ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

এই লেখাটির বিষয়বস্তু খুবই স্পর্শকাতর । স্পর্শকাতর বলেই বিষয়টি গুরুতর হলেও এ নিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবিমহল নিরব । কারণ এবিষয়ে কথা বলে কেউই নিজেকে বিতর্কিত করতে চান না । যদিও অনেক সময় গুরুত্বহীন অনেক বিষয় নিয়ে তারা বিতর্কের সূত্রপাত করেন এবং নিজেদেরকে বিতর্কিত করে তোলেন । বুদ্ধিজীবিদের মতই বিষয়টি নিয়ে নিরব আমাদের সংবাদপত্রসমূহ । কিন্তু তারা ভেবে দেখছেন না তাদের এই নিরবতা আগামী দিনের বাংলাদেশকে কি বিশাল সঙ্কটের সম্মুখীন করে তুলছে । তাহলে এরূপ একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আমার মতো অভাজনই বা সরব হল কেন? কারণটি প্রথমত বৈষয়িক । বিষয়টির সাথে আমার এবং আমার মতো লাখো তরুণের বৈষয়িক স্বার্থ জড়িত । দ্বিতীয়ত, বৃহৎ পরিসরে এর সাথে আগামী দিনের জাতীয় দক্ষতা-অদক্ষতার বিষয় জড়িত । তৃতীয়ত, বিষয়টির সাথে আগামী দিনের জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রশ্ন জড়িত ।

এত লম্বা ভূমিকার পরে মূল প্রসঙ্গে আসি । এত লম্বা ভূমিকার কারণ এই নিবন্ধটির বক্তব্য বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ অন্যান্য সকল অযৌক্তিক কোটার বিরুদ্ধে । মহান স্বাধীনতার এই মাসে দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সুবিধার বিরোধী বক্তব্য শুনে অনেকে আঁৎকে উঠতে পারেন । এমনকি কেউ কেউ আমার দুঃসাহস দেখে আমার মূল অনুসন্ধানে ব্রতী হতে পারেন । তাদের প্রতি অনুরোধ, সে সুযোগ বহুৎ পাবেন-এখন দোহাই! আগে আমার বক্তব্যটি পরিষ্কার করতে দিন ।

আমি একজন স্নাতক ডিগ্রীধারী তরুণ । এদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে খুবই ভালো ফলাফলসহ এই ডিগ্রী খানি অর্জন করি । স্নাতক পাশের পর থেকেই বিসিএস-সহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি এবং এই প্রস্তুতি নিতে গিয়েই আমার মতো আরো আরো সব তরুণ প্রার্থীর মুখোমুখি হই । আর তখনই লক্ষ্য করি সব তরুণের চোখে-মুখেই এক ধরণের চাপা ক্ষোভ, অসন্তোষ ও হতাশা । তাদের ক্ষোভ ও হতাশার বিষয়টি পরিষ্কার হল যখন জানলাম যে লাখো প্রতিযোগীর পাশাপাশি তাদেরকে লড়তে হচ্ছে এক ধরণের অযৌক্তিক কোটার সাথেও এবং আদতে সেই লড়াইটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে । বিসিএস-সহ সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ আসন পূরণ হয় কোটার মাধ্যমে আর বাকী ৪৫ শতাংশ আসন পূরণ হয় মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে । সুতরাং কোটা ব্যবস্থাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হয়ে দেখা দিয়েছে । আমি সব দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন জনের কাছে প্রশ্ন করেছি, সবার একই মত ।

তাদের কাছে আমার প্রশ্ন ছিল কেন তারা কোটা ব্যবস্থার বিরোধী? তারা এর জবাব দেয় পালটা প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে – কোটা ব্যাবস্থার কারণ কী? কোটা ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কোন দেশ, জাতি বা সমাজের অনগ্রসর কোন অংশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য, যেন তারা অন্য সবার সাথে সমান তালে এগিয়ে যেতে ও সম-অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সার্বিক জাতীয় উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং এর ফলে সার্বিকভাবে জাতীয় উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয় । যখন ঐ অনগ্রসর অংশ অগ্রসরতার দিক থেকে সমতা অর্জন করবে তখন কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে । কিন্তু বাংলাদেশের মত কোটা ব্যবস্থার এমন বিচিত্র প্রয়োগ আর কোথাও বোধহয় নেই । এখানে কোটা ব্যবস্থাই বরং উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নিত্য নতুন করে তা আরোপ করা হচ্ছে ।

