ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

পাঠ্যপুস্তকে ভুলের ছড়াছড়ির আলোচনায় যুক্ত হয়েছে ও-তে ওড়না। নারীবাদীগণ বলছেন ও-তে ওড়না শিখিয়ে শিশুদের লিঙ্গবৈষম্যের সবক দেয়া হচ্ছে।

বস্তু বা বিষয়ের নাম দিয়ের শিশুদের বর্ণ শেখানোর প্রক্রিয়া পুরানো রীতি। এক্ষেত্রে চারপাশে সুলভ এমন বস্তু বা বিষয়ই নির্বাচন করতে হয়। বস্তুনামও হতে হয় সহজপাচ্য। এই দিক দিয়ে ওড়না যুৎসই শব্দই বটে। তাছাড়া বাংলা বর্ণবোধে গৃহীত শব্দটি বাংলা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। খণ্ডিত এক প্রস্থ কাপড়কে ওড়না বলা হয়। পুরুষের মাথার গামছা, আরবীয় শেখদের মাথার রুমাল, মেয়েদের মাথার স্কার্ফ, জামার ওপর পরা হয় এমন বিচ্ছিন্ন কাপড় সবই ওড়না। কিন্তু আমাদের দেশে ওড়না বলতে মেয়েদেরে বিশেষ পোশাককেই নির্দেশ করে। আমাদের বাঙালি সমাজে পোশাকীয় কালচারে ওড়না বহুল ব্যবহৃত, বহুদৃষ্ট বলে ‘ওড়না’ পরিচিত শব্দ। এদিক দিয়ে নিরীহ শব্দটি চয়ন করা খুব দোষের কিছু নয়। প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় বাংলাতেও এর ব্যবহার আছে। সেদিক দিয়ে এটি দেশি শব্দের মধ্যে পড়ে।

ও-তে ওড়না শিখলে শিশুদের লিঙ্গবৈষম্যের সবক লাভের শঙ্কাটা আসলে কি সত্যি? লিঙ্গবৈষম্য অবশ্যই খারাপ কিন্তু লিঙ্গসচেতনতাটা খুবই জরুরি। স্রষ্টা নারী ও পুরুষকে ভিন্নতর মনোদৈহিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মাতৃজঠরেই নাকি ছেলেশিশু ও মেয়েশিশুর আচরণ আলাদা হয়। জন্মের পর বেড়ে উঠার প্রক্রিয়ায় ছেলে ও মেয়ে শিশুর আচরণ ও কর্মকাণ্ড আলাদা হয়ে থাকে। এটাই প্রকৃতি। ছোট্ট ছেলেটা যখন সেভিং ক্রিম মুখে মাখায় তখন মেয়ে শিশুটি মায়ের লিপস্টিক মুখে মাখায় কিংবা মায়ের ওড়নাকে শাড়ি বানানোর প্রয়াসে শরীরে পেঁচায়। সমাজ বা পরিবার তাদের লিঙ্গগত পরিচয় সম্পর্কে ধারণা না দিলেও অবচেতন মনেই তারা নারী-পুরুষের জায়গায় নিয়ে যায়। বর্ণবোধে ও-তে ওড়না না পড়লেও ছেলে ও মেয়ে শিশুরা স্বকীয় স্বভাব প্রকাশ করবেই। এক্ষেত্রে তাই যারা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন তারা কিছুটা বাড়াবাড়ি করছেন বলেই মনে হয়। ও-তে ওড়না দোষের হলে ল-তে লুঙ্গিও দোষের। কিন্তু ল-তে লুঙ্গি লেখা হলে কেউ প্রতিবাদ করত কি?

আমাদের শিশুদের বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি কেবল নয় সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে হবে। লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যজনিত পার্থক্যের পরও পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব গড়ে তুলতে হবে ছেলে-মেয়ে সবারই। ছেলে শিশুদের অবশ্যই সমতা ও সহযোগিতার চেতনা দিয়ে বড়ো করতে হবে। তবে আজকাল মেয়েশিশুদের পুরুষের সম্পর্কে যে ধারণা কেউ কেউ দেন তা-ও কাম্য নয়। অনেক কন্যাশিশুই পুরুষ মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠে।

এখন দেখা যাক ওড়নার বদলে ও-তে আর কী কী শব্দ দেয়া যেত এবং এগুলোর উপযোগ কতখানি।

ওঝা (সাপের বিষ নামায় যারা)-তদ্ভব শব্দ। ওঝাগিরি বিজ্ঞানসমর্থিত নয়। তবে বাঙালি লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ট।
ওষ্ঠ (ঠোঁট)-তৎসম কঠিন শব্দ। শিশুতোষ নয়।
ওজন (মাপ)-আরবি শব্দ।
ওজস্বী (তেজোদীপ্ত)-তৎসম, কঠিন শব্দ।
ওদন (ভাত)-সংস্কৃত, অপ্রচলিত শব্দ।
ওয়াক্ত (সময়)-আরবি। বস্তুনির্দেশক নয়।
ওল (কচুজাতীয় মূল)-বর্ণ পরিচয়ে এর ব্যবহার আছে।কিন্তু আধুনিককালে শিশুদের কাছে ‘ওল’ খুব পরিচিত নয়। মোটামুটি উপযোগী।
ওলকপি (মূলা জাতীয় সবজি)-মিশ্র শব্দ। শিশুদের কাছে এর পরিচিতি কম। তবু মোটামুটি উপযোগী।
ওলাউঠা (কলেরা বা ভেদবমি)-সংস্কৃত শব্দ। শিশুদের মানসহায়ক নয়।
ওস্তাগর (কারিগর)-ফারসি শব্দ। বিদেশি ও অপরিচিত হিসেবে উপযোগী নয়।
ওস্তাদ (শিক্ষক, বিশেষ করে ইসলামি শিক্ষায়)-ফারসি শব্দ। এর ব্যবহারে ধর্মীয় পক্ষপাত ও সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ উঠতে পারে।
ওষুধ (দাওয়াই)-তদ্ভব শব্দ। ঔষধ-এর চলিত রূপ। ঔ-তে ঔষধ আর দেয়া চলবে না।

সামগ্রিক বিচারে ‘ওড়না’ উপযোগী শব্দ বটে। তবু যেহেতু আপত্তি উঠেছে, সেহেতু তুলনামূলকভাবে সহজ ও উপযোগী হিসেবে ‘ওল’ কিংবা ‘ওলকপি’-র কোন একটা প্রতিস্থাপন করলেই মনে হয় ভালো হবে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বিষয়টি ভেবে দেখবেন আশা করি।