ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

গত কিছুদিনের মধ্যে নিরবে একটি জঘন্য কাজ করে ব্র্যাক প্রায় পার পেয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু ঘটনাক্রমে মিডিয়া, ব্লগার ও মিডিয়ার বদৌলতে বিশেষজ্ঞদের প্রতিবাদের মুখে ব্র্যাক তার ”খিচুড়ি, তেহারী, সেমাই, কেক, পাউরুটি ঘৃনা করি…” বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এই ধৃষ্টতার জন্য তারা ক্ষমা চায়নি মোটেই, কৌশলী একটি বক্তব্য দিয়েছে যা আরো ধৃষ্টতাপূর্ণ।

উল্লেখ্য ব্র্যাক চিকেনের পত্রিকা ও বিলবোর্ড বিজ্ঞাপনে তারা শিশুদের ছবি ব্যবহার করে লিখেছিলো ”খিচুড়ি, তেহারী, সেমাই, কেক, পাউরুটি ঘৃনা করি… আমরা ব্র্যাক চিকেন ভালোবাসি…”। পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন খিচুড়ি, তেহারী, সেমাই জাতীয় দেশিয় খাবার শিশুদের জন্য ফ্রায়েড চিকেনের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী। খিচুড়ি ও তেহারি অনেকটাই সুষম খাবার, চিকেন তা নয়। চিকেন থেকে মুটিয়ে যাওয়া (ওবিসিটি), রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস জাতিয় মারাত্মক শারিরিক সমস্যার উদ্ভব হওয়ার বিষয়টি অসংখ্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। বৃটেনের ও ইয়োরোপিয়ান মানবাধিকার আদালতে ম্যাকডোনাল্ডের বিরুদ্ধে এসব স্বাস্থ্যগত বিষয়ে দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে পরিবেশবাদী হেলেন স্টীল ও ড্যাভিড মরিস জয়ী হয়েছেন যা বিখ্যাত ম্যাকলিবেল কেস হিসাবে পরিচিত, এ মামলার রায় থেকেও নিশ্চিত হয়েছে এ জাতীয় খাবারগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আমেরিকাতেও ম্যাকডোনাল্ড ও অন্যান্য ফাস্টফুড চেইনের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ জমা হয়েছে ক্ষতিকর খাদ্য পরিবেশনের জন্য, শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য এবং অন্যান্য পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের জন্য। ডজন ডজন ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরী হয়েছে এসব খাবারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যে। পৃথিবীর বহু দেশেই শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে বা শিশুদের অনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন নির্মান নিষিদ্ধ – অথচ ঠিক এ কাজটিই করে ব্র্যাক-এর মতো একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান নিরবে পার পেয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ বলে।

ব্র্যাকের এ জাতিয় গণবিরোধী কর্মকান্ড এটাই প্রথম নয়। এর আগেও তারা কুখ্যাত আমেরিকান বীজ কোম্পানী মনসানেটো-র সাথে ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেছে বাংলাদেশে। মনসানটোর বীজগুলোতে জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করে টারমিনেটর জিন নামে একটি জিন ঢুকিয়ে দেয়া আছে যার ফলে এই বীজ থেকে গজানো গাছের ফল কখনোই আবার বীজ হিসাবে কাজ করবে না, অর্থাৎ ওয়ান টাইম বীজ। কৃষককে প্রতিবারই মনসানটোর বীজ কিনতে হবে। এতে করে একদিকে তারা যেমন ব্যবসাটি অনাদিকাল চালিয়ে যেতে পারবে, অন্যদিকে এসব জেনেটিক্যালী মডিফায়েড শষ্যগুলোর দৌরাত্মে হাজার হাজার বছর ধরে যেসব দেশিয় বীজ চালু ছিলো তারা আক্রান্ত হয়ে (বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় জেনেটিক কনটামিনেশন) চিরতরে হারিয়ে যাবে। এভাবে দেশে দেশে বীজ সরবরাহের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পেয়ে যাবে মনসানটো ও তাদের দেশিয় দোসরেরা। আমেরিকা ও কানাডায় এসব নিয়ে কৃষক ও মনসানটোর সাথে শত শত মামলা চলছে, ডজন ডজন বই ও ডকুমেন্টারি আছে এসবের উপরও। তবে মেক্সিকোর কৃষকরা প্রায় সফলভাবেই তাদের দেশে মনসানটোকে প্রতিহত করতে পেরেছে। মনসানটোর তুলাবীজ ব্যবহার করে মধ্যভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ফসল বিপর্যয়ে পড়ে শত শত চাষী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে, যে ঘটনাটির রাজনৈতিক ব্যবহার করা হয়েছে মাইক্রোক্রেডিটের বিরুদ্ধে – একটু গভীরে গবেষণা করলেই জানা যাবে মাইক্রোক্রেডিটের শোষনের চেয়েও তুলার বীজের কারণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন বেশি। সেই মনসানেটো ব্র্যাক ও গ্রামীনের হাত ধরে এখন বাংলাদেশে। বিবিসি থেকে চেপে ধরা হয়েছিলো ব্র্যাকের কর্ণধার জনাব আবেদকে, যারা শুনেছেন অনুষ্ঠানটি তারা লক্ষ্য করেছেন জনাব আবেদ ভালোমতো কোন অভিযোগেরই জবাব দিতে পারেন নি। জবাব দেয়ার দরকারও আসলে নেই, তাঁর দরকার ব্যবসা বিস্তার, তাঁর দরকার দেশের রাজনৈতিক গরম পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিরবে নির্ভৃতে আমাদের জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রন নিজের হাতে নিয়ে নেয়া।

ইলিয়াস আলী, সুরঞ্জিত গুপ্ত, জাবি ভিসি জাতীয় উত্তপ্ত রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকার ও জনসাধারন এতই মগ্ন যে চুপিচুপি এসব কোম্পানী অনৈতিক, ক্ষতিকর ও বিভিন্ন কূটকৌশলী পন্থায় তাদের ব্যবসা বাড়াবার জন্য, এবং আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নিয়ে নেবার জন্য এগিয়ে চলেছে। সাইনবোর্ড সর্বস্ব বাম রাজনৈতিক দলগুলোকে বছর বিশেক আগেও কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী হলেও প্রতিবাদ করতে দেখতাম, আজকাল তারাও হালুয়া-রুটির শরিকে পরিনত হয়েছে – অতএব আমরা মানে আমরাই, আমজনতা; আমরা চিৎকার হইচই করে যতদিন নিজেদের স্বার্থ দেখবো ততদিনই, কেউ আমাদের হয়ে দেখবে না আমাদের ভালো। তাই আসুন ব্র্যাক, কেএফসি, পিজা হাট, ম্যাকডোনাল্ড, অ্যাগোরা, মিনাবাজার জাতিয় সকল চেইন স্টোরকে নিরুৎসাহিত করি – একবার এদের হাতে আমাদের বাজারের লিস্টির নিয়ন্ত্রন চলে গেলে মাথা কুটেও বের হওয়া যাবে না, ওদের ইচ্ছায় ও ওদের দামে আমাদের পন্য কিনতে বাধ্য করা হবে।