উপরোল্লিখিত ৫৫ শতাংশ কোটার বণ্টনে দেখা যায় এখানে ৩০% মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, ১০% নারী, ৫% উপজাতি এবং ১০% জেলার জন্য সংরক্ষিত । কোটা ব্যবস্থা প্রণয়নের যুক্তি হিসেবে নারী এবং উপজাতির বিষয়টি আপাতত মেনে নেয়ার মতো হলেও বাকী দুটি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না । কারণ বাংলাদেশে কোনভাবেই মুক্তিযোদ্ধা সন্তান বা জেলা ভিত্তিক জনগোষ্ঠী অনগ্রসর গোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত নয় । তাছাড়া কোটা বরাদ্দের ক্ষেত্রে মোট জনসুংখ্যার তুলনায় ঐ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুপাতও বিবেচনা করা প্রয়োজন । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে bdnews24.com-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালযের গেজেটে অন্তর্ভূক্তি অনুযায়ী এর সংখ্যা ১,৮৯,৮৯৯ জন, মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত সনদ অনুযাযী এ সংখ্যা ১,৮৬,৭৯০ জন এবং মুক্তিবার্তা অনুযাযী এ সংখ্যা ১,৪৬,৭২৬ জন । বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৫ কোটি ধরে এবং পূর্বোল্লিখিত সর্বোচ্চ সংখ্যাটি ধরে হিসেব করলেও এই অনুপাতটি ধারায় ০.১৩ শতাংশ বা ৭৮৭:১ ।

তাহলে কোন যুক্তি বা হিসাবের বদৌলতে সরকারগুলো এই কোটার হারটি নির্ধারণ করেছে? অথচ এই ব্যবস্থাকে বিলোপ করার পরিবর্তে সরকার নতুন করে একে স্থায়ী একটি ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বন্দোবস্ত পাকাপাকি করে ফেলেছে মুক্তি্যোদ্ধা নাতি-নাতনীদের জন্য এই ৩০% কোটা সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়ে । মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুক্তিযোদ্ধা বা তার সন্তানরা সুবিধা পেতে পারেন । কিন্তু সেজন্য তার নাতি-নাতনিরা সুবিধা পেতে পারেন কোন যুক্তিতে? আমার মত সব তরুণের বিশ্বাস এই ঘোষণার পিছনে মুক্তি্যোদ্ধা প্রজন্মের কল্যাণের চেয়ে সরকারের পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজিই মূখ্য । চারদলীয় জোট সরকার মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য কোটা ঘোষণা করেছে । সুতরাং বর্তমান সরকারকেও পিছিয়ে থাকলে চলবে না । অতএব মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এগিয়ে গেলেন কোটার চক্র মুক্তিযোদ্ধা নাতি-নাতনী পর্যন্ত প্রলম্বিত করে । অথচ যাদের জন্য কোটা সবচেয়ে বেশি দরকার, প্রতিবন্ধী, তাদের জন্যই রাখা হয়নি ।

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান । তাদের আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার কারণেই আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক । তাদের কারণেই আজ আমরা স্বাধীনভাবে চলার ও বলার অধিকার লাভ করেছি এবং এদেশের মাটি-জলে নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পাচ্ছি । সুতরাং সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ঋণ অবশ্যই শোধ করতে হবে এ জাতিকে । কিন্তু ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়াটি কিরূপ হবে তা নিরূপন করা প্রয়োজন । ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তাদেরকে আমরা মেধার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে পারি না । পারিনা তাদের ঐতিহাসিক মর্যাদাকে অবমূল্যায়িত করতে এবং তরুন প্রজন্মের মধ্যে তাদের সম্পর্কে কোন ধরণের অশ্রদ্ধার ভাব সঞ্চার করতে ।

মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্র প্রয়োজনে তাদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করতে পারে । এখন যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে প্রয়োজনে তা আরো বাড়িয়ে দেয়া হোক । তাদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য প্রতিপালন ভাতা, শিক্ষাভাতাসহ নানা ধরণের ভাতা প্রদান করা যেতে পারে, যেন তারা সব ধরণের সুযোগ পেয়ে নিজেদেরকে বিকশিত করতে এবং সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের জন্য নিজেদেরকে সমর্থ করে তুলতে পারে । আবার যখন বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ লাভ করবে তখন ঐ প্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য কিছু অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা যেতে পারে । এই ধরণের ব্যবস্থা অন্যান্য কোটাভুক্তদের ক্ষেত্রেও করা যেতে পারে ।

লক্ষ্য করুন আমি মুক্তিযোদ্ধাদের বা তাদের সন্তান-সন্ততি ও অন্যান্য কোটা সুবিধাভোগীদের নানা ধরণের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলছি কিন্তু তাদেরকে কোটা দেয়ার বিরোধিতা করছি । কারণ একটি রাষ্ট্র ও এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহের দক্ষ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন মেধাসম্পন্ন দক্ষ জনবল কাঠামো । কিন্তু কোটা ব্যবস্থা সংরক্ষণ করতে গিয়ে মেধা ও দক্ষতার বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয় । আমাদের বর্তমান কোটা ব্যবস্থার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে সিংহভাগ কর্মী (৫৫%) নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও দক্ষতার বিষয়টিতে ছাড় দিতে হচ্ছে এর চেয়ে ঢের দক্ষ ও মেধাবী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও । পূর্ববর্তী কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ও তার ভিত্তিতে নিয়োগলাভের চিত্র বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে । দেখা গেছে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ৪৫% প্রার্থী বাছাই পরিক্ষাসমুহে উচ্চ নম্বর পেয়ে নিয়োগ লাভ করছে এবং অনেক প্রার্থী বাছাই পরীক্ষায় অনেক ভালো করেও নিয়োগ লাভ করছে না শুধু আসন সঙ্কটের কারণে । অথচ কোটা সুবিধাভোগীরা নিয়োগ লাভ করছে ন্যূনতম নম্বর পেয়ে । এমনকি ন্যূনতম নম্বরের শর্তও পূরণ করতে পারছেনা বলে সেই আসনগুলো শুণ্য থাকে এবং তা পূরণ করতে হয় অন্য ক্যাটেগরী থেকে । ভেবে দেখুন তো মেধা ও দক্ষতার এই পার্থক্য প্রতিষ্ঠানসমূহে কি ধরণের ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি করেছে? একবার চিন্তা করুন তো একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়োজিত অধিকাংশ লোকই এই ধরণের বিশেষ ছাড়প্রাপ্ত হলে সেই রাষ্ট্রের দক্ষতার স্তরটি কেমন হবে?

এই ধরণের কোটা ব্যবস্থার কারণে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ অদক্ষ হয়ে পড়ছে তেমনি মেধাবীদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে । ফলে মেধাবী তরুণদের মধ্যে এক ধরণের ক্ষোভ-হতাশা কাজ করছে এবং কোটা সুবিধাভোগীদেরকে প্রতিপক্ষ ভাবার এক ধরণের মানসিকতা সৃষ্টি হচ্ছে । অন্যদিকে এই ব্যবস্থা মুক্তিযোদ্ধা সন্তানসহ অন্যদের প্রকৃত বিকাশের পরিবর্তে তাদেরকে অদক্ষতার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে এবং আদতে তাদেরকে মেধাহীন ও অথর্ব প্রমাণ করা হচ্ছে ।

সুতরাং সামগ্রিক আলোচনার পর জাতীয় নীতি-নির্ধারকদের কাছে আমিসহ আমার মত লাখো তরুণের প্রস্তাব অযৌক্তিক হারে বিন্যস্ত কোটাব্যবস্থার বিলুপ্তি অথবা এর যৌক্তিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এমন একটি নিয়োগবিধি প্রণয়ন করা হোক যেন এর ফলে মেধাবী তরুণেরা নিয়োগ লাভের মাধ্যমে তাদের মেধা ও দক্ষতার প্রয়োগ করে জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়ন কর্মকান্ড ত্বরান্বিত করতে এবং সমৃদ্ধ জাতি নির্মানে সক্রিয় অংশগ্রহণে সক্ষম হয় ।