ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ফাল্গুনের শেষদিক। নবীনগর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ছোট আকৃতির লঞ্চে আসছি ভৈরব। বসার ব্যবস্থা মুখোমুখি। একজনের কাছ থেকে আমার শিক্ষক ড. রফিকুল ইসলামের একটি পুস্তিকা টাইপের বই পেয়েছি। ব্যাকরণের অমীমাংসিত কিছু বিষয়ে ফয়সালা আছে বইটিতে। যাত্রাপথের নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্যে এটাকে সঙ্গে নিয়েছি।

আমার মুখোমুখি বসা মধ্যবয়সী একজন লোক। তার অভিব্যক্তি আর বসার ভঙ্গি অদ্ভূত ধরনের। কালচে চেহারায় রাজ্যের বিরক্তির ছাপ। রেক্সিনের মলিন পোর্টফলিও ব্যাগটা কোলের মধ্যে এমনভাবে ধরে রেখেছেন যে, মনে হবে লঞ্চে ডাকাত পড়ার খবর আছে। কোঠরাগত চোখ মেলে এদিক-সেদিক তাকানোতে কচ্ছপের বহিঃদর্শনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমার মনে হয়েছিল, তিনি স্কুল শিক্ষক এবং গ্রামারে পণ্ডিতি আছে তার। ব্যাকরণপটু মানুষদের মধ্যে আমি এই বিরক্তি আর নীরস ভাব প্রত্যক্ষ করেছি।

যাত্রাপথে আমি বেজায় ঘুমকাতুরে। কিন্তু লঞ্চের মৃদুমন্দ গতি আর আবেশমাখা বাতাসের মধ্যেও ঘুমানোর সুযোগ নেই। পেছনে খাড়া টিনের দেয়াল সামনের দিকে ধাক্কায়। সামনে শূন্য, শূন্যে ঝোলা পা। গায়ে গা লাগিয়ে যাত্রীরা বসেছেন। পাশের যাত্রীর গায়ে ঢলে পড়া কিংবা ঘুমঘোরে হুমড়ি খেয়ে সামনে পড়ে যাওয়ার ভয়। অতএব, মধ্যাহ্নের ভাতঘুম তাড়ানোর ফিকিরে আজীবন অপছন্দের জিনিস ব্যাকরণ নামীয় পাথর চিবানোর চেষ্টা করছি। হঠাৎ সামনের লোকটি স্বগতোক্তি করে বলে উঠলেন, ‘খাইল, এই বাংলায়ই খাইল। বাংলা বাংলা কইরাই দেশটা গেল।’ তিনি আমার হাতের বইটার দিকে অবজ্ঞা-ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথাগুলো বলছেন। আমি বাংলার নতুন প্রভাষক। বাংলা ভাষা আর সাহিত্য রক্ষার ব্রত তখন আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তার উপর সদ্যগত একুশের রেশ মন জুড়ে। কাজেই তার কথাগুলো আমার কানে একটু বেশিই উৎকট শোনালো।

আমি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, বাংলা আপনার কী ক্ষতিটা করেছে? উনি যা বললেন তার মোদ্দাকথা হলো এই যে, বাংলা ভাষার প্রতি অতি মাত্রায় মনোযোগ দিতে গিয়ে আমাদের জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতি থমকে গেছে। ইংরেজি ভাষার চর্চা না করে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। আমি বললাম, ইংরেজি চর্চার সাথে জাতীয় উন্নতির সম্পর্কটা যদি একটু ধরিয়ে দেন তবে কৃতার্থ হই।

বিষয়টা ততক্ষণে তর্কের মাত্রা পেয়েছে। ছোট চারকোণা কক্ষের সব যাত্রীর মনোযোগ আমাদের প্রতি। লোকটি ইংরেজি ভাষার উপযোগিতা প্রসঙ্গে বারবার বলছেন, বিদেশিরা ইংরেজি বুঝে। তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হলে ইংরেজি দরকার। ইংরেজি না জানলে বিদেশিদের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া যাবে না। বিদেশে কাজ করতে গেলেও ইংরেজির দরকার।

এবার মেজাজটা সত্যি বিগড়ে গেল। গলাটা সপ্তমে চড়িয়ে বললাম, আপনাদের মতো পরগাছা আর ভিখিরি মনোবৃত্তির মানুষগুলো জাতীয় শত্রু। জাতীয় উন্নতির পথে আপনারা প্রধান বাধা। ইংরেজি কেন আরও অনেক বিদেশি ভাষা শিখতে অসুবিধা নেই। কিন্তু অসুবিধাটা শেখার উদ্দেশ্যের মধ্যে। বিদেশিদের কাছ থেকে ভিক্ষে করার জন্যে তাদের ভাষা শেখা দরকার এমন চিন্তা করতে লজ্জা হয় না? জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্যে ইংরেজি চর্চা করতে নিষেধ করছে কে?

লোকটা সহজে কাবু হতে রাজি নয়। বললাম, ব্রিটেনের অঙ্গ স্কটল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডে যান, ইংরেজিকে তারা পুছে না। জাপানিরা মাতৃভাষাতেই উন্নতির শিখরে উঠেছে। চায়নিজদের মধ্যে ইংরেজি জানা মানুষ হাজারে-লাখে একজন। জার্মানিতে যান, এমনকি ভিয়েতনাম, কমবোডিয়ার মতো গরিব দেশে, ইংরেজি সেখানে উপাদেয় কিছু নয়। দেশ ও জাতীয় উন্নতির সবকটা মাতৃভাষাপ্রেমেই নিহিত। আরব দেশে পেট্রোডলারের খোঁজে পাঠানোর আগে ইউরোপ-আমেরিকা তাদের লোকদের আরবি শেখায়। আমাদের দেশের অনেকে জাপানে পড়তে যায়, সেখানে গিয়ে আগে জাপানিজ শিখতে হয়। কারণ তারা নিজেদের ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করেনি। আপনি নিজের দেশকে এমনি জায়গায় নিয়ে যান যাতে বিদেশিরা নিজেদের প্রয়োজনে বাংলা শিখতে বাধ্য হয়। মনেপ্রাণে ভিখিরিতে দেশটা গেছে ভরে, আমরা উন্নতি করব কীভাবে?

তর্কে তখন একপেশে জয় হতে চলেছে। সম্ভাব্য বিজয়ীর দিকে যাত্রীদের সমর্থন স্পষ্ট। লোকটি বয়সে আমার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। হঠাৎ মনে হলো আর হেনস্থা নয়। লোকটির অসহায় অবস্থা মায়া জাগালো। ডেকে গিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। মেঘনার শীতল বাতাস কপালের স্বেদবিন্দু উড়িয়ে নিয়ে গেল। জামার উপরের বোতাম খুলে দিলাম। বুকটা ভরে গেল অনাবিল শীতলতায়। দিগন্তের ওপারে গন্তব্যের রেখা। মেঘনার ঢেউয়ের মাথায় অগনিত সূর্যের ভাংচুর। সুদূরে তাকিয়ে আমি আনমনে গেয়ে উঠলাম—

‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা।’