ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

একদিন বাসায় একটা ছোট্ট গহনা খোয়া গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া গেল না। কযেকদিন আগেই এসেছে একটা কাজের পিচ্চি। ওর প্রতিই সবার সন্দেহের তীর। বড় ছেলে ওর কাছ থেকে হারানো জিনিসের হদিস পেতে চেষ্টা শুরু করল। বুঝিয়ে এবং থানা-পুলিশের ভয় দেখিয়ে কাজ না হলে অবশেষে পরকালের ভয় দেখানো। মিথ্যা বলার ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে ইচ্ছেমত বানিয়ে বানিয়ে হাদিস শোনাচ্ছিল সে। এমন সময় হঠাৎ করে বারান্দায় হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল আমার ছোট ছেলেটা। সবাই তটস্থ হয়ে ঊঠল। সে ভয়ে কাঁপছে এবং বলছে, আমিও তো একটা মিথ্যা কথা বলেছি সেদিন।…আমিও তো অন্যায় করেছি। আমার কী হবে। আমারও তো শাস্তি হবে।
কোন মতে তার কাছ থেকে কথা বের করা হলো। আসলেই সে মিথ্যা বলেছিল কিন্তু তা কেউ জানত না। ব্যাপারটা খুব গুরুতরও কিছু নয়। ওর মা অফিসে বসে খোঁজ নিয়েছিল সে ঠিক সময়ে গোসল সেরেছে কি-না। গোসল সারার আগেই মাকে সে বলেছিল যে, তার গোসল করা হয়েছে। মার ফোন রেখেই সে অবশ্য গোসল করে নিয়েছিল। আমরা হাসি চাপিয়ে রেখে বললাম, অন্যায় সে অবশ্যই করেছে। কিন্তু সে যদি আর কোন দিন মিথ্যা না বলে তাহলে ভয়ের কিছু নেই। আমরা তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, একবার মিথ্যা বললে আল্লাহ মাফ করে দেন, ১০০% গ্যারান্টি। অবশেষে তার ভয়ার্ত মুখ শান্ত হলো।

ঘটনাটা কয়েক বছর আগের। ছেলেটা এখন কৈশোরে। সে এখন কিছুটা বুঝতে শিখেছে। সমাজ-দেশ-রাজনীতি তার চোখের সামনে। আমরা এ বয়সে যা জানতাম, বুঝতাম, তার চেয়ে সে লক্ষ গুণ বেশি জানে, চোখটা তার অনেক বেশি খোলা। সে যখন টেলিভিশন দেখে, পেপার পড়ে, তখন আমি ভাবি অন্য কথা। সে তো প্রতিনিয়ত দেখছে মিথ্যার বেসাতি, বিশেষ করে আমাদের দেশের উপরতলার লোকদের কাছ থেকে। দিনকে রাত, রাতকে দিন বলে চালিয়ে দিয়েও যারা দিব্বি ভালো আছে, তাদের দিকে তাকিয়ে আমার শেখানো নীতিকথা আর সত্যাদর্শি চেতনা সে ভুলে যেতেই পারে। এই ছেলেটির মন থেকে যদি মিথ্যার ভয় কেটে যায়, কিংবা নিজেই কোনদিন মিথ্যায় গা ভাসিয়ে দেয়, তাহলে তার দায়ভার কে নেবে? কেবল সে নয়, তার মতো সব বাড়ন্ত ছেলেমেয়েদের মূল্যবোধে ধস যদি নামে তার পরিণতি কী হবে? কিংবা তথাকথিত ওপরতলার মানুষদের কিংবা বড়দের সে তীব্রভাবে ঘৃণা করতে শেখে তাহলে তাকে কি দোষ দেয়া যাবে?
সমাজের নিচের দিক থেকে আমরা যা গড়ছি অক্লান্ত সাধনায় তা ওপর থেকে ধসিয়ে দেয়ার অধিকার কি কারো থাকা উচিত?