ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

গত পর্ব থেকে এই পর্বের মাঝে ২টা ইন্টারেস্টিং খবর পেলাম । এর প্রথমটি ফারুকুজ্জামান নামক একজন ব্লগারের বরাতে । অন্যটি পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনের খবর মারফত । ফারুকুজ্জামান bdnews24 এবং প্রথম আলোর ব্লগে লিখেছেন যে একটি বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক তার দেয়া যানজট নিরসনের প্রযুক্তিভিত্তিক ফর্মুলা নিজেদের বলে চালিয়ে দিয়েছে । বিষয়টিতে আমি অবাক হইনি কারণ তাদের সহযোগী অন্য একটি পত্রিকার স্লোগান হচ্ছে যা কিছু ভালো তার সাথেই তারা জড়িত । সুতরাং ফারুকুজ্জামানের উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি তাদের ভালো লেগেছে বলেই সেটাকে নিজেদের একান্ত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে কাগজের পাতায় ছেপে দিয়েছে । এতে আর অবাক হওয়ার কি আছে । দ্বিতীয়টি ঘটেছে গতকাল । রাজধানীতে কিছু রাস্তায় রিক্সা চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় রিক্সা মালিক ও চালকরা মিলে ব্যাপক ভাংচুর ও তাণ্ডব চালিয়েছে । এমনকি ছোট শিশুরা পর্যন্ত তাদের তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি । ১ম খবরটি আমাকে নির্ভার রাখলেও দ্বিতীয়টি বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে । সপ্তাহ খানেক আগে আমি রিক্সা চলাচল উপর নিষেধাজ্ঞা জারির বিরোধিতা করে এই ব্লগের একটি খবরে মন্তব্যে করেছিলাম ।তদুপরি এই লেখাটির ১ম পর্বেও এর ছোটখাট সমালোচনা করেছিলাম । এখন যদি রিক্সাওয়ালাদের উস্কানি দেয়ার অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয় ! খালেদা জিয়া জনতার আন্দোলন শুরুর পর বিমান বন্দরের বিরোধিতা করায় তার বিরুদ্ধে উস্কানির অভিযোগে মামলা হতে পারলে আমার বিরূদ্ধে কেন নয়? আমিতো ভাংচুরের আগেই মন্তব্য করেছি । হয়তো পাঠকরা মুচকি মুচকি হাসছেন আর ভাবছেন আদার ব্যাপার কথা শোন । কিন্তু আমি নির্ভার হই কিভাবে ? আমাদের জর্জ মিয়াও তো আদার ব্যাপারীই ছিলেন । কে চিনতো তাকে ? কিন্তু ‘উই আর লুকিং ফর শত্রু’র বলি হয়ে তাকে হতে হল ২১শে আগষ্টের গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী । তবু সামান্য নির্ভার হই এই ভেবে যে আমাদের মহান রাজনীতিবিদগণ ব্লগের মত তুচ্ছ বিষয়ে সময় নষ্ট করেন না বা করার সময়ও নেই । হয়তো এ যাত্রায় বেঁচেও যেতে পারি ।

যাহোক জল ঘোলা না করে আসল কথায় আসি । বলছিলাম যানজট নিরসনের উপায় নিয়ে । ভেবেছিলাম যানজটের একটি ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরব । কিন্তু এ শহরবাসী যানজটের সাথে এত পরিচিত যে সেটা মায়ের কাছে মামা বাড়ির গল্প ফাঁদার মত হয়ে যাবে । তাই ডাইরেক্ট অ্যাকশনের মত ডাইরেক্ট সমাধানে যেতে চাই । ঢাকা শহরের যানজ়ট নিরসনের জন্য যেসব ব্যবস্থা এ পর্যন্ত নেয়া হয়েছে তা টোটকা চিকিৎসা ছাড়া আর কিছু নয় । এই সব ব্যবস্থা দিয়ে কখনোই যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় । এর জন্য একটি ব্যাপকভিত্তিক ও স্থায়ী পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন ।

