ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে ক্রিকেট যখন বুঝতে শিখেছি মাত্র, দেখি বাংলাদেশের মানুষের পছন্দের এক নম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফুটবলে ব্রাজিল। ব্রাজিলের নান্দনিক, শিল্পময় ফুটবল যারা পছন্দ করে তারাই অন্ধ ভক্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের খুনে ক্রিকেটের। ভিভ রিচার্ডস-র খুনে ব্যাটিং, গার্নার, হোল্ডিং, মার্শাল, ওয়ালশ, প্যাটার্সন প্রমুখের ফাস্ট বোলিংয়ের বুনো সৌন্দর্যে বিমোহিত বাঙালি। মানুষের মনে পাশবিকতার প্রতি টান সহজাত। তাই হয়তো ভেতো বাঙালিও সেদিন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান গতিদানবদের আগুনে গোলায় ব্যাটসম্যানদের গায়ে রক্তিম দাগ দেখে অভিভূত হয়েছে। ফাস্টবলে উইকেট ছত্রখান হবার বন্যতায় মুগ্ধতা ছড়েছিল বাঙালি-মনে।
তখন ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা, ফুটবল পাগল মানুষের সংখ্যা অগণন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা জাদুতে মোহিত হল বাঙালি। ফুটবল প্রেম মোটা দাগে ভাগ হলো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায়। এই সময় কিছু কিছু ক্রিকেট ম্যাচ প্রচারিত হচ্ছিল টেলিভিশনে। ক্রিকেট নিয়ে মানুষের মনে নবরাগ দেখা দিল। নবরাগে ভাগ বসাল পাকিস্তান। মনে আছে, ১৯৮৬ সালে শারজা কাপের ফাইনালে চেতন শর্মার করা ম্যাচের শেষ বলে জাভেদ মিয়ানদাদের ছক্কা মেরে জয় ছিনিয়ে নেয়া নিয়ে মানুষের মাঝে কী মুগ্ধতা!
পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন ঝুঁকে পড়ার কারণ বেশ কিছু। দেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন-হেতু পাকিস্তানপ্রেম উস্কে দেয়া হয়েছিল। যে ধর্মীয় জাতীয়তাবোধের কারণে কিছু মানুষ অন্ধ ভারতপ্রেমী, সে কারণেই কিছু মানুষ পাকিস্তানভক্ত ছিলই। কিন্তু পাকিস্তানপ্রীতি বেড়ে যাবার পেছনে ক্রিকেটীয় কারণও কম ছিল না। বরাবর আনপ্রেডিক্টেবল দল হিসেবে পাকিস্তান মাঠে রোমাঞ্চ ছড়াতে ওস্তাদ। এটা মানুষের ভালো লাগত। ইমরান খানের নায়োকোচিত চেহারা, অনন্য ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বের কারিশমা তরুণ-তরুণীদের মন কেড়ে নেয়। ১৯৮৯ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত নেহেরু কাপে পাকিস্তান ও ইমরানের সাফল্য সমর্থন টানতে সহায়তা করে। সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তান দলের দুই গতিদানব ও সুইং মাস্টার ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনুসের বুনো উল্লাস নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল প্রবল। শক্তির পূজারী মানুষ তাদের দুজনের হাতে ব্যাটসম্যানদের নাস্তানাবুদ হতে দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারে নি। ১৯৯২ সালে পাকিস্তান দলের বিশ্বকাপ জয় আরও বেশি সমর্থক টানে।
পাকিস্তানপ্রীতিতে ভাটা পড়ে এরপরই। দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে বাংলাদেশে পাকিস্তানের শোষণ, হত্যা-নৃশংসতা মানুষের সামনে আসে। পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা প্রবল হয়ে উঠে। বিশেষ করে নতুন প্রন্মের কাছে পাকিস্তান সমর্থন মানে মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে যাওয়া হয়ে দাঁড়ায়। ওদিকে পাকিস্তান ক্রিকেটে দুর্নীতি, বেটিং, অব্যস্থাপনা আর মাঠের ব্যর্থতা। মানুষ মুখ ঘুরালো পাকিদের থেকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ রাজত্ব হারিয়েছে ইতোমধ্যে। ইংরেজদের কখনোই এদেশের মানুষ ভালোবাসে নি। অহংকারী সাদা চামড়ার অস্ট্রেলিয়ানদের প্রতিও কোন টান মানুষের থাকার কথা নয়। রঙ্গমঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকা এসেই সমর্থন কাড়ল। কিন্ত মানুষ বিজয়ীকে ভালোবাসে, চোকারকে নয়।
ভারতীয়দের প্রতি এদেশে অনুরাগ তৈরি হয় এরপর। শচীন তেন্ডলকারের অসামান্য প্রতিভায় মুগ্ধ সবাই। মাঠের সাফল্যেও ভারত নজর কাড়ল। এভাবেই বাংলাদেশিদের ক্রিকেট সমর্থন দিক পরিবর্তন করল। দেশ হিসেবে প্রতিবেশি এবং মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। ভারতপ্রীতি বেশ কয়েক বছরে জমাট হল।
ক্রিকেট নিয়ে ভারতের দাদাগিরি আর বাংলাদেশের প্রতি তুচ্ছতাবোধ বাংলাদেশের মানুষকে হতাশ করে। চলমান বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল এদেশের মানুষকে কেবল হতাশ কনে নি, চরমভাবে ক্ষুব্ধও করেছ। দেশ জুড়ে ভারতবিদ্বেষ এবং ক্ষোভের পটভুমিতে সেমি ফাইনালে দেশের মানুষ সমর্থন দিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। ভারতের পরাজয়ে উল্লসিত হয়েছে দেশবাসী।
এরপর বাঙালির সমর্থন কোন দিকে যাবে? অস্ট্রেলিয়াতেই থিতু থাকবে ক্রিকেটীয় সমর্থন?
বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অন্যতম শক্তি ও পক্ষ। প্রতিটি খেলুড়ে দেশই বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ। ভালোমন্দ যে রকমই খেলুক সমর্থন বাংদেশেরই প্রাপ্য। ধর্ম কিংবা জাতীয়তাবোধ, শত্রুর শত্রু মিত্র–এ ধরনের যে কোন সূত্রেই হোক অন্য কোন দেশের প্রতি সমর্থন দানের ইতি ঘটুক এখানেই। আমরা আমাদের ক্রিকেট দলের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকব। আমাদের ছেলেরাই আমাদের নায়ক। আমাদের সম্মিলিত ও অকুন্ঠ সমর্থন নিয়ে তারা সাফল্যের চূড়ায় উঠবে। ক্রিকেটের সাপোর্ট, আমাদের সাপোর্ট, আমাদেরই থাক। আর নয় পরমুখিতা। সমর্থনের তরী এক ঘাটেই বাধা থাক, সে ঘাট বাংলাদেশ, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।