ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 
images

“জার্মিচেক” একটি টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে বহুল শ্রুত একটি কথিত উপাদান যার কথিত উপকারিতা হলো জীবানু থেকে দাঁতকে সুরক্ষা দেয়া, দাতের ক্ষয়রোধ, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই লেখাটি জার্মিচেক-কে নিয়ে নয়; জার্মিচেক উপাদানটি, টুথপেস্টটি বা তার উৎপাদক প্রতিষ্ঠানটি এই লেখার প্রধান বা একমাত্র লক্ষ্যবস্তুও নয় – জার্মিচেক কথাটিই প্রথম মনে পড়ায় উদাহরণ হিসাবে উপাদানটির নাম এই লেখায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

শুনতে খুব মুখরোচক বা লোভনীয় মনে হলেও আসলে এই জার্মিচেক জিনিসটি কী? ইন্টারনেট যেহেতু এই সময়ের সবচেয়ে সহজলভ্য ও বড় জ্ঞানের ভান্ডার তাই ইন্টারনেটেই অনুসন্ধানের চেষ্টা চালালাম গুগলসহ অন্যান্য অনুসন্ধান মাধ্যমে। যা আশা করেছিলাম তাই, জিনিসটি আসলে ঐ উৎপাদকের দেয়া একটি নিজস্ব নাম। খুব সম্ভবত এক বা একাধিক রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রনে তৈরী একটি সংমিশ্রন, যার হয়তো সত্যি সত্যিই কিছু কার্যকারিতা থাকলেও থাকতে পারে, এবং নামটি ও সংমিশ্রনটি অতি অবশ্যই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পেটেন্ট ও ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রীকৃত একটি পণ্য উপাদান যা শুধু এই উৎপাদকই ব্যবহার করার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাহলে টুথপেস্ট পণ্যটির ও জার্মিচেক উপাদনটির ভোক্তা হিসাবে আমরা কী জানলাম?

আমরা জানলাম, এটি একটি বিশেষ টুথপেস্টে থাকার ফলে সেই টুথপেস্ট ব্যবহারে আমাদের দাঁতের ক্ষয়রোধ ও জীবানু প্রতিরোধসহ কিছু উপকার পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে আমাদের কী কী জানতে দেয়া হলো না? জানতে দেয়া হলো না, (১) এই উপাদানটিতে আসলে কী কী রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে? (২) দাঁত, মুখগহ্বর ও মানুষের শরীরের উপর সে সব রাসায়নিকের আলাদা আলাদা ভাবে কী ধরনের উপকারী ও ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে, (৩) সব রাসায়নিকের সম্মিলিত (Synergistic) কী কী উপকারী ও ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে, (৪) জার্মিচেক জিনিসটি প্রথম গবেষণাগারে উদ্ভাবনের পর কোথায়, কাদের ওপর ও কিভাবে এর কার্যকারীতা পরীক্ষা করা হয়েছে (Trial), (৫) সেসব পরীক্ষার প্রকৃত ফলাফলই বা কী ছিলো (Outcomes of the experiment), এবং (৬) কোন মেডিক্যাল জার্নালে সেই পরীক্ষার ফলাফল সর্বসাধারণ অবগতি এবং কম্পানীর বাইরের বিজ্ঞানীদের নিরীক্ষার জন্য বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব তথ্য ভোক্তাদের কাছে উম্মুক্ত না করায় বিদ্যমান পুঁজিবাদী ও কর্পোরেট বাণিজ্য ব্যবস্থায় অত্যন্ত দৃঢ় সম্ভাবনা থেকেই যায় যে জার্মিচেক বলে আসলেই টুথপেস্টটিতে কোন কিছু নেই, অথবা কিছু একটা আছে পণ্য বিপনন ছাড়া যার প্রকৃত কোন সুফল নেই, এমনকি এমনও হতে পারে যে জার্মিচেক নামে যা যা মেশানো হয়েছে টুথপেস্টটিতে তা আসলে দাঁত ও শরীরের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একটি জিনিস স্মরণে রাখা যেতে পারে যে, টুথপেস্টসহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী সামগ্রী সরাসরি ঔষধ নয় বলে এসকল পন্য ঔষধ প্রশাসনের (Drug administration) আওতায় বাইরে থেকে যায়। ফলে এসব পণ্য উৎপাদন ও বিপনণের ক্ষেত্রে ঔষধের জন্য প্রযোজ্য কড়াকড়ি নিয়মগুলো আরোপিত হয় না। তথাপিও খাদ্য ও প্রসাধনী সামগ্রীগুলো যেহেতু মানব শরীরের উপর ক্রিয়া করে তাই উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই এসব পণ্যে কী কী রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হচ্ছে তার পরিপূর্ণ তালিকা পণ্যের গায়ে উল্লেখ থাকা আবশ্যিক। এসব ক্ষেত্রে ”জার্মিচেক” ধরণের স্বপ্নে প্রাপ্ত নাম নয়, পদার্থগুলোর প্রকৃত রাসায়নিক (জেনেরিক) নাম উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক, যাতে আগ্রহী যে কোন ভোক্তা কোন একটি পদার্থের উপকারিতা ও অপকারিতা বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে বাধাগ্রস্থ না হন।

