ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশ মানেই তো সেবা, তারা জনগনের সেবক। সোজা বাংলায় নিরাপত্তা সেবা দেয়ার জন্যই পুলিশ। যারা জনগনের টাকায় জনগনের নিরাপত্তা দেয়ার কাজে নিয়োজিত। পুলিশের নামের অর্থেই মূলত তাদের কাজের ধরন উল্লেখ আছে। নগর পাহারাদার এর ল্যাটিন প্রতিশব্দ Politia মধ্য ফান্স ঘুরে ইংরেজী ভাষায় Police হিসেবে সংযোজিত হয়েছে ১৫৩০ সালে। পুরানো গ্রীকেও চালু ছিল Polissoos ব্যবস্থা। যার অর্থ ছিলো “I save,I keep”।

নগর সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে পুলিশি ব্যবস্থা ছিল অনিবার্য। আধুনিক পুলিশিং চালু হয় ফ্রান্সের প্যারিসে ১৬৬৭ সালে রাজা চর্তুদশ লুইস এর হাত ধরে। শিল্প বিপ্লবের শুরুতে ইংল্যান্ডের আর্থ সামাজিক পরিবর্তনের পথ ধরে চালু হয় পুলিশি ব্যবস্থা। ১৮২৯ সালে তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট পিল পার্লামেন্টে বিল আনেন সিভিল পুলিশ প্রতিষ্ঠার। প্রথম দিকে এই ধরনের পুলিশি ব্যবস্থার কিছু বিরোধীতা থাকলেও সামাজিক বিশৃংখলা রোধে লন্ডন পুলিশের সফলতায় সেই সব বিরোধিতা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। অচিরেই লন্ডন পুলিশের মডেল ছড়িয়ে পড়ে আটলান্টিক এর দুই তীরে।

১৮৫৮ সালে ভারত বর্ষে বৃটিশদের নিরংকুশ রাজত্ব কায়েম হলে লন্ডন পুলিশের অনুকরনে পুলিশি ব্যবস্থা চালু হয় । ১৯৬১ সালে বৃটেনের পার্লামেন্টে অধ্যাদেশ পাশের মাধ্যমে ভারতের প্রত্যেক প্রদেশে পুলিশ বাহিনী গঠন হয়। মুলত সেই থেকে যাত্রা শুরু আমাদের গুণধর পুলিশ বাহিনীর। অবশ্য সম্রাট আশোকার সময়েও এখানে পুলিশি ব্যবস্থা চালু ছিল বলে কথিত আছে।

বর্তমানে পুলিশ নিয়ে নানা গালগল্প আর প্রবাদ প্রবচনে ভরপুর আমাদের প্রাত্যহিক জীবন। প্রতিনিয়ত এইসব মুখরোচক প্রবাদ প্রবচন গাল গল্পের পরিমান বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে আমাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠাও। সভ্যতার অন্যতম অনুষঙ্গ পুলিশের কাজ কর্ম আর আচার আচরন ক্রমান্বয়ে এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে আমরা সভ্য হচ্ছি না অসভ্য হচ্ছি তা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগতে হচ্ছে।

১৯৯৭ সালে ঢাকায় ডিবি পুলিশের নির্মম পিটুনিতে নিহত হয়েছিলো কলেজ ছাত্র রুবেল। তখন অফিসে কয়েকজন সাংবাদিক সহকর্মী বারবার বলছিলেন, আমাদের পুলিশ এমন কেন? তাদেরকে আমার পাল্টা প্রশ্ন ছিলো কেমন আমাদের পুলিশ?

আমার এই প্রশ্নের পর সহকর্মীরা পুলিশের সাথে খাতির-টাতির রাখি এই দিকটিকে সামনে এনে পুলিশের কাজের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে আমাকে রীতিমত অপরাধীর কাটগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিলেন।

তখন একটি যুক্তি আমি দিতাম আর তা হচ্ছে পুলিশরাও তো এই দেশের সন্তান, এই মাটিতে বেড়ে উঠেছে, একই আলো বাতাস গ্রহন করে জীবন ধারন করছে। সুতরাং এই দেশের মানুষ যেমন, পুলিশও তেমন। পুলিশ তো আর ভিন গ্রহ থেকে আসেনি।

