টাইলে বক্তব্য রেখে আমাদের মন্ত্রীরাও বেকুব উপাধি অর্জন করে ফেলেছেন।

অনেক সময় ক্ষমতাসীনরা তাদের চেয়েও দেশের বড় শিখন্ডি কাউকে মনে করেননা, তাই তারা সরকারের বাইরে অন্য কারো স্বীকৃতি ভালো চোখে দেখেনা, সেটা হিটলার প্রমান করে গেছে। আমাদের ক্ষমতাসীনরা হিটলারের মত না হলেও অন্তত নিজেদের সাধ্য সামর্থ অনুযায়ী চেষ্টা করছে ড. ইউনুসের নোবেল পাওয়ার শাস্তি কড়াই গন্ডায় বুঝিয়ে দিতে।

স্বদেশী ড. ইউনুসকে ব্যথায় জর্জরিত করে বিদেশ থেকে আরেক নোবেল বিজয়ী ড. আমর্ত্য সেনকে এনে সরকার যখন মাতামাতি করে তখন আমরাও ব্যথিত হয়। উত্তর খোজার চেষ্টা করি, এভাবে কেন আমরা একের পর এক নিজেদের নীচে নামানোর আত্মঘাতী প্রতিযোগীয়তায় লিপ্ত হলাম?

ক্ষমতাসীনরা অনেক কিছু করতে পারেন, তাদের ইচ্ছা আছে, সাধ্য সামর্থ অনেক কিছু আছে। তাদের মূল্যায়নও ইতিহাসে একদিন হবে। কিন্তু আমাদের মত সাধারন মানুষরা যখন ড. ইউনুসের পিন্ডি চটকান তখন এ কথাগুলো বলা দায়িত্ব মনে করছি।

হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া, দেশের বেশির ভাগ মানুষ ড. ইউনুসকে নিয়ে গর্বিত, এটা আমি বিশ্বাস করি এবং উপলদ্ধিও করতে পারি। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরা যখন ড. ইউনুসকে ব্যক্তিগতভাবে মূল্যায়ন করেন তখন তার পাশের বাড়ীর মানুষ হিসেবে নিজেও মূল্যায়িত হচ্ছি বলে আমার মনে হয়।

সমালোচকরা সচারাচার বলে থাকেন, ড. ইউনুস দেশের মানুষের রক্ত চুষে খেয়েছেন, নিজের নামে প্রচূর সম্পত্তি করেছেন, গ্রামীন ব্যাংককে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

ড. ইউনুস এইসব অভিযোগে অভিযুক্ত কিনা সে বিতর্ক না গিয়ে আমি একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি তিনি শয়তান কিংবা ফেরেশতা নন, একজন মানুষ। তার কাজে কিছু ভূল থাকলে তা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, তার এইসব ভূলগুলোর বিপরীতে অর্জনের পরিমান কত?

আলাপ,আড্ডায়, ব্লগে, সভা সেমিনারে ড. ইউনুসের সমালোচনায় যারা মুখর তাদেরকে একবার হলেও তার সামর্থ্য ও অর্জনগুলোর প্রতি একটু নজর দেয়ার অনুরোধ করছি। তাহলে হয়তো দেখতে পাবেন একটি মাত্র লোক কিভাবে বদলে দেয়ার চেষ্টা করেছেন, এই দেশের সামাজিক অর্থনীতির চিত্র।

সারা বিশ্ব যেখানে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জম্ম নেয়া এই লোকটার কৃতিত্বকে এত বিশাল করে দেখছে, সেখানে আপনারা বাংলাদেশের যে কয়জন ইউনুস সমালোচক আছেন তারাও তার কৃতিত্ব দেখতে পাবেন বলে আশা করছি।

আর যারা দেখেও না দেখার ভান করে আছেন অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে ড. ইউনুসের কৃতিত্ব দেখেও উল্টোটা বলছেন তারা এবার থামতে পারেন। কারন আপনারা নিজেদের মত করে ড. ইউনুসের সমালোচনা করে যেতে পারবেন, কিন্তু তার অবস্থান খাটো করতে পারবেননা। এখন পর্যন্ত ড. ইউনুস একজনই বাংলাদেশে আছেন, এবং এটাই ইতিহাস।

সুতরাং আপনারা এবার থামতে পারেন…।