ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

ছেলের এসএসসি পরীক্ষা, বাকি মাত্র সপ্তাহ খানেক।ছেলে ছাত্র ভালো কিন্তু বইয়ের সাথে যোজন দূরত্ব তার। ছেলের সিদ্ধান্ত পরীক্ষা না দেয়ার। রাতের বেলা টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোতে টেবিলে বসে ছেলে যখন পরীক্ষার সময় কোথায় গিয়ে পালানো যায় তা নিয়ে ভাবছিলো, তখনই ছেলে চমকে উঠে তার পা দুটো কে যেন বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়েছে।ছেলের গা হিম হয়ে আসে যখন দেখে তার মা শক্ত করে ধরে আছে তার দু পা।

কিছুতেই মা পা ছাড়ে না।ছেলের কাছে একটি ওয়াদা চায় সে। ছেলে রাজি হয়।পা দুটো ছেড়ে মা বলে, জীবনে আর কিছুই চাওয়ার নাই, একটাই চাওয়া, সে পরীক্ষাটা দেবে।ছেলে বলে, পরীক্ষা দিলে দিলে তো নির্ঘাৎ ফেল। মা বলে, তোর মা আল্লাহর কাছ থেকে জোর করে পাশ চেয়ে আনবে।

মা তার ঘরে বাঁশের খুঁটিতে গর্ত করে জমানো পয়সা বের করে ছেলেকে সাজেশন, বই-খাতা-কলম কিনে দেয়। নির্ধারিত দিনে ছেলে পরীক্ষা দিতে যায়। মার খুশি আর কে দেখে!

শেষ দিকে এসে একটা পরীক্ষা খুব খারাপ করে ছেলে। বাড়িতে ফিরে ছেলের সে কী পাগলামি আচরণ। ফেলের দুর্নাম হলে খবর আছে। সব দায় যেন মায়ের। এবার মা ছেলের হাত-পা ধরে বলে, তার আর পরীক্ষা দেবার দরকার নেই।সে যে তার কথা ফেলে নি, বাধ্য ছেলের মতো হলে গিয়েছে, এতেই সে খুশি। বাকি পরীক্ষা না দিলে কেউ তো আর ফেল-করা ছাত্র বলতে পারবে না।বলবে, সে পরীক্ষা দেয় নি। মা পথ বাৎলে দেয়।

ছেলের পরীক্ষার সেন্টার ছিল বাড়ি থেকে মাইল দশেক দূরে।সেখানে হোস্টেলে থাকতে গিয়ে বেশ কিছু বন্ধু জুটে গিয়েছিল তার। তাছাড়া সেখানকার নদী, কাঁশবন মিলে পরিবেশটাও তার ভালো লেগে গিয়েছিল। তাই মায়ের অনুরোধ এবার ছেলে উপেক্ষা করলো।চলে গেল পরীক্ষা দিতে।পাশফেলের চেয়ে ওখানকার টানটাই যে বড়।

ফল ঘোষণার দিন যত আগায় ছেলের মাথা তত বেশি টনটন করে। সমাজে সে মুখ দেখাবে কীভাবে? ফেল তো নিশ্চিত।মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। ছেলের মাথায় আত্মহত্যার ঝোঁক চেপে বসে। মু্ক্তির সহজ পথ আত্মহত্যা।শুধু সময়ের অপেক্ষা।ফল ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন বাকি।

দুশ্চিন্তার ঘোরে ঘুমিয়ে ছেলে দেখল এক অভাবনীয় স্বপ্ন। এক রোমান্টিক পরিবেশে এক সুদর্শনা তাকে বলছে, তার ভাই তাদের ঐ বিশেষ বিষয়ের খাতা দেখছেন।সে কত নম্বর পেয়েছে তা-ও স্বপ্নকন্যা বলে দেয়।ছেলে ভাবে সে আর ফের করবে না। ঘুম থেকে জেগে সে মাকে ডাকে। মা তখনও নামাজে। তাই সাড়া দিতে দেরি হয়।

ছেলে স্বপ্নের কথা বলতেই মা মুখ চেপে ধরে।শুধু বলে, আমি বলেছি না আল্লাহর কাছ থেকে তোর পাশ চেয়ে আনব। পরীক্ষার পর থেকে একদিনও আমি ফজর না পড়ে ঘুমাই না। সারা রাত নামাজ পড়ে আল্লাহকে বলি, আল্লাহ, আমার বাধ্য ছেলেটা, যে আমাকে সম্মান করেছে, তাকে তুমি অসম্মান করো না।

ছেলেটা ফেল করে নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে সে এখন সবকিছু মিলে ভালো আছে। ছেলেটার একটাই দুঃখ, মা তাকে কিছুই করার সুযোগ দেয নি।তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার মাঝেই মুখ থুবড়ে পড়ে পরপারে চলে গেছে পুণ্যবতী মা।

বন্ধুরা, ছেলেটার পরিচয় জানতে চেয়ে বিব্রত করবেন না।শুধু এটুকু জানুন, এই লেখা টাইপ করার সময় যতগুলো অক্ষর আছে লেখায়, তার চেয়ে বেশি ফোঁটা জল পড়েছে অকৃতজ্ঞ ছেলেটার চোখ থেকে।

পুনশ্চঃ
ফল প্রকাশের পর দেখা গেল স্বপ্নে প্রাপ্ত নম্বর আর বাস্তবের নম্বর এক। বিষয়টা অবাস্তব মনে হলেও এটাই সত্যি।