ঢাকা বেশ পুরনো একটা শহর । ৪০০ বছর আগে রাজধানী হিসেবে এর পত্তন । মাঝখানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে এর গুরুত্ব কমলেও থেমে থাকেনি ঢাকার বেড়ে চলা । সেই বেড়ে চলার ধারাবাহিকতায় এটি এখন বিশ্বের মেগা সিটিগুলোর অন্যতম । তবে সেটা আকৃতিতে নয়, জনসংখ্যায় । পত্তনের পর থেকেই ঢাকা বেড়ে চলেছে অপরিকল্পিতভাবে । ফলে এই শহরের জন্য প্রয়োজনীয় রাস্তা-ঘাটের দিকটিতেও সেভাবে নজর দেয়া হয়নি । যার ফলশ্রুতিতে বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি নামে ক্রমে পরিচিত হয় এ শহর । অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পরিমাণে রাস্তা-ঘাটের অভাবই তীব্র যানজটের সৃষ্টি করেছে । অথচ বর্তমান অবস্থায় রাস্তাঘাটের পরিমাণ বাড়ানোও সম্ভব নয় । তাহলে উপায়? আমি কোন প্রযূক্তি বা নতুন আবিষ্কার নিয়ে আসিনি । সুতরাং যা উপায় বাতলাচ্ছি তা বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহার করেই বাতলাচ্ছি ।

আপনাদের মনে থাকার কথা বছর খানেক আগে যানজট নিরসনের জন্য শিক্ষামন্ত্রী স্কুলগুলোতে অভিভাবকদের নিজস্ব গাড়ির বদলে স্কুল বাস চালুর সুপারিশ করেছিলেন । আমাদের নীতি-নির্ধারকদের সমস্যা এখানেই- তারা বোঝেন, তবে পুরোটা নয় অর্ধেক । সারা শহর প্রাইভেটকারে সয়লাভ করে স্কুলে শুধু বাস দিলে যানজটের সমাধান হবে না । ঢাকা শহরে বর্তমানে যানজটের জন্য প্রাইভেটকারকে অংশত দায়ী করা যায় । আপনি যদি কখনো যানজটে পড়েন তাহলে দেখবেন গাড়ির ভীঁড়ে সবচেয়ে যেটা বেশী দেখা যায় তা হল প্রাইভেটকার । রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানির সুযোগ দেয়ায় এখন সাধারণ মধ্যবিত্তও প্রাইভেটকারের মালিক হয়ে যাচ্ছে এবং তা ক্রমেই গাড়ির বহরকে দীর্ঘ করছে । অথচ লক্ষ করলে দেখবেন একটা বাসের অর্ধেক সমপরিমাণ জায়গা দখলকারী এসব যানে অধিকাংশ সময়ে আরোহী মাত্র একজন । কখনও আবার তাও না । আরোহীকে নামিয়ে দিয়ে একা ড্রাইভার খালি গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যান । অথচ এই যানটি এখন ঢাকার রাস্তার অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে আছে । আমার বক্তব্য অত্যন্ত পরিস্কার । সেটা হল ঢাকার যানজট নিরসনের ১ম পদক্ষেপ হবে ঢাকা থেকে সব প্রাইভেটকার উঠিয়ে দিয়ে সর্বত্র এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ পাবলিক বাস চালু করা । সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রীবর্গ সবাই পাবলিক বাসে চলাফেরা করবেন । তবে বাসের মান অবশ্যই ভালো করতে হবে । মন্ত্রী, এমপি, শিল্পপতিরা চাইলে অনেক দামি বাসে চলাফেরা করতে পারবেন । প্রাইভেটকার উঠিয়ে দিলে রাস্তার একটি বড় অংশ খালি হবে । সেই রাস্তায় নতুন করে আরও আরও ভালো বাস দেয়া সম্ভব হবে । এই চাপ আরো কিছুটা কমানো সম্ভব দোতলা বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে । পর্যাপ্ত সংখ্যক বাস দিলে যাত্রীরা যেমন ঝুলে যাওয়ার বদলে আরামসে সিটে বসে যেতে পারবে তেমনি রাস্তা কিছুটা খালি হলে তাতে দ্রুতও যাওয়া যাবে । এতে জাতীয়ভাবে আমাদের সময় ও কর্ম ঘণ্টার সাশ্রয় হবে ।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে যখন কোন নতুন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় তখন জনপ্রতিনিধিরা তা শুরু করেন এবং অন্যরা তা অনুসরণ করতে শুরু করেন । আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি মাহাথির মুহাম্মদ সবার ক্ষেত্রেই এটা সমানভাবে বাস্তব । আমাদের জনপ্রতিনিধিরা কি এমন একটা উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন না?

……………………………

চলবে…