রাতে ঘোরা ফেরার সময় রাস্তার টহল পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমি বিরক্ত হয়না। এতে সাথে থাকা বন্ধুরা আমার উপর বিরক্ত হয়। তাদের বক্তব্য, পুলিশের জন্য নির্বিঘ্নে রাস্তায় চলাফেরাও করা যাচ্ছেনা। এই দেশের মালিক কি পুলিশ? এই রকম পরিস্থিতিতে আমি বন্ধুদের বলি, পুলিশ সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থামিয়েছে, এমটি নাও হতে পারে। বরং পুলিশ আমাদেরকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্যও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কারন এতরাতে আমাদের বিপদ আপদও হতে পারে। আর বিপাদপদ হলে তো পুলিশকেই ডাকতে হবে।

যখনি পুলিশের মুখোমুখি হয়েছি, পেশাগত পরিচয় পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা যে আচরন করেছে তা রীতিমত র্দূব্যবহার। অনেক সময় মজা করে নিজের পেশাগত পরিচয় গোপন করে যখনি তর্কে লিপ্ত হয়েছি, তখনি টের পেয়েছি বাংলার পুলিশ কাকে বলে।

উত্তর চট্টগ্রামে ওয়াসার একটি নির্মানাধীন প্রকল্পের পাশে পুলিশ বিভাগের মালিকানাধীন একটি জায়গা আছে। কিন্তু সীমানা নির্ধারন নিয়ে কিছুটা জটিলতা থাকায় স্থানীয় ওসি প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ছাড়পত্র নিয়েও সেখানে প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নেয়া যাচ্ছিল না সেই ওসির বাধায়। চিন্তা করুন, ক্ষমতা আমাদের ওসি সাহেবের! ওই ওসি কোন কিছু পরওয়া করছেনা দেখে ওয়াসার কর্মকর্তার্ স্থানীয় সংসদ সদস্যের শরনাপন্ন হন। শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যের ধমক খেয়ে পিছু হটেন বড় বাবু।

এর বিপরীত চিত্রও আছে। উত্তর চট্টগ্রামে একজন সহকারী পুলিশ সুপারের বদলী ঠেকাতে দলমত নির্বিশেষে এলাকার সাধারন মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো। বছরের পর বছর ধরে ইমেজ সংকটে ভোগা পুলিশের একজন কর্মকর্তার প নিয়ে সাধারন মানুষ রাস্তায় নেমেছে এমন ঘটনা তো নজির বিহীন। শেষ পর্যন্ত সেই সহকারী পুলিশ সুপার এখনো আছেন তার পুরানো কর্মস্থলে। কয়েকদিন আগে ওই পুলিশ সুপারের কর্মস্থলের কাছাকাছি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচিত এক ছাত্র নিখোঁজ হলে তার স্মরণাপন্ন হই। কথা বলে বিস্মিত হলাম যে, পত্রিকায় নিউজ দেখে এই পুলিশ সুপার নিজ উদ্যোগে নিখোজ ছাত্রের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে দিয়েছিলেন। বুঝতে পারলাম সেখানকার মানুষ ‘ব’ আদ্যক্ষরের এই পুলিশ কর্মকর্তাকে এত ভালোবাসার আসল কারন।

আমাদের ব্যক্তিগত উপলদ্ধি হচ্ছে, সরকারি বেসরকারি নির্বিশেষে আমাদের সবার মানসিকতা প্রায় একই রকম। তথ্য মন্ত্রনালয়ের অধীনের একটি প্রতিষ্ঠানে সাবেক কর্মকর্তা আমাদের এক সিনিয়র বন্ধু কিছুদিন আগে বলেছিলেন, অর্থ মন্ত্রনালয় থেকে টাকা ছাড় করাতে কিভাবে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। তার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম আপনাদের মত মিডিয়ার হোমড়া চোমাড়াদের কাছ থেকেও আদায় করে ছেড়েছে? কেমন তাদের বুকের পাটা?

এই রকম ঘটনা হার হামেশা ঘটছে আমাদের জীবনে। তবে পুলিশের বিষয়টি অন্য সবার চেয়েও বেশি নজরে আসে, কারন তাদের হাতে লাঠি থাকে বলে। এই লাঠির কারনে পুলিশ এখন মূলত লাঠিয়াল। যখন যে সরকারে থাকে তাদের লাঠিয়াল হওয়ায় পুলিশের আসল কাজ যেন। বিরোধী দলকে পিটিয়ে লাল করে দিতে পুলিশইতো আমাদের ক্ষমতাসীনদের প্রধান ভরসা।

লাঠিয়াল নির্ভর আমাদের সরকারগুলো কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এই লাঠিয়ালকে।