এবার আসি শিরোনামের ছাই-এর প্রসঙ্গে। আমার সমবয়সী যারা কয়েকযুগ আগে গ্রামে কাটিয়েছেন তাদের প্রায় সবারই ছাই বা কাঠকয়লা দিয়ে দাঁত মাজার অভিজ্ঞতা হয়েছে বা বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন। ধারনা করছি এখনও গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষ ছাই-কয়লা দিয়ে দাঁত মাজেন। কাঠ-পোড়া ছাই বা কয়লা মূলত একধরনের ক্ষারীয় পদার্থ, যা দাঁতের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এবং ক্ষারের প্রভাবে সাধারণ ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবানু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এখনকার বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত একটি টুথপেস্টে ছাই-এর উপাদানের মতো একটি সাধারণ ক্ষারীয় পদার্থ যোগ করে দিয়ে যে তাকে “আল্ট্রা-হোয়াইটেনার” বা ”জার্মিচেক” নাম দিয়ে আমাদের কাছে লোভনীয় করে তোলা হচ্ছে না তার কী প্রমান?

শুরুতেই বলেছি জার্মিচেক বা তার উৎপাদক এই লেখার একমাত্র লক্ষ্যবস্তু নয়, খেয়াল করলেই দেখবেন বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে এমন সব উপাদানে পণ্যটি ”সমৃদ্ধ” হিসাবে আপনার/আমার কাছে উপস্থাপন করা হয়, যেসব উপাদানের নামই আমরা এর আগে কোথাও শুনিনি। শুনবো কী করে, কারণ উপাদানগুলো কোন প্রকৃত রাসায়নিক পদার্থ নয় যে! এসবের প্রায় শতভাগই উৎপাদনকারী কম্পানীর রসায়নাগারে দেয়া নিজস্ব কল্পিত নাম। খাদ্য, পুষ্টি বা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসব নামের কোনই অস্তিত্ব নেই, তাই কোন সূত্রেই আপনি জানতে পারবেন না উপাদনটি আসলে কী, এর কি আসলেই কোন উপকারিতা বা অপকারিতা আছে কিনা, বা এর প্রকৃত উৎপাদন খরচ ও সংযোজিত মূল্য কত হওয়া উচিত। টুথপেস্টের উদাহরণ টেনে লিখলাম যদিও, আপনি একই রকম বিজ্ঞাপনী প্রলোভন দেখতে পাবেন সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট, রেফ্রিজারেটরসহ অসংখ্য পণ্যে। বিশেষ করে যেসব পণ্য সরাসরি মানব শরীরে প্রয়োগ করা হয় ঔষধের মতোই সেসব পণ্যে জেনেরিক বা রাসায়নিক উপাদানের উল্লেখের বাধ্যবাধকতাসহ আরোপ করা উচিত। এসব গালভরা নামে ভোক্তা হিসাবে আমাদের যে খুব উপকার হয় তা আমি কখনোই মনে করিনি, কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বরং আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছি বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।