ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমার অভ্যাস আনকোড়া পত্রিকাটা হাতে নিয়ে বসা । সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়ে যাই বলে পত্রিকা পড়ার সময় হয়না । তাই যাওয়ার আগে কেবল শিরোনামগুলোয় চোখ বুলিয়ে নেই । রাতে বাসায় ফিরে ধীরে-সুস্থে বিস্তারিত সংবাদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি । আজও বাসা থেকে বেরুব । যথারীতি পত্রিকা হাতে নিলাম শিরোনামগুলোয় এক ঝটকা চোখ বুলিয়ে নেব বলে । কিন্তু শিরোনামগুলো এক ঝটকায় শেষ করা হয় না । চোখ আটকে যায় একটা ছবিতে । এক বৃদ্ধকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে তিন পুলিশ সদস্য । বৃদ্ধ বেহুশ হয়ে ঝুলে আছে আর পুলিশ সদস্যরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে । তড়িঘড়ি করে মূল খবরে চোখ বুলাতেই জানলাম আদালত অবমাননার জন্য এই শাস্তি বৃদ্ধের ।

ষাটোর্দ্ধ এই বৃদ্ধ আদালতে এসেছিলেন মামলার বাদী হয়ে তার মেয়ের ধর্ষণের বিচার চাইতে । কিন্তু আদালতে বৃদ্ধের কোন একটি বিশেষ আচরণ অসঙ্গত হওয়ায় বিচারক আদালত অবমাননার দায়ে তাকে হাতকড়া পরিয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখার নির্দেশ দেন । আদেশ শুনে বৃদ্ধ অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে হাতকড়া পরিয়ে এই বিশেষ ব্যবস্থায় হাজতে নিয়ে যাওয়া হয় । পাঁচ ঘণ্টা পর তাকে মুক্তি দেয়া হয় । যথার্থ ব্যবস্থা !

আদালতের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে পুলিশের দিকে যাই । কারণ আদালত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে আবার আমিই না আদালত অবমাননার মামলায় ফেঁসে যাই । বলা হয় পুলিশ জনগণের বন্ধু । কিন্তু আমি এ পর্যন্ত পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে পত্রিকার পাতায় যেসব সংবাদ পড়েছি বা অন্যদের কাছে যেসব অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি তাতে তাদের বন্ধুসুলভ আচরণের নজির খুবই কম । আমাদের ছোটবেলা থেকেই একটা প্রবাদ শুনে আসছি-‘বাঘে ছুলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুলে ছত্রিশ ঘা ।’ তাই এদেশের সাধারণ মানুষ সহজে পুলিশের কাছে ঘেষে না । যারা যায় তারা না পারতে যায় ।

পুলিশের এই বাড়াবাড়ি থেকে কেউই মুক্ত নয় । বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশের বাড়াবাড়ির চিত্র আমরা হর-হামেশাই দেখি । রাজপথে বা অন্দরে তাদের উগ্র আচরণ প্রায়ই শিষ্টাচারের ন্যূনতম সীমাও ছাড়িয়ে যায় । বিভিন্ন সময় রাজপথে পুলিশ কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলোর নারী নেতা-কর্মীদের শাড়ি টেনে খোলা বা ব্লাউজ ছেঁড়ার দৃশ্য আমরা দেখেছি । সরকার যদিও এতে চুপ থাকে কিন্তু বিরোধী দলে গেলে তখন তারাও পুলিশের এহেন আচরণের সম্মুখীন হয় । এছাড়া আইনের রক্ষক হয়ে ভক্ষক হওয়ার দৃষ্টান্তও তাদের কম নয় । দিনাজপুরের ইয়াসমিন তাদের পাশবিকতার নির্মম বলি হয়ে আজও সময়ের স্মারক হয়ে আছে ।

একটি দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয় । কারণ এতে করে সাধারণ মানুষ তাদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলে । আর আস্থাহীন বা শ্রদ্ধাহীন হয়ে জনগণের বন্ধু হওয়া যায় না, জনস্বার্থে কাজ করা যায় না । আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নাজুক অবস্থার পেছনে পুলিশের এহেন আচরণ এবং সে কারণে জনগণের আস্থাহীনতা বিশেষ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে ।

পুলিশের এই ভাবমূর্তি সঙ্কট থেকে উদ্ধারের জন্য গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছিলেন । তার মধ্যে ছিল পুলিশের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে তাদের প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্ম বদল প্রভৃতি । বেশ ঘটা করে এসব কার্যক্রমের উদ্বোধনও করা হয়েছিলো । রাস্তার মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছিল সাইনবোর্ড আর তাতে লেখা ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু, পুলিশকে সহযোগিতা করুন’ এ ধরণের বাক্যবিশেষ । কিন্তু পোশাক আর সাইনবোর্ডের পরিবর্তন পুলিশ সদস্যদের মানসিকতা বা আচরণে কোন ধরণের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি । যে লাউ সেই কদুই আছে ।

আমি জানি না কেন পুলিশকে বারবার এমন নেতিবাচক ভুমিকায় দেখা যায় ? কেন তারা সত্যিকারের জনগণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না ? যতদূর জানি পুলিশের জন্য সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি রয়েছে । তবু কেন তারা এহেন শিষ্টাচার বিবর্জিত আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে ? কেন আমরা আশা করতে পারিনা পুলিশ সত্যিকারের বন্ধু রূপে জনগণের প্রয়োজনে পাশে এসে দাঁড়াবে ? জনগণও নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় পুলিশের উপর নির্ভর করতে পারবে ? আদৌ কখনও কি তেমন সময় আসবে?

———————————————————————————————————————————————————-
ফিচার ছবিঃ অলভয়েসেস (ছবি সূত্রঃ এএফপি.কম)